বিজ্ঞাপন

আজ বিশ্ব মশা দিবস

চট্টগ্রামের আতঙ্কের নাম এখন মশা, উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরা

চট্টগ্রামের আতঙ্কের নাম এখন মশা, উদ্বিগ্ন চিকিৎসকরা

দিন-রাত মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ বন্দরনগরী চট্টগ্রামের বাসিন্দারা। ঘরে কিংবা বাইরে কোথাও যেন বিন্দুমাত্র স্বস্তি নেই। সন্ধ্যা নামলেই নগরের অলিগলি, আবাসিক এলাকা, দোকানপাট ও অফিসপাড়ায় বেড়ে যায় মশার উপদ্রব। মশারি, কয়েল কিংবা বৈদ্যুতিক মশা তাড়ানোর যন্ত্র কোনোটিতেই মিলছে না কাঙ্ক্ষিত স্থায়ী সমাধান। নগরের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর কথা থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে, মশার বিস্তার নিয়ন্ত্রণে তা খুব একটা কার্যকর হচ্ছে না।

এর মধ্যে ডেঙ্গুর পাশাপাশি মশাবাহিত বিরল রোগ ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গত মে মাসে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) অধ্যাপক ড. জাকিয়া সুলতানা জুথির আকস্মিক মৃত্যু সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। চিকিৎসকদের ধারণা, তিনি ‘জাপানিজ এনসেফালাইটিস’ এ আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে রোগটি পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য এক নয়। চিকিৎসকদের মতে, তার উপসর্গ ও দ্রুত স্নায়বিক অবনতির সঙ্গে রোগটির মিল ছিল।

dhakapost.com
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) প্রয়াত অধ্যাপক ড. জাকিয়া সুলতানা জুথি

ড. জাকিয়া সুলতানা জুথির ঘটনাটি মশাবাহিত রোগের ভয়াবহতার একটি আলোচিত ঘটনা হিসেবে সবার সামনে আসে। প্রকাশিত তথ্য মতে, তিনি মে মাসের শুরুতে জ্বরে আক্রান্ত হন। এর সঙ্গে ছিল মাথাব্যথা, বমি ও শারীরিক দুর্বলতা। দ্রুত তার অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে খিঁচুনি ও চেতনা হারানোর মতো গুরুতর স্নায়বিক উপসর্গ দেখা দিলে, চিকিৎসার জন্য প্রথমে তাকে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে, উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, তার ক্ষেত্রে দ্রুত একাধিক স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিয়েছিল। 

এ বিষয়ে মেট্রোপলিটন হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. কাউসারুল আলম জানিয়েছিলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরপরই তার একাধিক স্ট্রোক হয়। পরে স্থানান্তরের সময় কার্ডিয়াক অ্যারেস্টও হয়। এভারকেয়ারে নেওয়ার সময় তার অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। চিকিৎসকদের সন্দেহ ছিল, জাপানিজ এনসেফালাইটিসের মতো ভাইরাল এনসেফালাইটিস কারণেই তার এই দ্রুত স্বাস্থ্য অবনতির কারণ হতে পারে।

আরও উদ্বেগের কারণ হলো, তার সহকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ আগে ড. জুথি বান্দরবান সফর করেছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পর তার জ্বরসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দেয়। এ কারণে চিকিৎসকদের একটি অংশের ধারণা ছিল, সংক্রমণটি বান্দরবানেই হয়ে থাকতে পারে। তবে সংক্রমণের সুনির্দিষ্ট স্থান নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

জাপানিজ এনসেফালাইটিস মূলত কী?

জাপানিজ এনসেফালাইটিস একটি মশাবাহিত ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত কিউলেক্স মশার মাধ্যমে ছড়ায়। গুরুতর অবস্থায় এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রে মারাত্মক প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। সাধারণত আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, খিঁচুনি, চেতনা হারানোসহ গুরুতর স্নায়বিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

ড. জুথির দ্রুত শারীরিক অবনতির সঙ্গে এসব উপসর্গের মিল থাকায় চিকিৎসকদের মধ্যে রোগটি নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল। গত মে মাসে তার মৃত্যুর পর চট্টগ্রামে এ রোগ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টি আলোচনায় উঠে আসে।

এদিকে জাপানিজ এনসেফালাইটিসের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর পরিস্থিতিও চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪৯৭ জন। এ সময়ে মারা গেছেন তিনজন।

dhakapost.com

মাসভিত্তিক হিসাবে আগস্টেই আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ১৯ আগস্ট পর্যন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৬৬৩ জন।

এছাড়া, জুলাইয়ে আক্রান্ত হয়েছেন ৫৩৬ জন। জুনে ১২২, মে মাসে ৩৭, এপ্রিলে ২৯, মার্চে ২০, ফেব্রুয়ারিতে ২২ এবং জানুয়ারিতে ৬৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

