বিজ্ঞাপন

চট্টগ্রামে ৬০ বছর ধরে জেলেদের ভরসা ‘রশির বাজার’ ওমর আলী মার্কেট

চট্টগ্রামে ৬০ বছর ধরে জেলেদের ভরসা ‘রশির বাজার’ ওমর আলী মার্কেট

চট্টগ্রামের মৎস্যজীবীদের কাছে দীর্ঘ ৬০ বছর ধরে এক আস্থার নাম ‘রশির বাজার’ খ্যাত ওমর আলী মার্কেট। কর্ণফুলী নদীর তীরঘেঁষা পাথরঘাটা এলাকার এই বাজার শুধু সাধারণ কোনো ব্যবসাকেন্দ্র নয়; এটি জাল, রশি ও মাছ ধরার সরঞ্জাম সরবরাহের মাধ্যমে চট্টগ্রামের বিশাল মৎস্য অর্থনীতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আনোয়ারা, বাঁশখালী, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপসহ কক্সবাজার জেলার উপকূলীয় এলাকার হাজারো জেলের সমুদ্রযাত্রার নেপথ্যের চালিকাশক্তি হিসেবে যুগের পর যুগ ধরে কাজ করে আসছে ঐতিহাসিক এই বাণিজ্যকেন্দ্র।

একজন জেলের জাল ছিঁড়ে গেলে কিংবা ট্রলারের রশি নষ্ট হলে মাঝসমুদ্রে তার যাত্রা থেমে যেতে পারে। দ্রুত নতুন সরঞ্জাম সংগ্রহের সুযোগ থাকলে সেই ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়। এ কারণে ফিশারিঘাটের কাছাকাছি থাকা এই বাজার শুধু ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, মাছ ধরার পুরো অর্থনীতির জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চট্টগ্রাম নগরের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকার একটি পাথরঘাটা। প্রতিদিন পণ্য ওঠানামা ও ছোট-বড় নৌযানের আনাগোনার মধ্যেই আশরাফ আলী রোডের ওমর আলী মার্কেটের অবস্থান যেন আলাদা এক জগৎ। বাণিজ্যিক নগরের মধ্যে বাইরে থেকে দেখলে সাধারণ টিনশেড বা আধাপাকা ঘরের বাজার মনে হলেও ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি মূলত জেলে, মাছ ব্যবসায়ী ও নৌযানকেন্দ্রিক একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র।

মাছ ধরার জাল, রশি, সুতা, জাল মেরামতের সরঞ্জামসহ নানা উপকরণের দোকান ঘিরে বাজারটির বিশেষ পরিচিতি গড়ে উঠেছে। বর্তমান ব্যবসায়ীরা বিস্তারিত বলতে না পারলেও প্রবীণদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারটির প্রায় ৬০ বছরের ঐতিহ্য রয়েছে। ১৯৬৮ সালের দিকে নগরের বাকলিয়া এলাকার বাসিন্দা ওমর আলী এখানে ব্যবসা শুরু করেন। পরে তিনি মার্কেটের মতো একটি পরিবেশ তৈরি করলে এটি ‘ওমর আলী মার্কেট’ নামে পরিচিতি পায়।

নগরের প্রবেশপথের ব্যস্ততম এলাকার এই বাজারটি ভৌগোলিকভাবে চারটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক—মেরিনার্স ড্রাইভ, ইকবাল রোড, আশরাফ আলী রোড ও আসাদগঞ্জ সংযোগ সড়কের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত। মার্কেট সূত্রে জানা যায়, এখানে প্রায় ২০০টি রশি, জাল ও মাছ ধরার অন্যান্য সরঞ্জামের দোকান রয়েছে। এসব দোকানে প্রায় ১৫০ জন ব্যবসায়ী এবং প্রায় এক হাজার কর্মচারী কাজ করেন। মৌসুম অনুযায়ী প্রতিটি দোকানে প্রতিদিন দুই থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়।

পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা মোহাম্মদ রফিক গত ৩৫ বছর ধরে এই মার্কেটে ‘রফিক স্টোর’ নামে ব্যবসা করছেন। বর্তমানে বাবার ব্যবসার হাল ধরেছেন ছেলে আরফাত। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা দীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে এই মার্কেটে ব্যবসা করেছেন। এখন আমি তার ব্যবসা পরিচালনা করছি। আমাদের দোকানে বিদেশি জাহাজ থেকে আনা প্রায় ৪৫ ধরনের রশি রয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন আকার ও মানের রশি পাওয়া যায়। পাশাপাশি নতুন রশিও বিক্রি করি।’

