বিজ্ঞাপন

সংসদে তিন বিল উত্থাপন, যাচাই-বাছাইয়ে গেল কমিটিতে

সংসদে তিন বিল উত্থাপন, যাচাই-বাছাইয়ে গেল কমিটিতে

গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে এর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ তোলা হয়েছে। একই দিনে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন করতে আরেকটি বিল আনা হয়েছে। এ ছাড়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের জন্যও আরেকটি বিল আনা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) জাতীয় সংসদে আলাদাভাবে বিল তিনটি তোলা হয়। বিলগুলো পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। এর আগে বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।

মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সংসদে উঠল গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬। এতে গুম করার অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সংসদের বৈঠকে বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে বিলটি পরীক্ষা করে সংসদের প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়।

উত্থাপিত বিলে বলা হয়, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গুম একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ বিল পাস হলে গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠা করবে।

গুমের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে-কোনো সরকারি কর্মচারী কিংবা কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী (যেমন: সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা, র‍্যাব বা যেকোনো যৌথ বাহিনী) নিজ পরিচয়ে বা সরকারের সমর্থনে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণ করে এবং স্বাধীনতা হরণ করার বিষয়টি অস্বীকার করে কিংবা তার অবস্থান গোপন রাখে, তবে তা গুম বলে গণ্য হবে।

গুমের ফলে মৃত্যু ঘটলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। 

বিলে গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভুক্তভোগীদের তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তাদের জন্য সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

খসড়া অনুযায়ী গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি, পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য গুম সনদ দেওয়া, কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণ এবং গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

গুমের অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে এখতিয়ার সম্পন্ন ম্যাজিষ্ট্রেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের বরাবরে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। এতে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা এবং সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে। গুমের মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ করেছিল। সেখানে গুমের অভিযোগ তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে। অবশ্য বর্তমান সরকার ওই অধ্যাদেশটি সংসদে অনুমোদন করেনি। এখন তারা নতুন বিল এনেছে।

বিলে উল্লেখ করা হয়, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। এক্ষেত্রে কোনো পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বা স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকার ওই অভিযোগের তদন্তভার অভিযুক্ত শৃঙ্খলাবাহিনী ব্যতিরেখে অন্য কোনো শৃঙ্খলাবাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে অর্পণ করবে।

বিলে বলা হয়, এখতিয়ার সম্পন্ন দায়রা জজ আদালত গুমের অপরাধের বিচার করবে। অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। এ সময়ে সম্ভব না হলে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।

বিলে আরও বলা হয়, এখতিয়ার সম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় যে দাখিলকৃত অভিযোগটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে বিচার্য তাহলে তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংগৃহীত সাক্ষ্যপ্রমাণ চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পাঠাতে হবে। 

মানবাধিকার কমিশন আইন করতে বিল

২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন করতে সংসদে বিল তোলা হয়। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বিলটি সংসদে তোলেন। 

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে এই কমিশনের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল। এখন যে আইন করা হচ্ছে সেখানেও কিছু ক্ষেত্রে কমিশনের ক্ষমতা বিদ্যমান আইনের তুলনায় বিস্তৃত করা হচ্ছে। তবে কমিশন গঠনের জন্য বাছাই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এবং আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের যে ক্ষমতা প্রস্তাব করা হয় তা নিয়ে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। কমিশন কতটা স্বাধীন থাকবে সেটা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

বিলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপার্সন ও কমিশনারদের নিয়োগের লক্ষ্যে সুপারিশ দেওয়ার জন্য একটি বাছাই কমিটি করার কথা বলা হয়। কমিটিতে থাকবেন স্পিকার (সভাপতি), আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দল ও বিরোধী দল মনোনীত দুজন সংসদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ইউজিসি মনোনীত একজন অধ্যাপক, রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন নাগরিক প্রতিনিধি, নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন প্রতিনিধি।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা অধ্যাদেশে বলা হয়েছিল, বাছাই কমিটির সভাপতি হবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত আপিল বিভাগের একজন বিচারক। সদস্যদের মধ্যে থাকবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সরকারি দলের একজন সংসদ সদস্য, বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্য, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, একজন নাগরিক প্রতিনিধি, একজন সাংবাদিক প্রতিনিধি এবং একজন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধি।

এখন যেভাবে বাছাই কমিটি প্রস্তাব করা হয় তাতে এখানে সরকারি দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে করা অধ্যাদেশে শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হয় কমিশনকে। সংসদে উত্থাপিত বিলে এটি রাখা হয়নি। বিলে শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে অনুসরণীয় পদ্ধতি শিরোনামে আলাদা একটি ধারা রয়েছে। এ ধরনের ধারা ২০০৯ সালের আইনেও রয়েছে।

বিলে বলা হয়, শৃঙ্খলা বাহিনী বা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন নিজ উদ্যোগে বা কোনো আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। এ প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হলে কমিশন আর কোনো উদ্যোগ নেবে না। আর সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে সুপারিশ পেশ করবে। এ রকম সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান তার গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে লিখিতভাবে কমিশনকে অভিহিত করবে।

সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনে বিল

১৮৮২ সালের দ্যা ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টে সংশোধনে বিল আনা হয়েছে। আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন। পরে বিলটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। 

বিলে বলা হয়, পিতা-মাতা বা পিতামহ/মাতামহ কর্তৃক তার সন্তান বা নাতি-নাতনিকে (অথবা বিপরীতক্রমে) অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পর দাতা নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে, সম্পত্তির ভোগাধিকার থাকবে এবং আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের নিকট স্থানান্তরিত হবে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে আইনমন্ত্রী বলেন, বিদ্যমান আইনে সম্পত্তি হস্তান্তরের পদ্ধতি সম্পর্কে বিধান থাকলেও দাতার জীবনকাল পর্যন্ত সম্পত্তির ভোগাধিকার সংরক্ষণ করে দান করার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। প্রস্তাবিত জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান হবে সম্পত্তি হস্তান্তরেরে একটি স্বতন্ত্র পদ্ধতি। এই বিধান সব ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য হবে। এর ফলে প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীন হেবা বা আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্য কোনো প্রকার সম্পত্তি হস্তান্তরের উপর কোনো প্রভাব পড়বে না বা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি তৈরি করবে না।

এসআর/আরএফ