বিজ্ঞাপন

১৬৭ দিনের শূন্যতা কাটিয়ে ফের সরব দুদক

১৬৭ দিনের শূন্যতা কাটিয়ে ফের সরব দুদক

অবশেষে অবসান হলো দীর্ঘ ১৬৭ দিনের নেতৃত্বশূন্যতার, নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের যোগদানের মধ্য দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) ফিরেছে কর্মচঞ্চলতা। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করেই সংস্থার হারানো ভাবমূর্তি উদ্ধার ও স্বাধীনভাবে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। 

দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই সকাল ৯টার দিকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে প্রবেশ করেন চেয়ারম্যান এ কে এম আসাদুজ্জামান এবং দুই কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। এরপর সকাল ১০টায় তারা দুদক সচিব সাইদুর রহমান, মহাপরিচালকসহ উপ-পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক পূর্বনির্ধারিত মতবিনিময় সভায় অংশ নেন।

দীর্ঘদিন কমিশন না থাকায় আটকে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং সংস্থার সামগ্রিক কার্যক্রম গতিশীল করতে পরবর্তীতে মহাপরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করে পুরো কমিশন। 

মতবিনিময়কালে নতুন চেয়ারম্যান জানান, দেশের ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশা পূরণে ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন।

দুদকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ঢাকা পোস্টকে বলেন, দীর্ঘ ১৬৭ দিনের শূন্যতার পর নতুন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ায় দুদকের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আস্থা পুনরুদ্ধার করা। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা অনুসন্ধান, তদন্ত ও মামলার অগ্রগতি, গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিষয়ে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ওপরই নির্ভর করবে নতুন কমিশনের গ্রহণযোগ্যতা।

তারা জানিয়েছেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কাজ করা, অনুসন্ধান ও তদন্তে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করা নতুন কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ ২১ বছরের ইতিহাসে দুদক প্রশংসার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব ও দায়মুক্তির অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে বেশি। ফলে নতুন কমিশনের সামনে শুধু দুর্নীতি দমন নয়, দুদকের প্রতি মানুষের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনারও বড় দায়িত্ব রয়েছে।

দুদকের অন্য একটি সূত্রে জানা যায়, দুদক কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করার কথা বলেছেন। তবে কাজ করার নেতৃত্ব কমিশনে থাকলেও মূল কাজ দুদক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের করতে হবে বলে জানান তিনি। কমিশন কেবল অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে।

No description available.

নতুন কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই (১৯ আগস্ট) বিকেলে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার।

এক প্রশ্নের জবাবে দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন, আমরা যেন মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী দেশের জন্য কাজ করতে পারি। দুদকের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে পারি। দেশকে দুর্নীতিমুক্ত করতে যথেষ্ট চেষ্টা করতে পারি। ইনশাল্লাহ আগামী দিনে ভালো ফল আনব।’

দুদক স্বাধীনভাবে কাজ করতে গিয়ে কোনো ধরনের চাপের মুখে থাকবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘ইনশাল্লাহ, আমরা কোনো চাপের মধ্যে নেই। আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করছি। আমাদের সামনে কোনো সমস্যা আসলে তা সমাধান করার চেষ্টা করব। মানুষের প্রত্যাশাকে সামনে রেখেই আমরা এখানে আসছি।’

প্রথম দিনের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নতুন চেয়ারম্যান কিছুটা রসিকতার সুরে বলেন, ‘প্রথম দিনেই যদি আপনারা সব শুনে নেন, তাহলে বাকি দিন কী করবেন। দীর্ঘদিন আপনাদের সঙ্গে কাজ করব।’

নতুন কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জানিয়েছেন, ‘একজন অত্যন্ত অভিজ্ঞ বিচারক এই কমিশনের চেয়ারম্যান হয়েছেন। তার নেতৃত্বে প্রতিটি বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আশা করি, আপনারা অতি অল্প সময়ে এই সকল বিষয়ে অগ্রগতি জানতে পারবেন।’

কমিশনার জাহাঙ্গীর আলম খান বলেছেন, নতুন দুদকের পরিচয়ও শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হবে তাদের কাজের মাধ্যমে। 

১৬৭ দিনের অপেক্ষার অবসান

চলতি বছরের ৩ মার্চ তৎকালীন চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করার পর কার্যত নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে দুদক। এরপর দীর্ঘ ১৬৭ দিন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদ শূন্য ছিল।

