গাড়ি আছে, চালক আছেন; রাস্তায় যাত্রীও পর্যাপ্ত। কিন্তু গাড়ি চালানোর প্রধান জ্বালানি সিএনজির দেখা মিলছে না। ঢাকা শহরজুড়ে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে চালকদের। কোথাও গ্যাস একেবারেই নেই, আবার কোথাও চাপের পরিমাণ এতই কম যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে স্টেশনগুলোর সামনে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে যানবাহনের সারি। গ্যাসের পেছনেই চালকদের দিনের সিংহভাগ সময় পার হওয়ায় আয় মারাত্মকভাবে কমছে, আর ব্যাহত হচ্ছে সামগ্রিক যাত্রী পরিবহন ব্যবস্থা।
গত ১৬ আগস্ট রাজধানীর উত্তরা, কুড়িল, রামপুরা, তেজগাঁও, মগবাজার ও মিরপুরের বিভিন্ন সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। কোনো কোনো স্টেশনে সকাল থেকেই ছিল গাড়ির দীর্ঘ লাইন। আবার কোথাও গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ থাকায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে ‘গ্যাস নেই’ লেখা সতর্কবার্তা। যেসব স্টেশনে গ্যাস দেওয়া হচ্ছিল, সেখানেও কম চাপের কারণে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে প্রয়োজনমাফিক গ্যাস পাচ্ছিলেন না চালকেরা।
এর আগে ৯ আগস্ট তেজগাঁও এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় প্রতিটি সিএনজি স্টেশনের সামনে ৫০ থেকে ৬০টি গাড়ি গ্যাস নেওয়ার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। কম চাপের কারণে কোনো কোনো অটোরিকশায় ৫০ থেকে ৬৫ টাকার বেশি গ্যাস ঢুকছিল না। পরপর তিনটি সিএনজি অটোরিকশায় গ্যাস নেওয়ার সময় দেখা যায়, একটিতে ৫৭ টাকা, দ্বিতীয়টিতে ৬২ টাকা এবং তৃতীয়টিতে ৬৪ টাকার গ্যাস ঢুকেছে।
রাজধানীতে তীব্র গ্যাসসংকটের কারণে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ লাইন। গ্যাসের কম প্রেশার ও সংকটের ফলে চালকদের প্রতিদিন ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে বসে থাকতে হচ্ছে। কাজের সময় কমে যাওয়ায় আয় মারাত্মকভাবে কমলেও গাড়ির মালিককে নির্ধারিত দৈনিক জমা ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা তাদের জীবনযাত্রাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে
একই চিত্র ফুটে ওঠে ১৪ আগস্ট বিকেলে রামপুরা এলাকায়। সেখানে টিভি সেন্টার থেকে হাজীপাড়া সিএনজি ফিলিং স্টেশন পর্যন্ত সড়কে সিএনজি অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। লাইনের শেষ প্রান্ত গিয়ে ঠেকেছিল রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা গাড়িতে বসে কিংবা রাস্তায় দাঁড়িয়ে আকুল অপেক্ষা করছিলেন চালকেরা।

১৫ আগস্ট প্রগতি সরণির আবুল হোটেল থেকে নতুনবাজার পর্যন্ত চারটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের পরিস্থিতি ছিল আরও নাজুক। এর মধ্যে দুটি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল। একটিতে পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় স্বাভাবিক রিফুয়েলিং ব্যাহত হচ্ছিল। হাজীপাড়া ফিলিং স্টেশনে গ্যাস থাকলেও চাপ কম থাকায় অটোরিকশা ও প্রাইভেটকারের লাইন গিয়ে ঠেকেছিল মোল্লা টাওয়ারের কাছাকাছি।
একই দিন উত্তর বাড্ডার মক্কা সিএনজি রিফুয়েলিং স্টেশনে সারি ধরে গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকলেও গ্যাস দেওয়া যাচ্ছিল না। সেখানকার কর্মীরা জানান, ওই সময় গ্যাসের চাপ ছিল মাত্র ১২০ বার, যা দিয়ে গাড়িতে সংযোগ দেওয়া সম্ভব নয়। ১৬ আগস্টও নগরীর প্রায় প্রতিটি স্টেশনে একই চিত্র দেখা গেছে। সম্প্রতি গ্যাসের জন্য এই দীর্ঘ প্রতীক্ষা যেন চালকদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় দিনে দুই থেকে তিনবার পর্যন্ত লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এতে শুধু গ্যাস সংগ্রহ করতেই দৈনিক ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে। ফলে যাত্রী পরিবহনের সময় কমে গিয়ে চালকদের আয় কমে যাচ্ছে বহুগুণ। অন্যদিকে, দিনশেষে গাড়ির মালিককে ঠিকই দিতে হচ্ছে নির্ধারিত জমার টাকা। আয় কমলেও জমার ক্ষেত্রে মেলেনি কোনো ছাড়।
মহেশখালীতে এফএসআরইউ টার্মিনালে দুর্ঘটনার কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় এই তীব্র সংকটের সৃষ্টি হয়। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ নেমে এসেছে অর্ধেকের নিচে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অতীত অব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক বাজারের চড়া মূল্যের কারণে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই জটিল সমস্যা সমাধান করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে
ঢাকা মহানগর সিএনজি অটোরিকশা চালক ঐক্য পরিষদের সদস্য সচিব মো. গোলাপ হোসেন সিদ্দিকী ঢাকা পোস্টকে বলেন, গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে চালকদের। চার-পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আমাদের কাজের সময় কমে গেলেও মালিকরা দৈনিক জমার টাকায় কোনো ছাড় দিচ্ছেন না; এখনও অনেক মালিক প্রতিদিন ১,২০০ থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত জমা আদায় করছেন।

