বিজ্ঞাপন

পারকি সমুদ্র সৈকত

পার্কিং ফি দিয়ে বালুচরে চলছে বাইক রাইডিং, ক্ষুব্ধ পর্যটকেরা

পার্কিং ফি দিয়ে বালুচরে চলছে বাইক রাইডিং, ক্ষুব্ধ পর্যটকেরা

চারপাশের সবুজ ঝাউবন, বিশাল বালুচর আর সমুদ্রের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি ছুটির দিনে হাজারো পর্যটকের সমাগম ঘটে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার পারকি সমুদ্রসৈকতে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ সৈকতকে ঘিরে চরম অব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক তদারকির অভাব এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণে দর্শনার্থীদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। সম্প্রতি সেই ভোগান্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৈকতের বালুচরে শত শত মোটরসাইকেলের বেপরোয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ রাইডিং।

সরেজমিনে পারকি সৈকত এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সৈকতের মূল প্রবেশমুখেই অবস্থান নিয়ে অন্তত দুই-তিনজন যুবক প্রতিটি যানবাহন থামিয়ে টোলের রসিদ ধরিয়ে দিচ্ছেন। অথচ সৈকতে গাড়ি রাখার সঠিক কোনো ব্যবস্থাপনা কিংবা নিরাপদ পরিবেশ নেই। একটু ভেতরে এগোলেই চোখে পড়ে, সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও প্রবল জোয়ারের তোড়ে সৈকতের বেড়িবাঁধ ও প্রতিরক্ষা বাঁধের যে অংশ ভেঙে গেছে, সেই ঝুঁকিপূর্ণ পথ দিয়েই বালুচরে নেমে পড়ছে শত শত মোটরসাইকেল। বালুচরে মোটরসাইকেলের এই বেপরোয়া চলাচল সৈকতে ঘুরতে আসা পর্যটকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সৈকতজুড়ে নির্দিষ্ট ভাড়ায়, ঘণ্টা চুক্তিতে বা রাইড হিসেবে মোটরসাইকেল চালানোর একটি বাণিজ্যিক চক্র সক্রিয় রয়েছে। নানা বয়সের তরুণ ও যুবকেরা বাইক ভাড়া নিয়ে বালুচরে প্রচণ্ড গতিতে রেস করছেন। বিশেষ করে ভাটার সময় যখন পানি দূরে সরে যায়, তখন এই চালকেরা পথচারীদের খুব কাছ ঘেঁষে এবং শিশুদের বিপজ্জনক সীমানায় বাইক নিয়ে ঘুরে বেড়ান। এতে যে–কোনো মুহূর্তে দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন পরিবার নিয়ে আসা পর্যটকেরা।

dhakapost
সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণে ভেঙে যাওয়া অংশ দিয়ে সমুদ্রের বালুচরে নামছে অবৈধ মোটরসাইকেল। সম্প্রতি ছুটির দিনে তোলা/ঢাকা পোস্ট/ছবি

নগরীর কাজী দেউড়ী এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা পর্যটক আবছার মোস্তফা বলেন, সৈকত হলো মানুষের শান্তিতে হাঁটাচলা করার জায়গা। কিন্তু এখানে এসে দেখি পুরো সৈকত যেন মোটরসাইকেলের শোডাউন চলছে। শিশুদের নিয়ে বালুতে নামার সুযোগ নেই, যে–কোনো সময় এসে গায়ের ওপর পড়ে যেতে পারে। তার ওপর সৈকতের প্রবেশপথেই নির্দিষ্ট পার্কিং সুবিধা না দিয়ে হাত উঁচিয়ে টাকা দাবি করা হচ্ছে।  

একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান অন্য পর্যটকেরাও।

শুধু সাধারণ পর্যটকই নন, এই অনিয়মের শিকার হচ্ছেন গণপরিবহন ও ব্যক্তিগত যানবাহনের চালকেরাও। পারকি সৈকতের মূল পয়েন্টের ভেতরের নির্দিষ্ট পার্কিং এলাকায় গাড়ি না রেখে যদি কেউ পারকির আশপাশে অবস্থিত বেসরকারি রিসোর্টগুলোতে যান, সেখানেও তাদের কাছ থেকে জোর করে রসিদ ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