এই দীর্ঘ সময়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে স্বাধীন প্রতিষ্ঠানটির নিয়মিত কার্যক্রম নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। কারণ দুদকের তদন্ত, অনুসন্ধান, মামলা, চার্জশিটসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কমিশনের অনুমোদন অপরিহার্য। ফলে কমিশন না থাকায় সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হাতে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম থাকলেও নীতিগত ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থবিরতা বিরাজ করে।

দুদকের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যেও হতাশা কাজ করছিল।

চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বছরের প্রথম তিন মাসে জানুয়ারি মাসে ৯২টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ৮৭টি এবং মার্চ মাসে ২৭টিসহ মোট ১৭৯টি অভিযোগে অনুসন্ধান শুরু হয়। ওই সময়ে জানুয়ারি মাসে ১৭টি, ফেব্রুয়ারি মাসে ১৭টি এবং মার্চ মাসে ২০টি সম্পদ বিবরণী নোটিশ জারি করা হয়। বছরের প্রথম তিন মাসে ৬৯১টি মামলা বা এফআইআর এবং ২২২টি চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে। এরপর কমিশন না থাকায় আর কোনো মামলা কিংবা চার্জশিট দাখিল হওয়ার সুযোগ মেলেনি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কমিশন ছাড়া দুদকের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনা করা কঠিন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এত দীর্ঘ সময় চেয়ারম্যান ও কমিশনারশূন্য থাকার নজির নেই। 

নতুন কমিশনের নেতৃত্বে যারা

এ কে এম আসাদুজ্জামান সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি। দীর্ঘদিন হাইকোর্ট বিভাগে বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি আপিল বিভাগে দায়িত্ব পালন করেন। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ থেকে অবসর গ্রহণ করেন তিনি।

কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর কমিশনার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

অপর কমিশনার ড. জাহাঙ্গীর আলম খান সাবেক অবসরপ্রাপ্ত সচিব। তিনি ১৯৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন বলে জানা গেছে।

সার্চ কমিটি থেকে নতুন কমিশন

নতুন কমিশন গঠনের পথ তৈরি হয় গত ২২ জুন। দুদক আইন, ২০০৪-এর ধারা ৭ অনুযায়ী কমিশনার নিয়োগের জন্য সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে সভাপতি করে গঠিত ওই কমিটিতে ছিলেন হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি রাজিক আল জলিল, মহা-হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান এবং মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

সার্চ কমিটি প্রথমবারের মতো সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে আবেদন আহ্বান করে। ২ জুলাই থেকে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৩ জুলাই। চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদে তিন শতাধিক আবেদন জমা পড়ে। আবেদনকারীদের মধ্যে ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সাবেক সচিব, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী, প্রশাসনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন পেশার ব্যক্তিরা।

পর্যায়ক্রমে জীবনবৃত্তান্ত যাচাই-বাছাই, পেশাগত অভিজ্ঞতা, সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা, দুর্নীতি দমনে অবস্থান, নেতৃত্বের সক্ষমতা ও জনস্বার্থে কাজের রেকর্ড পর্যালোচনা করে প্রার্থী চূড়ান্ত করে সার্চ কমিটি।

২১ বছরের দুদকে সাত কমিশন

২০০৪ সালের ২১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্ত করে স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত মোট সাতটি কমিশন দায়িত্ব পালন করেছে।

তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনসহ নানা জটিলতায় সব কমিশন পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। মাত্র তিনটি কমিশন পূর্ণ মেয়াদ পালন করতে পেরেছে।

বাকি চারটি কমিশন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বিদায় নেয়। প্রথম চেয়ারম্যান বিচারপতি সুলতান হোসেন খান ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় পদত্যাগ করেন। এরপর সাবেক সেনাপ্রধান হাসান মশহুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে পুনর্গঠিত হয় কমিশন। তার সময় দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালিত হয়। পরে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তিনিও পদত্যাগ করেন।

এরপর চেয়ারম্যান হন সাবেক সচিব গোলাম রহমান। ২০১৩ সালে মেয়াদ শেষ করেন তিনি। হলমার্ক, ডেসটিনি ও পদ্মা সেতু দুর্নীতির অভিযোগসহ বেশ কিছু আলোচিত ঘটনায় কাজ করে ওই কমিশন। দুদককে ‘নখদন্তহীন বাঘ’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে গোলাম রহমানের একটি বক্তব্যও ব্যাপক আলোচিত হয়েছিল।

পরে মো. বদিউজ্জামান, ইকবাল মাহমুদ এবং মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর নেতৃত্বে কমিশন দায়িত্ব পালন করে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে দায়িত্ব নেয় ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন। তবে পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ পেলেও প্রায় ১৫ মাসের মাথায় সেই কমিশন পদত্যাগ করে।

আরএম/এমএসএ

বিজ্ঞাপন