চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে নারী সহকর্মীকে হয়রানি, অনৈতিক প্রস্তাব, ছবি-ভিডিও ধারণ এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে কর্মচারী সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগের পর হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটি তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
অভিযোগকারী হাসপাতালের ইসিজি সহকারী টেকনিশিয়ান ফাতেমা বেগম। গত ২৭ আগস্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে তিনি সাইফুলের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করেন।
অভিযোগে ফাতেমা দাবি করেন, সাইফুল বিভিন্ন সময়ে তাকে ইসিজি কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া, ইসিজি সহকারী টেকনিশিয়ানের দায়িত্ব কেড়ে নেওয়া এবং সাদা অ্যাপ্রোন খুলে নেওয়ার কথা বলে ভয় দেখিয়েছেন। তিনি বাসার ঠিকানা জানতে চেয়ে ব্যক্তিগতভাবে কথা বলতে চেয়েছেন এবং অনৈতিক প্রস্তাব দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন ফাতেমা।
ফাতেমার দাবি, ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর সাইফুল তার পিছু নিয়ে বাসার সামনেও গিয়েছিলেন। এতে নিজের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, দায়িত্ব পালনকালে সাইফুল ইসিজি কক্ষে এসে মোবাইল ফোনে তার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতেন। ফাতেমা দায়িত্বের প্রয়োজনে বাইরে গেলে সাইফুল ইসিজি কক্ষে গিয়ে ভিডিও ধারণের পাশাপাশি তিনি কোথায় গেছেন, তা অন্য সহকর্মীদের কাছে জানতে চাইতেন।
ফাতেমার অভিযোগ, ইসিজি কক্ষে রোগীর চাপ বেশি থাকলে সাইফুল রোগীদের সামনে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন মন্তব্য করতেন এবং কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে উৎসাহিত করতেন। একপর্যায়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে, এক রোগী তাকে মারতে এগিয়ে আসেন। পরে তিনি হাসপাতালের পরিচালককে ফোন করলে একজন সুপারভাইজার এসে তাকে সহযোগিতা করেন বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাইফুলের আচরণের কারণ জানতে নিরাপত্তাকর্মী ফারুকের সঙ্গে কথা বলার পর তাকে এক লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছেন ফাতেমা। তার দাবি, ফারুক তাকে বলেছিলেন, সাইফুলকে এক লাখ টাকা দিলে বিষয়গুলো আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানোর পর গত ২৪ আগস্ট ফারুক তাকে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আগেও সাময়িক বরখাস্ত
হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট সাইফুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। ওই আদেশে হাসপাতালের অভ্যন্তরে অনৈতিক কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ এবং সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া তথ্যের উল্লেখ ছিল। পরে তাকে চাকরিতে পুনর্বহাল করা হয় বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই সময়ও দলীয় প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করা হয়েছিল। তবে এ দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটির এক সদস্য, চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের এক প্রভাবশালী শীর্ষ নেতা এবং হাসপাতালের এক পরিচালকের প্রভাব কাজে লাগিয়ে সাইফুল নিয়মিত বিভিন্ন নারী সহকর্মীর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করে আসছেন। তবে এই অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বরখাস্তের সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন হয়নি
সাম্প্রতিক অভিযোগের পর হাসপাতালের কার্যনির্বাহী কমিটি সাইফুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। বৃহস্পতিবার হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নুরুল হককে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে কার্যনির্বাহী কমিটি সূত্রে জানা গেছে।
তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সাইফুলকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি। কেন কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি, সে বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. নুরুল হকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
অভিযোগের বিষয়ে সাইফুল ইসলাম বলেন, আমি ক্লিনিং সুপারভাইজার। তিনি অন্য বিভাগে কাজ করেন। ওই নারীর সঙ্গে আমার কোনো বিরোধ নেই। কেউ হয়ত তাকে দিয়ে মিথ্যা অভিযোগ করিয়েছে।
চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতাল কার্যনির্বাহী কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম আজাদ ঢাকা পোস্টকে বলেন, একজন নারী কর্মী সাইফুলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযুক্তকে সাময়িক বরখাস্ত করার জন্য বৃহস্পতিবার পরিচালককে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমি ঢাকায় আছি। অফিসে না থাকায় বিস্তারিত জানি না।
এদিকে অভিযোগকারী ফাতেমা ইসিজি কক্ষ ও সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং তদন্ত চলাকালে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
আরএমএন/এমএন
