বিজ্ঞাপন

ডাকসুর প্রকাশনায় শহিদ ওসমান হাদির ৪৪ বক্তব্যের সংকলন ‘বারুদমাখা কথামালা’

ডাকসুর প্রকাশনায় শহিদ ওসমান হাদির ৪৪ বক্তব্যের সংকলন ‘বারুদমাখা কথামালা’

শহীদ শরীফ ওসমান হাদির ৪৪টি বক্তব্য নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) প্রকাশিত বক্তব্য সংকলন ‘বারুদমাখা কথামালা’ এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) বিকেল ৪টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জুলাই শহীদ স্মৃতি ভবন অডিটোরিয়ামে এ মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়। ডাকসুর সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের সম্পাদনায় প্রকাশিত বইটিতে বিভিন্ন সময়ে শহীদ ওসমান হাদির দেওয়া ৪৪টি বক্তব্য সংকলিত হয়েছে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে কোরআন তেলাওয়াত করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ক্বারি আব্দুল্লাহ আল জাওয়াদ। পরে ইসলামি সংগীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী আহমেদ আতাউল্লাহ সালমান।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক ড. মাহমুদুর রহমান। এ ছাড়া, বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক ও সাবেক প্রেস সচিব শফিকুল আলম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী, সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু, সংসদ সদস্য ডা. মারদিয়া মমতাজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদসহ অনেকে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম। সঞ্চালনা করেন ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য আফসানা আক্তার। অনুষ্ঠানে ডাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। ডাকসুর পক্ষ থেকে জানানো হয়, শারীরিক প্রতিবন্ধী পাঠকদের জন্য বইটির ব্রেইল সংস্করণ এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায়ও বই প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের বলেন, শহীদ ওসমান হাদি সাংস্কৃতিক বিপ্লবে বিশ্বাস করতেন। তার ধারণা ছিল, এ অঞ্চলে যত রাজনৈতিক বিপ্লবই হোক না কেন, সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া মানুষের ভাগ্যের প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।

সংসদ সদস্য ডা. মারদিয়া মমতাজ বলেন, ওসমান হাদি আমাদের ওপর অনেক দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। তার বক্তব্য ও চিন্তাভাবনার সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে তার চিন্তা থেকে প্রয়োজনীয় বিষয় বাস্তবায়নের কথাও বলেন তিনি।

সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতু বলেন, ভারতের সঙ্গে ন্যায্য পানি বণ্টন, ওসমান হাদির হত্যাকারীদের ফিরিয়ে আনা এবং জুলাই গণহত্যার সঙ্গে জড়িতদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।

ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম বলেন, ওসমান হাদি যেভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নটি উপস্থাপন করতেন, এ দেশে খুব কম মানুষই আগে এভাবে বিষয়টি সামনে এনেছেন। হাদি বিশ্বাস করতেন, জুলাই এখনো শেষ হয়নি এবং মানুষের লড়াই মূলত একটি সাংস্কৃতিক লড়াই।

সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, ওসমান হাদি প্রায়ই বলতেন, সংসদে যেতে পারলে তিনি বাকি ২৯৯ সংসদ সদস্যের ঘুম হারাম করে দেবেন। কিন্তু তার হত্যার বিচার এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।

এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী বলেন, ওসমান হাদি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন এবং তাদের নানা পরামর্শ দিতেন। রাজনৈতিক দলগুলো অনেক সময় তার চিন্তা ও পরামর্শকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি। তার মৃত্যুর পর হাদি যে বাংলাদেশপন্থি রাজনীতির রূপরেখা রেখে গেছেন, তা আরও বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, বিভিন্ন পডকাস্ট, সাক্ষাৎকার ও অন্যান্য মাধ্যমে ওসমান হাদি যেসব বক্তব্য রেখে গেছেন, সেগুলো একটি শক্তিশালী চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করে। সমাজ, রাষ্ট্র এবং জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে হাদি কীভাবে চিন্তা করতেন, তার বক্তব্যগুলোতে তার প্রতিফলন রয়েছে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা এসব বক্তব্য একত্র করেই ডাকসু সংকলনটি প্রকাশ করেছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মাহমুদুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড, গুম-নির্যাতন ও জুলাই গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আশ্রয়স্থল হিসেবে ভারত বারবার সামনে আসছে। তার দাবি, শেখ হাসিনা, হাদির হত্যাকারী এবং জুলাই গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত সাবেক মন্ত্রী-এমপিদের অনেকে ভারতে অবস্থান করছেন।

তিনি বলেন, শহীদ শরীফ ওসমান হাদি বাঙালি মুসলমানের নিজস্ব পরিচয় ও সাংস্কৃতিক সত্তাকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব আরও সংহত করতে নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় শক্তিশালী করার বিকল্প নেই। এ কারণেই হাদি ‘কালচারাল রেভল্যুশন’ বা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কথা বলতেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ওসমান হাদির সঙ্গে ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণ করে মাহমুদুর রহমান বলেন, তিনি ও হাদি একসঙ্গে হাদির মায়ের লাশ কবরে রেখেছিলেন। পরে তাকেই হাদির লাশ কবরে রাখতে হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের একটি শক্তিশালী প্রতীক হয়ে ওঠার কারণেই হাদি হত্যার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন বলে তিনি মনে করেন।

সভাপতির বক্তব্যে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম বলেন, শহীদ ওসমান হাদির বক্তব্যগুলো প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মানুষের কাছে ছড়িয়ে দিতে হবে। হাদির স্বপ্নের পরিবর্তনকে শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।

তিনি বলেন, কিছু মানুষ পৃথিবীতে না থাকলেও তাদের চিন্তাধারা ও আদর্শ মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকে। শহীদ শরীফ ওসমান হাদি তেমনই একজন। তিনি মানুষের অব্যক্ত কথাগুলো কীভাবে উচ্চারণ করতে হয়, তা শিখিয়ে গেছেন।

সাদিক কায়েম আরও বলেন, ক্যাম্পাসে যদি আবার গেস্টরুম-গণরুম ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয় কিংবা শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন করা হয়, তাহলে ওসমান হাদির শিক্ষা থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

শহীদ ওসমান হাদির স্মৃতি ও চিন্তাধারা সংরক্ষণে আধিপত্যবাদবিরোধী ও ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এজেডআর/এসএএস