বিজ্ঞাপন

ইউনিফর্মধারীদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ, চার মাসেও সন্ধান নেই মিরাজের

ইউনিফর্মধারীদের তুলে নেওয়ার অভিযোগ, চার মাসেও সন্ধান নেই মিরাজের

বাগেরহাটের মোটরসাইকেল চালক মিরাজ শেখকে কোস্ট গার্ড সদস্যরা তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেছে তার পরিবার। গত ১০ এপ্রিল তাকে নিয়ে যাওয়ার পর চার মাসের বেশি সময় পার হলেও এখনো তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি বলে দাবি পরিবারের। মিরাজকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে সংবাদ সম্মেলন করেছে তার পরিবার ও হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি।

সোমবার (২০ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করা হয়।

মিরাজের বোন লিজা ইসলাম বলেন, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টার দিকে বাগেরহাটের জয়মনি ঠোড়ার কোচঘাট হারবাড়িয়া স্টেশন থেকে দুইজন সিভিল পোশাকধারী কোস্ট গার্ড সদস্য এবং তাদের সঙ্গে থাকা মিজান মাঝি একটি নৌকায় করে জয়মনি এলাকায় আসেন। কোস্ট গার্ড সদস্যরা মিরাজকে মান্নানের জালিবোটে তুলে হারবাড়িয়া স্টেশনে নিয়ে যান। কোস্ট গার্ড সদস্যরা একটি ছোট নৌকায় এসেছিলেন। মিরাজসহ মোট চারজনকে হারবাড়িয়া স্টেশনে ফিরতে হতো। ছোট নৌকায় চারজনকে নেওয়া সুবিধাজনক না হওয়ায় মিজান মাঝিকে বড় বোট আনার জন্য পাঠানো হয়। কিন্তু তার আসতে দেরি হওয়ায় সামনে দিয়ে যাওয়া মান্নানের বোট ব্যবহার করা হয়। মান্নান তাদের হারবাড়িয়া স্টেশনে নামিয়ে দেন।

লিজা ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, হারবাড়িয়া স্টেশনে নেওয়ার আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে মোংলার দিক থেকে একটি কোস্ট গার্ডের স্পিডবোট আসে। ওই স্পিডবোটে আনুমানিক আট থেকে ১০ জন ইউনিফর্ম পরিহিত কোস্ট গার্ড সদস্য ছিলেন। স্পিডবোটটির গায়ে স্পষ্টভাবে ‘বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড’ লেখা ছিল। তারা মিরাজ শেখকে ওই স্পিডবোটে করে নিয়ে চলে যায়। ঘটনাটি উপস্থিত গ্রামবাসী ও মিরাজের স্ত্রীর সামনেই ঘটে বলে দাবি করেন তিনি।

মিরাজের মোটরসাইকেলটি চাবিসহ আলামিন দোকানদারের জিম্মায় রাখা ছিল জানিয়ে লিজা বলেন, মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার প্রায় ১০ থেকে ১১ দিন পর গভীর রাতে রবিন নামে এক কোস্ট গার্ড সদস্য ও মিজান মাঝি এসে মোটরসাইকেলটি নিয়ে যান। রবিন নিজেকে কোস্ট গার্ডের লোক হিসেবে পরিচয় দেন এবং কার্ড দেখান। মিরাজকে নিয়ে যাওয়ার পর ২৩ এপ্রিল একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। গত ১০, ১১ ও ১২ এপ্রিল কোস্ট গার্ড সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা মিরাজ তাদের হেফাজতে থাকার বিষয়টি স্বীকার করেন। অপরাধ না পাওয়া গেলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তারা।

তিনি বলেন, গত ১১ এপ্রিল সকালে মিরাজের স্ত্রী দিগরাজ কোস্ট গার্ড বেজে গেলে উকাসিং নামে এক সদস্য জানান, মিরাজকে নিয়ে অপারেশনে যাওয়া হবে। ভেতর থেকে একজন কর্মকর্তা তাকে কিছু খেতে দিতে বলেন, কারণ সে আগের রাত থেকে না খেয়ে ছিল। তবে বিকেলে গেলে শাহিন নামে এক কর্মকর্তা মিরাজকে আটকের বিষয়টি অস্বীকার করেন।

মিরাজের সন্ধানে ৮ মে ও ২৬ মে সংবাদ সম্মেলন এবং ৯ জুন মানববন্ধন করা হয় বলেও জানান লিজা। তিনি অভিযোগ করেন, ১১ জুন হারবাড়িয়া কোস্ট গার্ড স্টেশনে গ্রামবাসী ও পরিবারের সদস্যরা খোঁজ নিতে গেলে কোস্ট গার্ড সদস্যরা তাদের ওপর লাঠিচার্জ করেন। এ সময় মিরাজের মা, স্ত্রী ও বোনকে মারধর ও আটক করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দিয়ে ২৭ দিন জেলে রাখা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

লিজা আরও অভিযোগ করেন, গত ২ ও ৩ আগস্ট নাজমুল মেম্বারের ডিপোতে স্থানীয়দের ডেকে নিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং অর্থ দিয়ে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর ভিডিও জবানবন্দি ও স্বাক্ষর নেওয়া হয়। চ্যানেল নাইনের রিপোর্টার এমএম ফিরোজ একটি সত্য রিপোর্ট করলেও কোস্ট গার্ডের চাপে তা ডিলিট করা হয় এবং পরে একটি ভিত্তিহীন রিপোর্ট করা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, ১১ আগস্ট মিরাজের পরিবারকে থানায় ডেকে বিভ্রান্তিকর প্রশ্ন করা হয়। ১৫ আগস্ট আবারও স্থানীয়দের ভয়ভীতি দেখিয়ে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়ার জন্য ভিডিও করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে মিরাজের স্ত্রী মুক্তা ফাতেমা বলেন, স্বামীকে ফিরে পেতে তারা মানববন্ধন করেছিলেন। এরপর তাদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়। তার ওপর হামলা চালানো হয় এবং তাদের মারধর করে মামলা দেওয়া হয়। পরে তারা ২৭ দিন জেলে ছিলেন। এরপরও এখন পর্যন্ত স্বামীর কোনো খোঁজ পাননি বলে জানান তিনি।

