চোরা শিকার, বন উজাড়, নগরায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ থেকে গত কয়েকশ বছরে ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিলুপ্ত প্রজাতির মধ্যে রয়েছে ১১টি স্তন্যপায়ী, ১৯টি পাখি ও একটি সরীসৃপ। বন্যপ্রাণীর ক্রমবর্ধমান এই সংকটের মধ্যে দেশের প্রাণিকূলের অবস্থা নতুন করে মূল্যায়নে ২০২৬ সালে রেড লিস্ট হালনাগাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। একইসঙ্গে গঠন করা হয়েছে বন্যপ্রাণী কমিশন।
রোববার (৩০ আগস্ট) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের লিখিত জবাবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এসব তথ্য জানান। প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপন করা হয়। এসময় সংসদ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
মন্ত্রীর দেওয়া তথ্যমতে, আইইউসিএন-এর ২০১৫ সালের জরিপে দেখা যায়, কয়েকশ বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশ থেকে ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি স্তন্যপায়ী, ১৯টি পাখি এবং একটি সরীসৃপ।
তিনি বলেন, চোরা শিকার, বন উজাড়, নগরায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। বন্যপ্রাণীর প্রধান আবাসস্থল বনভূমি হওয়ায় বনাঞ্চল কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রজাতি দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
আইইউসিএন-এর ‘রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ-২০১৫’ অনুযায়ী, দেশে ১ হাজার ৬১৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৪৯ প্রজাতির উভচর, ১৬৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৬৬ প্রজাতির পাখি, ১৩৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৫৩ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ, ১৪১ প্রজাতির ক্রাস্টেশিয়ান ও ৩০৫ প্রজাতির প্রজাপতি।
সংসদে দেওয়া উত্তরে মন্ত্রী জানান, ২০১৫ সালের রেড লিস্টের পর এবার ২০২৬ সালে দেশের প্রাণিকূলের রেড লিস্ট হালনাগাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে বর্তমানে কোন কোন প্রজাতি কী মাত্রায় হুমকির মুখে রয়েছে, সে বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে সরকার চলতি বছর বন্যপ্রাণী কমিশনও গঠন করেছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি বন অধিদপ্তরের আওতাধীন বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, অবৈধ পাচার রোধ এবং বন্যপ্রাণী-সংক্রান্ত অপরাধ দমনে কাজ করছে।
মন্ত্রী আরও জানান, বাঘ, এশীয় হাতি, গাঙ্গেয় ডলফিনসহ বিভিন্ন সংরক্ষণনির্ভর প্রজাতির সুরক্ষায় বন অধিদপ্তর দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
সরকারের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে দেশে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালে তা বেড়ে ১১৪ এবং ২০২৪ সালে ১২৫টিতে পৌঁছায়। সে হিসাবে ২০১৮ সালের তুলনায় বাঘের সংখ্যা ৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং ২০১৫ সালের তুলনায় ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়েছে।
বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকার প্রতিরোধে ১০০টি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, ৫০টি স্কুলের শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করে সচেতনতা কার্যক্রম এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
এশীয় হাতি সংরক্ষণে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে ‘হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করছে সরকার। অন্যদিকে, মহাবিপন্ন শকুন সংরক্ষণে সুন্দরবন ও সিলেট অঞ্চলে ৪৭ হাজার ৩৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে দুটি শকুন নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে।
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে শেরপুর, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও রাজশাহীতে চারটি নতুন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সৃষ্টির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও সংসদকে জানান পরিবেশমন্ত্রী।
এমএসআই/জেডএস
