বিজ্ঞাপন

ক্যাব-এর জ্বালানি উপদেষ্টা

বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো বেসরকারি খাতে দিলে ভোক্তার খরচ আরও বাড়বে

বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো বেসরকারি খাতে দিলে ভোক্তার খরচ আরও বাড়বে

বিদ্যুৎ ডিস্ট্রিবিউশন (বিতরণ) কোম্পানিগুলোকে বেসরকারি খাতে দেওয়া হলে ভোক্তাদের বিদ্যুৎ খরচ আরও প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম।

তিনি বলেন, ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলো লোকসান করছে-এমন অজুহাতে এগুলো বেসরকারিকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। অথচ এসব কোম্পানি বর্তমানে লোকসানে নেই; বরং দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত হয়ে লাভজনক অবস্থায় রয়েছে।

রোববার (২৩ আগস্ট) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের অডিটরিয়ামে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র (এমপিপি) থেকে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রযোজ্য ট্যারিফ নির্ধারণের প্রস্তাব নিয়ে গণশুনানিতে তিনি এ কথা বলেন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এ গণশুনানির আয়োজন করে।

অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, সংকটের সময় সরকার সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু বেসরকারি ব্যবসায়ীদের মূল লক্ষ্য থাকে মুনাফা বৃদ্ধি। ফলে ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলো বেসরকারি খাতে দেওয়া হলে বিদ্যুতের ব্যয় আরও বেড়ে গিয়ে এর চাপ শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে।

তিনি দাবি করেন, ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলো বর্তমানে আর্থিকভাবে সক্ষম অবস্থায় রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রতি ১ টাকা ৪৩ পয়সা রাজস্ব পাওয়ার পর একটি ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব উদ্বৃত্ত ছিল। সরকার যে দামে বিদ্যুৎ কিনুক বা বিক্রি করুক, বিতরণ কোম্পানিগুলো তাদের নির্ধারিত চার্জ ও রিটার্ন ঠিকই পেয়ে যাচ্ছে।

গণশুনানিতে সঞ্চালন চার্জ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ক্যাবের এই জ্বালানি উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বর্তমানে সঞ্চালন চার্জ ৩৮ পয়সা নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের (এমপিপি) ক্ষেত্রে কেন প্রায় দেড় টাকা অতিরিক্ত চার্জ ধরার প্রস্তাব করা হয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। তার মতে, এ ধরনের পার্থক্য বৈষম্যের সৃষ্টি করছে।

এমপিপির মিটার রিডিং ও বিলিং সমন্বয়ের জন্য পিডিবিকে অতিরিক্ত ৫ পয়সা দেওয়ার প্রস্তাবেরও সমালোচনা করেন তিনি। বলেন, এই চার্জ নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু অনুমানের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব খরচ, ন্যায্যতা ও যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিতে হবে।

নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন তোলেন অধ্যাপক শামসুল আলম। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট আইনের ৬(১৭) ধারা অনুযায়ী নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণের এখতিয়ার কমিশনের। কিন্তু বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভাগই মূল্য নির্ধারণের কাজ করে থাকে।

বিইআরসির কারিগরি কমিটি সৌরবিদ্যুতের মূল্য প্রতি ইউনিট ৬ টাকা ৪৮ পয়সা নির্ধারণ করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই মূল্য অত্যন্ত বেশি। ডলারের মূল্য সমন্বয় করলেও ভারত ও পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের মূল্য যথাক্রমে প্রায় ৩ টাকা ৮০ পয়সা ও ৩ টাকা ৯০ পয়সার বেশি হয় না বলে তিনি দাবি করেন।

মূল্য নির্ধারণে ব্যবহৃত বিভিন্ন প্যারামিটার ও ক্যালকুলেশন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। বিশেষ করে রেডিয়েশন ক্যালকুলেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা ও অসম্পূর্ণতা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন। ৬ টাকা ৪৮ পয়সা ট্যারিফ কীভাবে ন্যায্য ও যৌক্তিক হয়েছে, তা প্রমাণ করার জন্য বিইআরসির প্রতি চ্যালেঞ্জ জানান তিনি।

পিডিবির উপস্থাপিত সমন্বিত প্রতিবেদনকে ‘চমৎকার একাডেমিক কাজ’ আখ্যা দিয়ে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, গণশুনানির উপযোগী করার জন্য প্রতিবেদনটিতে বিইআরসি আইন ও সংশ্লিষ্ট রেগুলেশন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় তথ্য ও কমপ্লায়েন্সের ঘাটতি রয়েছে।

বর্তমান আইপিপিগুলোর মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতিকেও সমালোচনা করেন তিনি। তার ভাষায়, আইপিপিগুলোর প্রাইসিং মডেল ‘লুণ্ঠনমূলক’। কয়লা ও অন্যান্য বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও বিদ্যুতের দাম নির্ধারণের পদ্ধতিতে বড় ধরনের গ্যাপ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এসব অসঙ্গতি সংশোধনের দাবি জানান তিনি।

বিদ্যুৎ সরবরাহ ও কার্যক্রম তদারকিতে একটি স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম চালুর প্রস্তাবও দেন অধ্যাপক শামসুল আলম। তার মতে, বিইআরসির অর্থায়নে ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে এ ধরনের একটি ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব। এর মাধ্যমে পিডিবির কাজের চাপ কমানোর পাশাপাশি অটোমেশনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানো সম্ভব হবে।

বিদ্যুৎ খাতের অব্যবহৃত সক্ষমতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। এলপিজি ও এলএনজি টার্মিনালের মতো বিদ্যুৎ খাতেও অনেক সক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব অব্যবহৃত সক্ষমতার ব্যয় ও ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের বহন করতে হচ্ছে।

দেশীয় উদ্যোক্তাদের সৎভাবে ব্যবসা করে বড় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিইআরসি চেয়ারম্যানের কাছে লাইসেন্স ও ক্লিয়ারেন্সের ক্ষেত্রে কার্যকর ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস’ নিশ্চিত করার অনুরোধ করেন তিনি। তার মতে, উদ্যোক্তাদের যেন কোনো লাইসেন্স বা অনুমোদন পেতে ঘুষ কিংবা অতিরিক্ত অর্থ দিতে না হয়।

অধ্যাপক শামসুল আলম আরও বলেন, নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণে আইনগত বিধান লঙ্ঘিত হয়ে ভোক্তাদের আর্থিক ক্ষতি হলে সংশ্লিষ্ট আইনের ৪২ ও ৪৩ ধারা অনুযায়ী জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। সেখানে তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

গণশুনানিতে তিনি বিদ্যুৎ খাতে মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতা, তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ, আইনগত কমপ্লায়েন্স এবং ভোক্তাস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি জানান।

এমএমএইচ/জেডএস

বিজ্ঞাপন