মোজাম্মেল নামের এক প্রাইভেটকার চালক বলেন, আমি সৈকতের পার্কিংয়ে যাইনি, রাস্তার পাশে একটি রিসোর্টের অতিথিদের নামিয়ে দিতে এসেছিলাম। কিন্তু গাড়ি আটকে একজন লোক টোকেন ধরিয়ে দিয়ে ৭৫ টাকা দাবি করল। টোকেন ছাড়া তারা বের হতে দেবে না।

এদিকে, পারকি সমুদ্র সৈকতের টোল, ইজারা ও পার্কিং ফি আদায় নিয়ে দীর্ঘদিনের অস্পষ্টতা ও প্রশাসনিক জটিলতা রয়ে গেছে। 

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গাড়ি পার্কিংয়ের ইজারার জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। তবে, দরপত্র দেওয়া সত্ত্বেও কোনো সাড়া না পাওয়ায় গত বছরের মতোই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং ভূমি অফিসের মাধ্যমে সরাসরি খাস আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে ইজারার আবেদনের প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়।

বর্তমানে অভ্যন্তরীণ একটি অনুমতির দোহাই দিয়ে লিয়াকত ও আব্দুল হাকিম নামের দুই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে এ অর্থ আদায় চলছে। সৈকতে টোল বক্স বসিয়ে প্রতিটি যাত্রীবাহী বাস থেকে ১৫০ টাকা, প্রাইভেট কার থেকে ৭৫ টাকা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে ২০ টাকা এবং প্রতিটি মোটরসাইকেল থেকে ২৫ টাকা করে আদায় করা হচ্ছে।

টোল আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে পারকি বিচ ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. আবুল কাশেম বলেন, তারা ইউএনও অফিস ও ভূমি অফিসের মাধ্যমে এ টাকা আদায় করছে।

অভিযোগের বিষয়ে পার্কিং ভাড়া আদায়ের দায়িত্বে থাকা লিয়াকত জানান, আমরা প্রশাসন থেকে নিয়ম মেনেই খাস আদায়ের দায়িত্ব পেয়েছি। উপজেলা প্রশাসন নির্ধারিত হারের চেয়ে এক টাকাও বেশি নেওয়া হচ্ছে না। আর সৈকতে যেসব মোটরসাইকেল নামছে, সেগুলোর চালকদের আমরা বারবার নিষেধ করি। কিন্তু দর্শনার্থীরা আমাদের কথা শোনে না, বাঁধ ভাঙা অংশ দিয়ে নেমে পড়ে। এতে আমাদের কোনো হাত নেই।  

বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসনের সহকারী কমিশনার (আর.এম. শাখা ও পর্যটন সেল) সুব্রত হালদার ঢাকা পোস্টকে বলেন, গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য কোনো ইজারা দেওয়া হয়নি। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও ভূমি অফিস খাস কালেকশন করছে। তবে কার নামে টোকেন দিচ্ছে তা জানা নেই।বিষয়টি আমি ইউএনও স্যারের সাথে কথা বলে দেখছি।  

পর্যটন এলাকায় পর্যাপ্ত প্রশাসনিক তদারকি ও নিরাপত্তা বলয় না থাকায় এই অনিয়ম দীর্ঘায়িত হচ্ছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বন্দর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ (উপ-পরিদর্শক) নুরুল আলম বলেন, পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশের পক্ষ থেকে সব ধরনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে শুক্র ও শনিবারসহ ছুটির দিনগুলোতে সৈকতে পর্যটকদের সমাগম বেশি থাকে। পুলিশের উপস্থিতি বা অভিযান টের পেলেই বাইকার ও ছিনতাইকারীরা দ্রুত সরে পড়ে ও এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। তবে আমরা জানতে পেরেছি, চোরাই পথে এসব বাইক সমুদ্রে নামে। এ অনিয়মের সঙ্গে স্থানীয় কিছু লোক জড়িত রয়েছে। আমরা বিষয়টি নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে কাজ করছি, খুব দ্রুতই জড়িতদের চিহ্নিত করে আইনি আওতায় আনা হবে।

এছাড়া, এ বিষয়ে জানতে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দীনকে একাধিক ফোনকল করা এবং খুদে বার্তা পাঠিয়েও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।  

পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তা ও সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষায় দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দর্শনার্থী ও স্থানীয়রা।

জেআই