গ্রাহকের ফিঙ্গারপ্রিন্ট একাধিকবার নিয়ে অতিরিক্ত সিম নিবন্ধন করতেন একটি মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানের সাবেক সুপারভাইজার শাহীনুর রহমান শাহিন। প্রকৃত গ্রাহকের কাছে একটি সিম দেওয়ার পর অতিরিক্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিয়ে নিবন্ধিত সিমগুলো নিজের কাছে রেখে দিতেন তিনি।
পরে এসব সিমে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট খুলে কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হতো। এসব সিম ও অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হতো বিকাশ ও ক্রেডিট কার্ডসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতারণায়।
যশোরে এক চিকিৎসকের ক্রেডিট কার্ডের তথ্য হাতিয়ে ৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা আত্মসাতের মামলার তদন্তে এমন তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
এ ঘটনায় চক্রটির মূলহোতা শাহীনুর রহমান শাহিন (৫০) ও তার সহযোগী সঞ্জয় গুপ্তাকে (৩১) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসীম উদ্দিন খান জানান, শাহীনুর রহমান একটি মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানে সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তার অধীন ব্র্যান্ড প্রমোটারদের মাধ্যমে বিভিন্ন গ্রাহকের ফিঙ্গারপ্রিন্ট একাধিকবার সংগ্রহ করে একাধিক সিম নিবন্ধন করাতেন তিনি। একটি সিম প্রকৃত গ্রাহকের কাছে দেওয়ার পর অতিরিক্ত ফিঙ্গারপ্রিন্ট ব্যবহার করে নিবন্ধন করা অন্য সিমগুলো শাহীনুরের কাছে হস্তান্তর করা হতো।
জসীম উদ্দিন খান তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাতে বলেন, এসব সিম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তির নামে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা হতো। এরপর সিম ও অ্যাকাউন্টগুলো কুরিয়ারের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হতো। চক্রের সদস্যরা এসব অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে বিকাশ প্রতারণা, ক্রেডিট কার্ড প্রতারণাসহ বিভিন্ন ধরনের আর্থিক অপরাধ সংঘটিত করত।
গত ১৯ আগস্ট বিকেলে দিনাজপুর কোতোয়ালি থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে শাহীনুর রহমান ও সঞ্জয় গুপ্তাকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি যশোর জেলা ইউনিটের একটি দল। শাহীনুর রহমান ওই মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানের সুপারভাইজার এবং সঞ্জয় একই প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড প্রমোটার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, যশোরের একটি হাসপাতালের এক চিকিৎসক ২০২২ সালের ২১ ডিসেম্বর শহরের মুজিব সড়কের একটি শোরুম থেকে পোশাক কেনার সময় ক্রেডিট কার্ড দিয়ে মূল্য পরিশোধ করেন। কার্ড ব্যবহারের সময় কিছুটা জটিলতা দেখা দেওয়ায় লেনদেন সম্পন্ন করতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় লাগে।
এর ১০ দিন পর ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় অপরিচিত একটি নম্বর থেকে ওই চিকিৎসককে ফোন করা হয়। ফোনকারী নিজেকে একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে জানান, চিকিৎসকের ক্রেডিট কার্ড সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। কার্ড পুনরায় সচল করার কথা বলে তার কাছ থেকে কার্ড-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
এরপর ওই রাতেই সাতটি পৃথক লেনদেনের মাধ্যমে চিকিৎসকের অ্যাকাউন্ট থেকে ৩ লাখ ৪১ হাজার টাকা ছয়টি এমএফএস নম্বরে স্থানান্তর করে নেওয়া হয়। প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে চিকিৎসক বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন।
সিআইডি জানায়, মামলাটি তদন্তের সময় তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর অনুসন্ধান, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আগে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জবানবন্দিতে চক্রটির অন্য সদস্যদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। আগে গ্রেপ্তার হওয়া এক আসামির ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে দেওয়া জবানবন্দি ও অন্যান্য তথ্য-প্রমাণে শাহীনুর রহমান ও সঞ্জয় গুপ্তাসহ আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে শাহীনুর রহমান ও সঞ্জয় গুপ্তা মামলার ঘটনার সঙ্গে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে সিআইডি। তাদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার তদন্তের স্বার্থে তাদের বিরুদ্ধে রিমান্ডের পৃথক আবেদন প্রক্রিয়াধীন।
সিআইডি বলছে, এই চক্রের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না এবং একই কৌশলে আরও কোনো ব্যক্তি প্রতারণার শিকার হয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চক্রটির অন্য সদস্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
জেইউ/বিআরইউ
