বিজ্ঞাপন

প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংশোধনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সংশোধনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকার সঠিকতা এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে। বিগত সরকারের আমলে অমুক্তিযোদ্ধাদের সুবিধা প্রদান, ভুয়া সনদের ব্যবহার এবং শহীদের সঠিক সংখ্যা নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করাকেই এখন প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এ প্রেক্ষাপটে প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলায় সরেজমিনে গবেষণা চালিয়ে আগামী ১-২ বছরের মধ্যে এক লাখ ৯৬ হাজার গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার তালিকা পুরোপুরি শোধন ও পরিশোধনের মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি ঢাকা পোস্ট-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ, শহীদ ও বীরাঙ্গনাদের সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রণয়ন, নাতি-নাতনি কোটার কঠোর বিরোধিতা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ তালিকা চূড়ান্তে সরকারের ভবিষ্যৎ রূপরেখা তুলে ধরেছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন ঢাকা পোস্টের চিফ অব পলিটিক্যাল অ্যান্ড স্টেট অ্যাফেয়ার্স আদিত্য রিমন

ঢাকা পোস্ট: বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধান সমস্যা কী বলে আপনি মনে করছেন?

ইশরাক হোসেন: মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো চিকিৎসাজনিত সংকট। আমরা চেষ্টা করছি কীভাবে তাদের আরও ভালো সেবা দেওয়া যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের বক্তব্য অনুযায়ী সরকারি বরাদ্দ অপ্রতুল হলেও বর্তমান অর্থবছরে ভাতা ও সামগ্রিক বাজেট কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি আহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চুক্তিবদ্ধ হাসপাতালগুলো থেকে যেন উন্নত ও নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছি।

ঢাকা পোস্ট: বর্তমানে কতজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা জীবিত আছেন? আপনাদের কাছে কি সঠিক তথ্য রয়েছে?

ইশরাক হোসেন: অবশ্যই, আমাদের মন্ত্রণালয়ে এই ডাটা সংরক্ষিত রয়েছে। তবে, এই মুহূর্তে আপনাকে নির্দিষ্ট সংখ্যাটি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণে ‘মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট’ গঠিত হয়েছে; তাদের কাছেও এসব খেতাবপ্রাপ্তদের আলাদা ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষিত আছে।

dhakapost

ঢাকা পোস্ট: মুক্তিযোদ্ধা তালিকা নিয়ে নানা বিতর্ক ও ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নাম থাকার অভিযোগ রয়েছে। এ নিয়ে আপনাদের চিন্তাভাবনা কী?

ইশরাক হোসেন: বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো একটি সঠিক ও নির্ভুল মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়ন করা। বিগত সরকার এই তালিকায় অমুক্তিযোদ্ধাদের অন্তর্ভুক্ত করায় বিষয়টি নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পর আমরা যেখানেই যাচ্ছি, সাধারণ মানুষসহ প্রবীণ মুক্তিযোদ্ধারা জানতে চাইছেন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাদ দিতে ও রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় বন্ধে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে আমাদের অবস্থান একদম পরিষ্কার। তালিকা সংশোধনে করণীয় ঠিক করতে সম্প্রতি আমরা বীর প্রতীক ও বীর বিক্রম খেতাবপ্রাপ্তসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে মতবিনিময় করেছি। একটি বাস্তবসম্মত কর্মপদ্ধতি চূড়ান্ত হলে আমরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তা সংবাদমাধ্যমকে জানাব।

তালিকা সংশোধনের জন্য আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছি। আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে সরেজমিনে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করার। এ জন্য একটি বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে, যার মাধ্যমে পুরো তালিকাটিকে নতুন করে যাচাই-বাছাই ও পরিমার্জন করা সম্ভব হবে।

ঢাকা পোস্ট: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকায় রাজাকারের নাম এবং রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম চলে আসায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। সেই তালিকা সংশোধন বা পুনর্গঠন করার কোনো চিন্তাভাবনা আছে কি?

ইশরাক হোসেন: আমরা প্রাথমিকভাবে তিনটি তালিকাকে লক্ষ্য রেখে কাজ শুরু করেছি।
 
প্রথমত, কারা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা এবং কারা অমুক্তিযোদ্ধা— তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা। বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৯৬ হাজারের বেশি মানুষ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত ও তালিকাভুক্ত রয়েছেন এবং তাদের স্মার্ট কার্ডও দেওয়া হয়েছে। এই সুবিশাল তালিকাটিকে সংশোধন করা একটি বড় কর্মযজ্ঞ।

দ্বিতীয়ত, মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সঠিক সংখ্যা ও তালিকা প্রণয়ন করা। ১৯৭১ সালের জঘন্য গণহত্যার বৈশ্বিক ও জাতিসংঘ স্বীকৃতি অর্জনের প্রক্রিয়াটি শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য না থাকায় এখনও ঝুলে আছে। তাই শহীদের তালিকা ও সংখ্যা নিয়ে যাতে কোনো বিতর্ক না থাকে, সেই লক্ষ্যে কাজ চলছে। 

তৃতীয়ত, বীরাঙ্গনাদের বিদ্যমান তালিকাটি সঠিক ও সুনির্দিষ্ট করা। যদিও স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এই কাজ অত্যন্ত কঠিন; কারণ বেশিরভাগ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিই এখন আর জীবিত নেই এবং যারা বেঁচে আছেন তাদের বয়সও ৭০ পেরিয়েছে। এছাড়া, যুদ্ধের সময় বাস্তুচ্যুত হওয়া মানুষের তালিকা তৈরির সুপারিশ এসেছে। একই সঙ্গে রাজাকারদের একটি সঠিক ও সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রণয়ন করা যায় কি না, আমরা সেটিও খতিয়ে দেখছি।

ঢাকা পোস্ট: অমুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা ভুয়া সনদ বানিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চাকরি করছেন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে কি না?

