রাজনৈতিক প্রভাব, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, দুর্বল বিচারব্যবস্থা, মব ভায়োলেন্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির কারণে দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর ইনক্লুসিভ পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্সের (সিআইপিজি) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকের বক্তারা।
তারা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হতে না পারলে দেশে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
শনিবার (২৯ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ হলে গবেষণাভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান সিআইপিজির আয়োজিত ‘আইন-শৃঙ্খলা অবনতির বহুমাত্রিক কারণ ও টেকসই সমাধানের উপায়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা।
সিআইপিজির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। আলোচনায় অংশ নেন সিআইপিজির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক সিনিয়র সচিব মো. সফিউল্লাহ, সাবেক সচিব মো. হুমায়ুন কবীর, ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার বাদী ও সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. মাসদার হোসেন, ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এবিএম গোলাম মুস্তফা এবং সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. আবদুল কাইয়ুম। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সাবেক সচিব মোহাম্মদ আব্দুল কাইয়ুম।
সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মো. মোজাম্মেল হক বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে খুন ও সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করছে। আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি অপরাধের মূল কারণ চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সুনাগরিক তৈরির জায়গা হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সমাজের প্রতিটি স্তরকে এগিয়ে আসতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়নে সরকার, বিরোধী দল, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের আহ্বান জানান তিনি।
মূল প্রবন্ধে ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির বলেন, নাগরিকরা সরকারকে কর দেয় এবং তাদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তার অভিযোগ, দেশের ইতিহাসে পুলিশব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে জনগণের নিরাপত্তার চেয়ে ক্ষমতাসীনদের অনুগত প্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
তিনি বলেন, অপরাধবিদ্যার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও গবেষণায় পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই। এ ছাড়া পুরোনো পুলিশ আইন, হত্যার সংজ্ঞা নিয়ে আইনি সীমাবদ্ধতা, দুর্বল তদন্তব্যবস্থা এবং পুলিশের অপরাধ পুলিশের মাধ্যমেই তদন্ত করার সংস্কৃতি আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলেছে।
বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে নির্দোষ ব্যক্তিদের বছরের পর বছর কারাগারে থাকতে হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, বিচার বিভাগ থেকে সরকার বছরে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করলেও খাতটিতে বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ২৬০ কোটি টাকা। তিনি বিচারব্যবস্থার উন্নয়নে সদিচ্ছা ও দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের ওপর জোর দেন।
সিআইপিজির ভাইস চেয়ারম্যান মো. সফিউল্লাহ আইন-শৃঙ্খলা অবনতির পেছনে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, বিচারে দীর্ঘসূত্রিতা, মামলার জট, অপ্রতুল পুলিশ সদস্য এবং যুবসমাজের বেকারত্বকে দায়ী করেন। সমাধানে স্বাধীন বিচার বিভাগ ও এলাকাভিত্তিক কমিউনিটি পুলিশব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, জরুরি রাজনৈতিক ও সংবিধান সংস্কার, বিভিন্ন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং দ্রুত বিচার নিষ্পত্তির আহ্বান জানাচ্ছি।
সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. মাসদার হোসেন বলেন, দেশে বিচারপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার কারণে উচ্চ ও নিম্ন আদালতে বিপুলসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। তার মতে, সামাজিক শৃঙ্খলা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অপরাধ কমিয়ে আনা সম্ভব।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এবিএম গোলাম মুস্তফা বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও সুশাসনের অভাবের কারণে দেশে মব ভায়োলেন্স বাড়ছে। বেকারত্ব, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিসহ বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও অপরাধ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে হবে। নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে সরকার ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছি।
/এমএইচএন/এমএসএ
