বিজ্ঞাপন

‘ড্রাইভিংকে পাইলটের মতোই দেখি’

‘ড্রাইভিংকে পাইলটের মতোই দেখি’

‘আমি যদি নিজেকে একজন পাইলট ভাবি, তাহলে আমার অপরাধটা কোথায়?’–এভাবেই নিজের পেশা ড্রাইভিংকে দেখেন বিআরটিসির নারী চালক ও ট্রেইনার রাবেয়া খাতুন। দীর্ঘদিন ধরে পুরুষপ্রধান হিসেবে পরিচিত ড্রাইভিং পেশায় এবার বড় গাড়ির চালক হিসেবে রাস্তায় নামছেন তিনি। ড্রাইভিং শেখা ছিল তার শখ, সেই শখই এখন পরিণত হয়েছে পেশায়। ২০১২ সালে লাইসেন্স নেওয়ার পর ২০১৯ সালে বিআরটিসিতে যোগ দেন রাবেয়া খাতুন।

দীর্ঘদিন প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার পর বড় গাড়ি চালাতে গাজীপুরে এক মাস ১৩ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছেন তিনি। নারী বাস সার্ভিস চালুর উদ্যোগে তার মতো আরও ১৩ জন নারী চালক প্রস্তুত হয়েছেন। তবে এই পেশায় আসার পথে পরিবার ও সমাজের প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করতে হয়েছে তাকে। মাস্টার্স পাস করেও চালকের পেশা বেছে নেওয়াকে তিনি দেখছেন নতুন কিছু করার সুযোগ হিসেবে। তার বিশ্বাস, বিদেশে যদি ড্রাইভিং সম্মানের পেশা হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশেও নারীরা এ পেশায় নিজেদের জায়গা করে নিতে পারবেন।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) ঢাকা ট্রাক ডিপোতে ‘মহিলা বাস সার্ভিস (পিংক বাস)’ উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। প্রাথমিকভাবে ১০টি ডিপো থেকে ১৩টি রুটে ১৪টি বাস এই সার্ভিসের আওতায় আনা হয়েছে। উদ্বোধনী দিনে এতে যোগ দিয়েছেন ১৪ জন নারী চালক ও ২৫ জন নারী কন্ডাক্টর।

নারী চালক ও ট্রেইনার রাবেয়া খাতুন | ছবি : ঢাকা পোস্ট

তাদের মধ্যে নারী চালক ও প্রশিক্ষক রাবেয়া খাতুনের সঙ্গে ড্রাইভিং পেশায় আসা, প্রশিক্ষণ, পরিবার ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিসহ নানা বিষয়ে কথা বলেছেন ঢাকা পোস্টের নিজস্ব প্রতিবেদক হাসনাত নাঈম। তার সঙ্গে হওয়া সেই কথোপকথনের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো এই প্রতিবেদনে। ছবি তুলেছেন ঢাকা পোস্টের সিনিয়র ফটোগ্রাফার মাহবুব আলম।

ঢাকা পোস্ট : ড্রাইভিং পেশাটা এতদিন আমরা বেশিরভাগ সময় পুরুষদের করতে দেখেছি। আপনাকে দেখে নিশ্চয়ই অন্য নারীরাও এই পেশায় আসতে উৎসাহিত হবেন। আপনি কাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছেন?

রাবেয়া খাতুন : আসলে নারী হিসেবে আমি এই প্রথম রাস্তায় আসছি, তা নয়। নারীরা ছোট গাড়ি চালিয়ে রাস্তায় চলাচল করেন। কিন্তু বড় গাড়িতে আমরা প্রথম নারী হিসেবে আসছি। আমার ক্ষেত্রে যদি উৎসাহ বা অনুপ্রেরণার কথা বলেন, তাহলে এটা আসলে আমার শখ ছিল। ড্রাইভিং শেখা আমার শখ ছিল। সেই শখ থেকেই এখন এটি পেশায় এসে দাঁড়িয়েছে।

ঢাকা পোস্ট : আপনি যখন ড্রাইভিংয়ের প্রতি আগ্রহের কথা পরিবারকে জানিয়েছিলেন, তখন তারা কী বলেছিল?

রাবেয়া খাতুন : বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রথম অবস্থায় কোনো পরিবারই হয়তো সহজে এই বিষয়টি মেনে নিতে চায় না। সমাজও এর বাইরে নয়। আমরা পরিবারকে বোঝাতে পারলেও পরিবার অনেক সময় এই পেশায় আসতে দিতে চায় না। আমিও এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। পরে এটাকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি।

ঢাকা পোস্ট : আপনার বাবা-মা বা স্বামী কী বলেছিলেন?