সংকটের নেপথ্যে যা ঘটেছে
চলমান এই ভোগান্তির পেছনে রয়েছে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহের বড় ধরনের ঘাটতি। গত ২১ জুলাই মহেশখালী উপকূলে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে জাহাজ থেকে জাহাজে এলএনজি স্থানান্তরের সময় আগুন লাগে ও যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়।
এর সরাসরি প্রভাবে আবাসিক, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও তীব্র গ্যাসসংকট তৈরি হয়। এর ওপর বৈরী আবহাওয়া ও এলএনজি খালাসে বিলম্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও সংকট পুরোপুরি কাটেনি। গত ১৫ আগস্ট জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ বেড়ে ৮২৮ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়ায় এবং দেশীয় উৎসের গ্যাসসহ মোট সরবরাহ হয় ২,৪৩৮ মিলিয়ন ঘনফুট, যা জুলাইয়ের দুর্ঘটনার পর সর্বোচ্চ। সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকেই আবারও সরবরাহ শুরু হয়েছে।
তবে সরবরাহ বাড়লেও চাহিদার তুলনায় এই ঘাটতি এখনও প্রকট। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ১৩ ও ১৪ আগস্ট দৈনিক প্রায় ৩,৮৫৪ মিলিয়ন ঘনফুট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া গেছে মাত্র ১,৯৩১ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুট। এর আগের দিনগুলোতেও সরবরাহ ছিল চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্য কম।
বিশেষজ্ঞ ও দায়িত্বশীলদের বক্তব্য
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ মো. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। কিছুদিন আগে তেলের সংকটে সরাসরি নির্ভরশীল খাতগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, আর এখন গ্যাস সংকটে থমকে গেছে এ খাতের মানুষের জীবিকা। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে তবেই গাড়ির চাকা ঘুরবে, আর গাড়ির চাকা ঘুরলেই সচল থাকবে মানুষের রুটিরুজি।’
জ্বালানি সংকটের স্থায়ী সমাধানে বিকল্প উৎসের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘নতুন সরকারের পক্ষে রাতারাতি এ সংকট মেটানো কঠিন। কারণ, অতীত অব্যবস্থাপনার বোঝা বহনের পাশাপাশি তাদের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট, আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির চড়া মূল্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব সামলাতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে সরকার এখন এক ধরনের ত্রিমুখী সংকটের মুখোমুখি।’

আমদানিনির্ভরতার সমালোচনা করে এই যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, ‘চলমান এই সংকট দীর্ঘদিনের অপরিকল্পনারই ফসল। আমরা বিদেশি জ্বালানি আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি, অথচ দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে মোটেও নজর দেওয়া হয়নি। একইভাবে সৌরশক্তির মতো বিকল্প জ্বালানি নিয়েও কার্যকর কাজ হয়নি। ভবিষ্যতে আমদানিতে কোনো বাধা এলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। তাই যেকোনো ঝুঁকি এড়াতে দেশের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ অনুসন্ধান ও বিকল্প উৎসের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ তৈরি করা জরুরি।’
অন্যদিকে, গত ১৬ আগস্ট হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আমেরিকা বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে সবাই কথা বলছেন। অস্বীকার করার উপায় নেই, আমরা বিগত সরকারের রেখে যাওয়া এক অশুভ সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। তবে দুর্ভাগ্যবশত বিদ্যুৎ ও গ্যাসের এই জটিলতা ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে সমাধান করা সম্ভব নয়; এর জন্য অন্তত দুই বছর সময় লাগবে। আমরা এই সংকট উৎরাতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছি।’

এর আগে ১৩ আগস্ট রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইন-এ সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ) আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মেরামত শেষ হওয়ার অপেক্ষা আর বর্তমান মজুত দিয়ে লোডশেডিং কমিয়ে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা ছাড়া এই মুহূর্তে তার হাতে বিকল্প কিছু নেই।
সংকট সমাধানে সরকারের সর্বাত্মক চেষ্টার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ করে যাচ্ছি...। তবে এই মুহূর্তে রাতারাতি পরিস্থিতি বদলানোর সুযোগ আমার নেই। কারণ, এই মুহূর্তে দ্রুত গ্যাস উত্তোলন করাও সম্ভব নয়, আর এফএসআরইউ সচল হওয়া ছাড়া বিদ্যমান গ্যাস নামানোও যাচ্ছে না।’
এমএইচএন/এমএআর
