বিজ্ঞাপন

সীতাকুণ্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু: পরিবার মামলা করেনি, অপমৃত্যুতেই থামল পুলিশ

সীতাকুণ্ডে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু: পরিবার মামলা করেনি, অপমৃত্যুতেই থামল পুলিশ

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে বিষাক্ত গ্যাসে নয় শ্রমিক নিহতের ঘটনায় মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। ঘটনার দিন পুলিশ তড়িঘড়ি করে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছিল। এরপর কারখানা কর্তৃপক্ষের কর্তব্যকাজে অবহেলা বা নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগে কোনো মামলা করেনি। একই সঙ্গে নিহত ৯ শ্রমিকের মধ্যে আটজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এবং কারও অবহেলা ছিল কি না, তা নির্ধারণে ভবিষ্যৎ তদন্তে জটিলতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

পুলিশের দাবি, নিহতদের পরিবারের কেউ অভিযোগ না দেওয়ায় নিয়মিত মামলা করা হয়নি। আর পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতেই আটজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়া হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে পুলিশের এমন অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবীরা। তাদের মতে, এ ধরনের বড় দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় শুধু অপমৃত্যুর মামলা করে দায় শেষ করার সুযোগ নেই। দুর্ঘটনার পেছনে কারও অবহেলা বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া পুলিশের দায়িত্ব।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকায় কর্মরত পুলিশের এক উপ পরিদর্শক (এসআই) নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঘটনার দিন সীতাকুণ্ড থানার ওসি হাসপাতালে চলে আসেন। তিনি সাফ জানিয়ে দেন, নিহতদের কোনো পরিবারই ময়নাতদন্ত করাতে রাজি নয়। এরপর ওসি অনেকটা জোর করে তড়িঘড়ি করে মরদেহগুলো ময়নাতদন্ত ছাড়া হস্তান্তরের ব্যবস্থা করেন। তবে একজন নিহতের পরিবারের অভিভাবককে কোনোভাবেই রাজি করানো সম্ভব হয়নি। পরে তারা নিজেদের উদ্যোগে ওই মরদেহের ময়নাতদন্ত করান।

ওই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, বাকি নিহতদের স্বজনরা ওসির জোরাজুরিতে ময়নাতদন্ত করাননি। ফলে ৯ জনের মধ্যে একজনের মরদেহের ময়নাতদন্ত হলেও বাকি আটজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই হস্তান্তর করা হয়।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)। তিনি বলেন, ঘটনার দিন পুলিশ বাদী হয়ে একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছে। নিহতদের পরিবারের কেউ কোনো অভিযোগ না দেওয়ায় নিয়মিত মামলা করা হয়নি। আর একজন ছাড়া অন্য নিহতদের পরিবারের কেউ ময়নাতদন্ত করাতে রাজি ছিলেন না। এ কারণে তাদের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই হস্তান্তর করা হয়েছে।

আইনজীবীরা জানান, কোনো মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যু না হয়ে আকস্মিক, দুর্ঘটনাজনিত, আত্মহত্যা বা রহস্যজনক কারণে মৃত্যু হলে আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে থানায় অপমৃত্যু মামলা বা (ইউডি) মামলা রেকর্ড করা হয়। সাধারণত গলায় ফাঁস, বিষপান, পানিতে ডুবে মৃত্যু, সড়ক দুর্ঘটনা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া বা বজ্রপাতে মৃত্যুর মতো ঘটনায় এ ধরনের মামলা করা হয়।

তারা জানান, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৭৪ ধারা অনুযায়ী পুলিশ প্রথমে মরদেহের বাহ্যিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। এরপর মৃত্যুর সঠিক কারণ নির্ধারণে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। তদন্তে যদি কোনো অপরাধের প্রমাণ না পাওয়া যায় বা ঘটনাটি দুর্ঘটনা হিসেবে প্রমাণিত হয়, তাহলে পুলিশ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে মামলাটি নিষ্পত্তি করে।