ইশরাক হোসেন: আমাদের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটি আগে ত্রুটিমুক্ত ও সঠিক করা। তালিকা চূড়ান্ত হলে পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নিয়ে ভাবা যাবে। অমুক্তিযোদ্ধা হয়েও যারা মুক্তিযোদ্ধা সনদে কোটায় চাকরি করছেন, তাদের বিষয়ে আপাতত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত না হলেও পরবর্তীতে সুনির্দিষ্ট একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হবে।

ঢাকা পোস্ট: ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদেরও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার একটা দাবি উঠেছিল। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন?

ইশরাক হোসেন: আমি শুরু থেকেই অত্যন্ত ঘৃণাভরে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আসছি। আমি মনে করি, এই অযৌক্তিক সুবিধার মাধ্যমে তৎকালীন সরকার বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছিল। আমি কোনোভাবেই এটাকে সমর্থন করি না।

ঢাকা পোস্ট: মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে নানাবিধ বিতর্ক রয়েছে। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে কী চিন্তাভাবনা করছে?

ইশরাক হোসেন: ১৯৭২ সাল থেকেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ওই সময়টাতে (৭২ ও ৭৩ সাল) মুক্তিযুদ্ধকে আওয়ামী লীগ তাদের ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত করার অপচেষ্টা চালিয়েছিল। আমরা এ ধরনের কোনো দলীয় ইতিহাস চাই না। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে আমি মনে করি, সঠিক ইতিহাস সবার সামনে উন্মোচিত হওয়া উচিত। যুদ্ধে যার যতটুকু অবদান ও ভূমিকা ছিল, তার প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

dhakapost

ঢাকা পোস্ট: রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বিদেশে মারা যাওয়া অনেক মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ দেশে আনতে বা জীবিতকালে ফিরতে সমস্যা তৈরি করা হয়েছিল— যেমনটি ঘটেছিল আপনার বাবা সাদেক হোসেন খোকার ক্ষেত্রেও। পাশাপাশি সম্প্রতি কিছু বীর মুক্তিযোদ্ধা লাঞ্ছিত হয়েছেন। এসব বিষয়ে আপনাদের পরিকল্পনা কী?

ইশরাক হোসেন: মুক্তিযোদ্ধাদের লাঞ্ছিত করার বিরুদ্ধে আমরা রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিবাদ জানিয়েছি। এখন সরকারের জায়গায় থেকে আমরা কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করব। যখনই কোনো অভিযোগ পাওয়া যাবে, তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে; এ ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, যে মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান বা তার অর্জনকে অস্বীকার করবে, সে মূলত বাংলাদেশকে অস্বীকার করবে। সরকারের পক্ষ থেকে আইন ও বিধি মোতাবেক কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

এছাড়া, প্রবাসে থাকা কোনো অসুস্থ বা বয়োবৃদ্ধ মুক্তিযোদ্ধা জীবনের শেষ মুহূর্তে দেশে ফিরতে চাইলে, বিগত সরকারের মতো অমানবিক আচরণ করা হবে না। মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্য থেকে তাদের জন্য যথাযথ সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।

ঢাকা পোস্ট: জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে জাতিসংঘের দেওয়া শহীদদের তালিকা ও দেশের অভ্যন্তরীণ তালিকার মধ্যে কিছু পার্থক্যের চিত্র দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী?

ইশরাক হোসেন: জাতিসংঘের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী শহীদের সংখ্যা ১ হাজার ৪০০ জন, আর আমাদের দলীয় (বিএনপি) তথ্যমতে এই সংখ্যা ২ হাজারের কাছাকাছি। অবশ্য এখন পর্যন্ত সরকারি গেজেটে ৮৪৩ জনের নাম স্থান পেয়েছে। তবে, তদন্তের পর কিছু নাম বাদও গেছে। কারণ, তারা সরাসরি আন্দোলনকারী ছিলেন না; হাসপাতালে নিহতের তালিকা তৈরির সময় অন্যান্য সাধারণ নিহতের নামও যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। অথবা তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছিলেন কিংবা আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছিলেন।

আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ হলো, নিহতদের একটি বড় অংশই ছিলেন ছিন্নমূল পথশিশু। পরিবারের নির্দিষ্ট কোনো উত্তরাধিকার না থাকায় তাদের পক্ষে তথ্য বা দাবি নিয়ে কেউ সামনে আসেননি, যা সংখ্যার তারতম্যের অন্যতম প্রধান কারণ। এছাড়া, অনেক শহীদের মা-বাবা অত্যন্ত প্রবীণ ও অক্ষম হওয়ায় প্রতিবেশীদের সহায়তায় বহু কষ্টে গেজেটভুক্ত হতে পেরেছেন।

আমরা শহীদদের পাশাপাশি আহত জুলাই যোদ্ধাদের তালিকাও আরও পূর্ণাঙ্গ করার কাজ করছি। তবে, এই প্রক্রিয়াটি অনন্তকাল ধরে ঝুলিয়ে রাখা যাবে না— যেমনটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার ক্ষেত্রে করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে ভুয়া নাম অন্তর্ভুক্তির বড় সুযোগ করে দিয়েছিল। এ ধরনের পরিস্থিতি এড়াতে আমরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে এগোচ্ছি।

এএইচআর/এমএআর