এই মার্কেটের আরেক পুরোনো ব্যবসায়ী তাসিফ এন্টারপ্রাইজের মালিক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন। সাতকানিয়ার এই বাসিন্দা ১২ বছর ধরে এখানে ব্যবসা করলেও জাল-রশির সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা ২০ বছরের। তিনি বলেন, ‘সমুদ্রের জেলেদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকার মাছ ব্যবসায়ী ও নৌযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা এখান থেকে সরঞ্জাম কিনে থাকেন। জেলেরা মাছ ধরতে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে নেন, আবার জাল ছিঁড়ে গেলে বা রশি নষ্ট হলেও দ্রুত এসে সংগ্রহ করেন। তাই এই বাজারের সঙ্গে জেলেদের দীর্ঘদিনের একটি সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।’

রশির বাজারে গিয়ে দেখা যায়, জালের সুতা থেকে শুরু করে সব ধরনের রশি মেলে এখানে। সাগরের মৎস্যজীবী কিংবা পুকুরে মাছ চাষ করা মৎস্যজীবীদের জাল ছিঁড়ে গেলে তা মেরামতের প্রয়োজন হয়। নৌকা ও ট্রলার পরিচালনার ক্ষেত্রেও প্রয়োজন হয় বিভিন্ন আকারের রশি। ফিশারিঘাটের খুব কাছে হওয়ায় মাছ আহরণ, পরিবহন ও বিপণনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কাছে এই বাজারের কদর সবচেয়ে বেশি। তবে আধুনিক সরঞ্জাম, নতুন ধরনের সিনথেটিক জাল, আমদানিনির্ভর পণ্য এবং পরিবর্তিত প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এখানকার প্রবীণ ব্যবসায়ীদেরও পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।

সমুদ্র থেকে মাছ আহরণের নেপথ্যে থাকে একটি বিশাল সরবরাহব্যবস্থা। নৌকা, ইঞ্জিন, জ্বালানি, জাল, রশি, সুতা, বরফ, মাছ সংরক্ষণ ও পরিবহন—প্রতিটি ধাপের সঙ্গে যুক্ত অসংখ্য মানুষের গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকেন্দ্র এই ওমর আলী মার্কেট। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, পুরোনো বাজারের অবকাঠামো, সরু রাস্তা, যানজট, পণ্য সংরক্ষণ ও অগ্নিনিরাপত্তার মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাজারটি পরিকল্পিতভাবে উন্নত করা গেলে মৎস্য খাতের এই কেন্দ্রটি আরও কার্যকর হয়ে উঠতে পারে। উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় প্রায় ৭০ হাজার মৎস্যচাষি রয়েছেন।

ওমর আলী মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাব্বির চৌধুরী ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এটি বন্দরনগরীর একটি ঐতিহাসিক ব্যবসায়ী এলাকা। আমরা ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়েও সজাগ থাকি। পরিবেশ অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস ও আয়কর বিভাগের মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন মেনে চলতে ব্যবসায়ীদের সচেতন ও জবাবদিহির আওতায় রাখা হয়, যাতে রাষ্ট্রের কোনো বিষয়ে ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ না থাকে।’

বাজারটির অর্থনৈতিক গুরুত্ব সম্পর্কে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রুনা সাহা ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘নদী, মাছ আর মানুষের অর্থনীতির সঙ্গে ওমর আলী মার্কেট জড়িয়ে আছে। এটি শুধু একটি বাজারের গল্প নয়, এটি চট্টগ্রামের নদী, সমুদ্র, মাছ ও জেলেদের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি অর্থনৈতিক গল্প। যে জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান, তার নৌকার জালে যে সুতা লাগে, হাতে যে রশি থাকে–সেসবের অনেক কিছুরই যোগসূত্র রয়েছে এই বাজারের সঙ্গে।’

‘রশির বাজার’ নামে পরিচিত ওমর আলী মার্কেটকে শুধু একটি পুরোনো বাজার হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব ধরা পড়ে না। চট্টগ্রামের মৎস্য অর্থনীতির দৃশ্যমান অংশ ফিশারিঘাট হলেও, তার নেপথ্যে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের অন্যতম কেন্দ্র এই মার্কেট। কর্ণফুলীর তীরের এই বাজার তাই চট্টগ্রামের নদী-সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতির এক নীরব অধ্যায়।

এমআর/বিআরইউ