তবে ময়নাতদন্ত বা তদন্তে হত্যাকাণ্ড কিংবা অন্য কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে অপমৃত্যু মামলার ভিত্তিতে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায় এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত মামলা করা হয়। তাই অস্বাভাবিক বা দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর ঘটনায় ময়নাতদন্ত ও যথাযথ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান খান বলেন, অপমৃত্যুর মামলায় সাধারণত কারও বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকে না। এটি মূলত দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর বিষয়টি পুলিশের নথিতে রাখার একটি প্রক্রিয়া। কর্তব্যকাজে অবহেলা বা নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগ থাকলে সেটি শুরুতে মামলা রেকর্ড করে পৃথকভাবে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, আমাদের ধারণা, ওসি তড়িঘড়ি করে একটি অপমৃত্যুর মামলা রেকর্ড করে শ্রমিকদের অভিভাবকদের বুঝিয়েছেন যে পুলিশ মামলা করেছে। কিন্তু ময়নাতদন্ত ছাড়া মরদেহ হস্তান্তর করা বড় ধরনের ভুল এবং ভুক্তভোগীদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। কারণ ময়নাতদন্ত না হলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে পরবর্তী সময়ে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হবে। এতে করে অপমৃত্যুর মামলা থেকে পরবর্তী সময়ে কর্তব্যকাজে অবহেলার মামলার দিকে যাওয়ার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে। আর এভাবেই বড় ধরনের দুর্ঘটনার পরও মালিকপক্ষ দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পেতে পারে।

এর আগে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা ঘাটতির অভিযোগে সরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে একাধিকবার ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিকে নিরাপত্তা ত্রুটি দূর করার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। ৪ মে পুনরায় পরিদর্শনের পর আগের নির্দেশনা বাস্তবায়নে অগ্রগতি না পাওয়ায় তাগিদ দেওয়া হয়। পরে ৮ জুন দেওয়া হয় চূড়ান্ত নোটিশ। এত কিছুর পরও নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করায় গত ১৫ জুলাই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে মামলা করা হয়।

নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে সরকারি সংস্থার নোটিশ, তাগিদ এবং মামলা হওয়ার মাত্র এক মাসের মধ্যে ওই ইয়ার্ডে নয় শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি সংস্থার এসব পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর ছিল এবং আদালতে মামলা হওয়ার পরও ইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল।

দুর্ঘটনার দিন সকালে পুরোনো একটি জাহাজের বদ্ধ চেম্বারে কাটার কাজ করার সময় বিষাক্ত গ্যাসে শ্রমিকরা আক্রান্ত হন। পরে ঘটনাস্থলে হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়। জাহাজটি আগে এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত হতো।

দুর্ঘটনার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বিস্ফোরক অধিদপ্তর চট্টগ্রামের সহকারী বিস্ফোরক পরিদর্শক এসএম সাখাওয়াত হোসেন জানান, মাল্টি-গ্যাস ডিটেক্টরের মাধ্যমে জাহাজের ভেতরে মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। তাদের ধারণা, হাইড্রোজেন সালফাইডের বিষাক্ততাই দুর্ঘটনার মূল কারণ।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লিং অ্যাসোসিয়েশন (বিএসবিআরএ), শিল্প মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এসব কমিটি দুর্ঘটনার কারণ, ইয়ার্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্টদের কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে।

এদিকে দুর্ঘটনার পর ফেরদৌস স্টিল ইয়ার্ড সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আহত শ্রমিকদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে কয়েকজন এখনো চিকিৎসাধীন। নিহতদের পরিবারের জন্য ১০ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ইফতেখার কামাল খান বলেন, নিরাপত্তা ঘাটতি নিয়ে আগে থেকেই সরকারি নোটিশ ও মামলা থাকার পরও কেন ইয়ার্ডে শ্রমিকদের বদ্ধ চেম্বারে কাজ করতে দেওয়া হলো, কাজ শুরুর আগে বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না, প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম দেওয়া হয়েছিল কি না এবং দুর্ঘটনার পর কেন আটটি মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই হস্তান্তর করা হলো-এসব বিষয় তদন্ত হওয়া দরকার। কিন্তু এখন মামলায় হচ্ছে না, তদন্ত কীভাবে হবে। আমরা সরকারের ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষের হস্তক্ষেপ করার দাবি জানাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, শুধু অপমৃত্যুর মামলা করে এবং পরিবারের অভিযোগ না থাকার অজুহাতে বিষয়টি থামিয়ে দিলে দুর্ঘটনার প্রকৃত দায় নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়বে। নয় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এমআর/এসএম