রাবেয়া খাতুন : তারা কখনোই এটার পক্ষে ছিলেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত তিতুমীর কলেজ থেকে মাস্টার্স পাস করেছি। তাই তাদের ধারণা ছিল, আমার মতো একজন মাস্টার্স পাস মেয়ে চালক হিসেবে কাজ করবে, বাংলাদেশের সমাজ হয়তো এটা এখনো স্বাভাবিকভাবে নেয় না। কিন্তু আমি বিষয়টাকে অন্যভাবে দেখি। আমি যদি নিজেকে একজন পাইলট ভাবি, তাহলে আমার অপরাধটা কোথায়? আমি তো এভাবেও কাজ করতে পারি।

ঢাকা পোস্ট : আপনি কেন মনে করেন নারীদের এই পেশায় আসা উচিত?

রাবেয়া খাতুন : আমি যখন ব্র্যাকে চাকরি করতাম, তখন আমার সামনে অনেক ভালো ভালো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার এবং বড় পরিবারের সন্তানকে ড্রাইভিং শিখতে দেখেছি। বিআরটিসির প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোতেও অনেকে ড্রাইভিং শিখে বিদেশে গিয়ে পার্টটাইম হিসেবে কাজ করেন। তারা নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করেন এবং পাশাপাশি পড়াশোনার খরচও নিজেরাই বহন করেন। যদি আমরা বিদেশে গিয়ে ড্রাইভিংকে সম্মানের পেশা হিসেবে নিতে পারি, তাহলে বাংলাদেশে কেন পারব না? আমরাই নতুন কিছু সৃষ্টি করব। আমরা আমাদের দেশটাকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করব। আমি সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।

ঢাকা পোস্ট : কত বছর ধরে ড্রাইভিং করছেন?

রাবেয়া খাতুন: আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স হয়েছে ২০১২ সালে।

বিদেশে গিয়ে ড্রাইভিংকে সম্মানের পেশা হিসেবে নিতে পারলে বাংলাদেশে কেন পারব না : রাবেয়া খাতুন | ছবি : ঢাকা পোস্ট

ঢাকা পোস্ট: এরপর থেকেই কি নিয়মিত গাড়ি চালান?

রাবেয়া খাতুন : না, নিয়মিত গাড়ি চালাইনি। আমি যখন বিআরটিসিতে যোগ দিই, তখন থেকেই বিষয়টি পেশাগতভাবে শুরু হয়। এর আগে আমি ব্র্যাকে চাকরি করতাম। ২০১৯ সালে বিআরটিসিতে যোগ দেওয়ার পর বিআরটিসির ট্রেনিং সেন্টারে মহিলা প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছি। ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে মহিলা প্রশিক্ষকদের প্রয়োজন হয়। সেখানে আমি প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।

ঢাকা পোস্ট : ২০১৯ সালে যোগ দেওয়ার পর থেকে কী ধরনের গাড়ি চালিয়েছেন?

রাবেয়া খাতুন: আমি শুরুতে প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছি। আমাদের যে প্রশিক্ষণ শুরু হয়, সেটার আগ পর্যন্ত আমি ট্রেনিং সেন্টারেই ছিলাম। পরে প্রধানমন্ত্রী যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তার আওতায় মহিলা বাস সার্ভিস চালুর সিদ্ধান্ত হয়। সেখানে নারী চালক, নারী যাত্রী এবং নারী কন্ডাক্টর থাকবেন। এজন্য আমাদের বড় গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হয়। কারণ আমরা সাধারণত ছোট গাড়ি চালাতেই অভ্যস্ত ছিলাম। তাই বড় গাড়ি চালানোর জন্য গাজীপুরে আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আমরা সেখানে এক মাস ১৩ দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েছি। উদ্বোধনের পর থেকেই রাস্তায় বাস চলবে।

ঢাকা পোস্ট : আপনার মতো কতজন নারী চালক তৈরি করেছে বিআরটিসি? আর নারী কন্ডাক্টর কত জন?

রাবেয়া খাতুন : আমার মতো মোট ১৪ জন নারী চালক তৈরি করা হয়েছে। আর ২৫ জন নারী কন্ডাক্টর প্রস্তুত করা হয়েছে।

ঢাকা পোস্ট : আপনার নাম কী? কোথায় থাকছেন? পরিবারে কে কে আছেন?

রাবেয়া খাতুন : আমি মোসাম্মৎ রাবেয়া খাতুন। বর্তমানে ঢাকায় আছি। পরিবারে বাবা-মা, ভাই-বোন, স্বামী ও একজন সন্তান আছে।

ঢাকা পোস্ট : ঢাকা পোস্টকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।

রাবেয়া খাতুন: ঢাকা পোস্টের জন্য শুভকামনা থাকলো।

এদিকে মহিলা বাস সার্ভিসের (পিংক বাস) কর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট পোশাকের ব্যবস্থা করেছে বিআরটিসি। নারী চালকদের পরনে থাকবে গোলাপি হিজাব ও গোলাপি জামা, সঙ্গে কালো প্যান্ট এবং পায়ে কনভার্স জুতা। অন্যদিকে নারী কন্ডাক্টরদের পোশাকে থাকবে গাঢ় সবুজ হিজাব, লাল জামা ও গাঢ় সবুজ রঙের প্যান্ট। তাদের পায়েও থাকবে কনভার্স জুতা।

এমএইচএন/বিআরইউ