বিজ্ঞাপন

ব্যাগ ধরে টান ছিনতাইকারীর

চোখের চিকিৎসা করাতে এসে পথেই থেমে গেল শিক্ষিকা রনজিলার জীবন

চোখের চিকিৎসা করাতে এসে পথেই থেমে গেল শিক্ষিকা রনজিলার জীবন

চোখে সমস্যা। চিকিৎসককে দেখাতে হবে। সেই প্রয়োজনেই স্বামী আব্দুল মতিনকে সঙ্গে নিয়ে বগুড়া থেকে ঢাকার পথে রওনা হয়েছিলেন প্রধান শিক্ষক রনজিলা পারভিন।পরিবারের আশা ছিল, চোখের চিকিৎসা করিয়ে আবারও বাড়ি ফিরবেন তিনি। ফিরে যাবেন বগুড়ার সেই পরিচিত জীবনে। ফিরবেন স্কুলে। দাঁড়াবেন শিক্ষার্থীদের সামনে। কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না।

হাসপাতালে যাওয়ার পথেই রাজধানীর সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা এলাকায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারান ৫৪ বছর বয়সী এই শিক্ষিকা।

শনিবার (২৯ আগস্ট) ভোরে ঢাকার গাবতলীতে বাস থেকে নেমে স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে রিকশায় চড়ে ফার্মগেটের খামারবাড়ি এলাকায় ইস্পাহানী ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন রনজিলা পারভীন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই থেমে যায় তার জীবনের পথ।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংসদ ভবন এলাকায় পৌঁছালে দ্রুতগতির একটি মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি রনজিলার হাতে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগ টান দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় তিনি রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে যান। রাস্তায় পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান তিনি।

রিকশা থেকে পড়ে যাওয়া রনজিলাকে উদ্ধার করে স্বামী আব্দুল মতিন নিয়ে যান শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

নিহত রনজিলা পারভিন বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তার বাড়ি উপজেলার সোনাকানিয়া গ্রামে।

স্বামী আব্দুল মতিন ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে তিনি বগুড়া শহরের রহমাননগর এলাকায় বসবাস করতেন। তার স্বামী ব্যবসা করেন। তাদের একমাত্র মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রনজিলার ছোট ভাই তাবেজ আহমেদ বলেন, চোখের চিকিৎসার জন্য আমার বড় বোন ও তার স্বামী শুক্রবার রাত ১২টার বাসে বগুড়া থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। শনিবার ভোরে তারা গাবতলী পৌঁছান। এরপর রিকশায় করে চক্ষু হাসপাতালের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই ছিনতাইকারী পরিবারের সবকিছু বদলে দেয়।

তাবেজ বলেন, সংসদ ভবন এলাকায় মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি আমার বোনের ব্যাগ টান দিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। এ সময় তিনি রিকশা থেকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ময়নাতদন্ত শেষে বোনের মরদেহ নিয়ে বগুড়ার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছি।

পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল রনজিলার পরিচয়। ১৯৮৮ সালের জানুয়ারিতে সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন তিনি। পরে পদোন্নতি পেয়ে বাগবাড়ি সরকারি বালিকা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ মর্গ সূত্রে জানা গেছে, রনজিলার মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। মাথায় আঘাত ও রক্তক্ষরণের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

এ ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে পুলিশ। ফুটেজে দ্রুতগতির একটি সুজুকি জিক্সার এসএফ মোটরসাইকেলে দুজনকে যেতে দেখা গেছে।

পুলিশ জানায়, মোটরসাইকেল চালকের মাথায় হেলমেট ছিল এবং তার গায়ে ছিল সাদা শার্ট। পেছনে বসা ব্যক্তির মুখে মাস্ক এবং গায়ে ছিল নীল রঙের শার্ট। তবে ছিনতাইয়ের মূল দৃশ্যটি এখনো কোনো সিসিটিভি ক্যামেরায় পাওয়া যায়নি। মোটরসাইকেলটির নম্বর প্লেটও অস্পষ্ট।

শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, ভোর ৫টা ৫৩ থেকে ৫৪ মিনিটের দিকে একটি মোটরসাইকেলে থাকা দুই ব্যক্তি এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। নিহত শিক্ষিকার স্বামী বাদী হয়ে থানায় মামলা (মামলা নং-২৩) করেছেন। আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে।

তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, ছিনতাইয়ের ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাবও কাজ করছে।

তিনি বলেন, মোটরসাইকেলটি শনাক্তের চেষ্টা চলছে। তবে নম্বর প্লেট অস্পষ্ট হওয়ায় তা শনাক্ত করা যায়নি। একজনের মাথায় হেলমেট ও অন্যজনের মুখে মাস্ক থাকায় তাদের শনাক্ত করতে বেগ পেতে হচ্ছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রনজিলার ভ্যানিটি ব্যাগে একাধিক মোবাইল ফোন ও কিছু টাকা ছিল। তার একটি মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান মিরপুর এলাকায় পাওয়া গেলেও পরে সেটি বন্ধ হয়ে যায়।

এসএএ/জেডএস

বিজ্ঞাপন