মিরাজের মা তাসলিমা বেগম বলেন, ছেলেকে ধরে নেওয়ার দিন শুক্রবার ছিল এবং তিনি মোংলায় ছিলেন। খবর পেয়ে মোটরসাইকেলে করে বাড়িতে গিয়ে দেখেন, একটি কোস্ট গার্ডের বোট এসেছে। সেখানে আট থেকে ১০ জন কোস্ট গার্ড সদস্য ছিলেন। তার ছেলেকে হাতে হ্যান্ডকাফ পরানো ছিল। একটি সাদা বোট, যার নিচের দিকে কিছুটা লাল দাগ ছিল, সেটিতে করে মিরাজকে দিগরাজ নিয়ে যাওয়া হয়।

তাসলিমা বেগম বলেন, পরদিন তিনি ও তার পুত্রবধূ দিগরাজ যান। রাতে তারা আবার মেম্বারের কাছে যান। মেম্বার ফোন দেওয়ার পর তার ফোন না ধরলেও একটি নম্বর দেন। ওই নম্বরে তার পুত্রবধূ কথা বলেন। তখন বলা হয়, ‘মিরাজকে আমরা এনেছি, আমরা ছেড়ে দেব তিনদিন পর।’

তিনি বলেন, মিরাজকে কী দোষে ধরা হয়েছে জানতে চাইলে বলা হয়, সন্দেহের ভিত্তিতে তাকে ধরা হয়েছে। তিন দিন পর ছেড়ে দেওয়া হবে এবং কান্নাকাটি না করতে বলা হয়। পরদিন সকালে তারা কোস্ট গার্ডের অফিসে যান। তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং তার পুত্রবধূ ভেতরে গিয়ে কোস্ট গার্ডের পা ধরে স্বামীকে দেখানোর অনুরোধ করেন। তখন বিকেলে আসতে বলা হয় এবং মিরাজকে অপারেশনে নিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়। এরপর থেকে ছেলের আর কোনো দেখা পাননি বলে জানান তাসলিমা বেগম।

তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে ফিরে চাই।’

মানবাধিকার কর্মী নুর খান লিটন বলেন, প্রচলিত আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তিকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আটক করা যেতে পারে। আটকের পর তাকে সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে আদালতে পাঠাতে হবে বিচারের জন্য।

তিনি বলেন, ১০ এপ্রিল মিরাজ শেখ নিখোঁজ হয়েছেন বলা হলেও নিখোঁজ কথাটি বলা ঠিক হবে কি না, সেটি নিয়েও প্রশ্ন আছে। কারণ এলাকার অনেকে দেখেছেন, কোস্ট গার্ডের সাদা পোশাকধারী কয়েকজন সদস্য তাকে নিয়ে গেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কোস্ট গার্ডের কাছে মিরাজের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আটক করে আদালতে পাঠানো উচিত ছিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

নুর খান লিটন আরও বলেন, ২০২৬ সালে সংশোধিত ফৌজদারি কার্যবিধিতে কোনো ব্যক্তিকে আটক করতে হলে যিনি আটক করবেন তাকে তার পরিচয় প্রকাশ করতে হবে। যাকে আটক করা হবে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, সেটিও প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি, আটক ব্যক্তির পরিবার বা আত্মীয়কে জানাতে হবে কী বিষয়ে তাকে আটক করা হলো এবং তিনি বর্তমানে কোথায় আছেন।

তার দাবি, মিরাজের ক্ষেত্রে এসব কিছু ঘটেনি। এটি আইনের সরাসরি লঙ্ঘন বা অমান্যতা। কোস্ট গার্ড প্রথম থেকে মিরাজ তাদের হেফাজতে থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও কিছুদিন পর থেকে তারা বলছে, মিরাজ তাদের হেফাজতে নেই এবং তারা তাকে নেয়নি।

নুর খান লিটন বলেন, মিরাজ শেখকে সুস্থ দেহে সুস্থভাবে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এটাই তাদের প্রত্যাশা। পাশাপাশি, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে দেশের প্রচলিত আইনের মাধ্যমে বিচার করারও দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লে. কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড কর্তৃক মিরাজ শেখকে কোনো সময় আটক, হেফাজতে গ্রহণ বা গুম করা হয়নি। অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট ইউনিটের অপারেশনাল রেকর্ড, টহল কার্যক্রম, দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের উপস্থিতি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট তথ্যাদি বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হয়। অনুসন্ধানে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড কর্তৃক মিরাজ শেখকে আটক, জিজ্ঞাসাবাদ বা হেফাজতে নেওয়ার কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মিরাজ শেখ সুন্দরবনকেন্দ্রিক বনদস্যু চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বনদস্যু ছোট সুমন বাহিনীর লজিস্টিক সহায়তা, মাদকসেবন ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, বনদস্যু চক্রের মুক্তিপণ ও চাঁদার প্রায় ৬ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার সঙ্গে বাহিনীর অভ্যন্তরীণ বিরোধের সৃষ্টি হয়েছিল। এ ছাড়া, তার বাবা আগে একটি বনদস্যু বাহিনীর সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে আত্মসমর্পণ করেন।

এমএসি/এসএএস