অর্থাৎ চলতি বছরের জুলাই ও আগস্টের ১৯ দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ১৯৯ জন, যা জানুয়ারি থেকে আগস্টের ১৯ তারিখ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের প্রায় ৮০ শতাংশ। বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গুর ঝুঁকি কতটা দ্রুত বাড়ছে, এই পরিসংখ্যানই তার বড় ইঙ্গিত।

চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর দীর্ঘমেয়াদি চিত্রও উদ্বেগজনক। সিভির সার্জনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৮৬৪ জন এবং তার মধ্যে মারা যান ২৭ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ৪ হাজার ৩২৩ জন, মৃত্যু হয় ৪৫ জনের। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল সর্বোচ্চ ১৪ হাজার ৮৭ জন এবং মৃত্যু হয় ১০৭ জনের। ২০২২ সালে আক্রান্ত হন ৫ হাজার ৪৪৫ জন এবং মারা যান ৪১ জন।

মশা নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) ব্যয়ের তুলনায় ফলাফল আশানুরূপ নয়

চসিক সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর প্রথম ১০ মাসে শুধু ওষুধ ও যন্ত্রপাতি বাবদ প্রায় ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। পাশাপাশি ওষুধ ছিটানোর কাজে নিয়োজিত ৩৫৫ জন অপারেটরের বেতন বাবদ প্রতি মাসে প্রায় ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে।

এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা হয় প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর ২০০০ সাল থেকে মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে চসিকের মোট ব্যয় প্রায় ৪৬ কোটি ৯৬ লাখ টাকা বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মশা নিয়ন্ত্রণে গত এক দশকেই ব্যয় হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

dhakapost.com

চসিকের তথ্য অনুযায়ী, নগরের ৪১টি ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণে ৩৫৫ জন কর্মী কাজ করছেন। তাদের দাবি, মশার প্রজননস্থল নিয়ন্ত্রণে নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়মিত স্প্রে করা হয় এবং প্রতিটি ব্লকে ৭২ ঘণ্টা পরপর পুনরায় ওষুধ ছিটানোর ব্যবস্থা রয়েছে।

কিন্তু নগরবাসীর অভিজ্ঞতা ভিন্ন। বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়মিত ওষুধ ছিটানোর কথা থাকলেও বাস্তবে দীর্ঘ সময় ধরে মশককর্মীদের দেখা যায় না। কোথাও কোথাও ফগিং হলেও তা অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যায়।

এ বিষয়ে কর্মী সংকটের কথা স্বীকার করে চসিকের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, বিপুলসংখ্যক নগরবাসীকে মাত্র সাড়ে তিনশোর মতো কর্মী দিয়ে সেবা দেওয়া কঠিন।

মশার বিস্তার রোধে বিশেষজ্ঞদের মতামত কী?

নগর স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার বিস্তার শুধু ওষুধ ছিটিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। নগরের খাল, নালা, ড্রেন, নির্মাণাধীন ভবনের আশপাশ, পরিত্যক্ত জায়গা, ছাদ ও বিভিন্ন পাত্রে জমে থাকা পানি মশার প্রজননের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে।

বর্ষায় এই সমস্যা আরও তীব্র হয়। একদিকে ভারী বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়, অন্যদিকে পানি নেমে যাওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশার লার্ভা জন্মানোর সুযোগ তৈরি হয়। আবার নোংরা ও স্থির পানিতে কিউলেক্স মশার বিস্তারও বাড়তে পারে।

এদিকে, মশা নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামে নতুন পদ্ধতি ব্যবহারের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে চসিক পরীক্ষামূলকভাবে বিটিআই লার্ভিসাইড ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়। এটি মূলত মশার লার্ভা ধ্বংস করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি দেখায় যে মশা নিয়ন্ত্রণে শুধু উড়ন্ত মশা মারার পরিবর্তে, মশার জীবনচক্রের গোড়ায় আঘাত করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করা হচ্ছে। কিন্তু এ ধরনের উদ্যোগ কতটা বিস্তৃত, নিয়মিত ও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রয়োগ হচ্ছে সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

মশা নিয়ন্ত্রণে করণীয় কী? 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, মশা নিয়ন্ত্রণে সফল হতে হলে প্রথমে মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করতে হবে। এরপর নিয়মিত লার্ভা জরিপ, প্রজননস্থল ধ্বংস, প্রয়োজন অনুযায়ী লার্ভিসাইড প্রয়োগ, প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক সচেতনতা— সবগুলো কার্যক্রম একসঙ্গে চালাতে হবে।

একই সঙ্গে নগরের ড্রেন ও খাল পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে জমে থাকা পানি অপসারণে কঠোর নজরদারি দরকার।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ ইমাম হোসেন রানা বলেন, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে জনসচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত ওষুধ প্রয়োগ এবং নাগরিকদের নিজ নিজ এলাকায় জমে থাকা পানি অপসারণে উদ্বুদ্ধ করতে কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

জেআই