‘ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট (অন্তর্বর্তী সরকার) যদি একদিন বা সাত দিনে পারে, তাহলে আমাদের সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হচ্ছে, এই প্রক্রিয়া (ই-টেন্ডার) সহজীকরণ করতে আর কতদিন লাগবে?’ জাতীয় সংসদে এমন প্রশ্ন তুলেছেন বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেন।
শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজীকরণের দাবি জানিয়ে ৭১বিধিতে দেওয়া নোটিশে তিনি জানতে চান, সরকার এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে আর কত সময় নেবে?
জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী আবদুল মঈন খান বলেন, জনগণের স্বার্থে বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে আইন ও বিধি অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।
এ সময় স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী, ছয় মাস চলে গেল, আর কয় মাস লাগবে?’
জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের দ্বিতীয় দিন রোববার (৩০ আগস্ট) জরুরি জনগুরুত্বসম্পন্ন বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাব ও সম্পূরক প্রশ্নে এসব আলোচনা হয়।
বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেন দেশের শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে ৭১ বিধিতে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশ দেন।
নোটিশের জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী আব্দুল মঈ খান বলেন, দেশের উন্নয়নকাজের অংশ হিসেবে গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন বিভিন্ন সংস্থা, জেলা-উপজেলা এবং অন্যান্য ক্রয়কারী কার্যালয় থেকে বিদ্যমান পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস, ২০২৫ অনুযায়ী ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ক্রয়কার্যে মূলত দুটি পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। প্রথমটি সীমিত দরপত্র পদ্ধতি বা এলটিএম, যার নির্দিষ্ট প্রাক্কলিত মূল্য সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। দ্বিতীয়টি উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি বা ওটিএম, যা যেকোনও পরিমাণ মূল্যের জন্য প্রযোজ্য।
মন্ত্রী বলেন, ‘সর্বক্ষেত্রে পিপিআরের আইন ও বিধি সরকার সঠিকভাবে পালন করে থাকে।’ পাবলিক প্রকিউরমেন্টের আইন ও বিধি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রণয়ন করে জানিয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে সেই অনুযায়ী দরপত্র আহ্বানসহ যাবতীয় কার্যক্রম সম্পাদন করা হচ্ছে।
ই-টেন্ডার প্রক্রিয়া সহজীকরণের প্রস্তাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমাদের মন্ত্রণালয় সে বিষয়ে সম্পূর্ণ সজাগ এবং জনগণের স্বার্থে আমরা এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি। যথাসময়ে প্রয়োজনে সেটা আমরা অনুমোদন করব।’
এরপর সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেন বলেন, গত ১৭ থেকে ২০ বছরে অনেক শিক্ষিত যুবক বেকার হয়ে পড়েছেন। তাদের কর্মসংস্থান তৈরির প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘বিগত সরকার তাদের এই টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমাদের সাধারণ কাউকে সেখানে অংশগ্রহণ করতে দেয়নি। সে অংশগ্রহণ প্রক্রিয়া তারা গলা চিপে ধরে তাদেরকে সেখান থেকে বের করে এনেছে।’
সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ইন্টেরিম গভমেন্ট যদি এটাকে একদিন বা সাত দিনে পারে, তাহলে আমাদের বর্তমান সরকারের ছয় মাস অতিবাহিত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া সহজীকরণ করা উচিত বলে আমি মনে করি।’
তিনি বলেন, এতে শিক্ষিত বেকার যুবকসহ দেশের সাধারণ মানুষ টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন। চাকরির বয়স পেরিয়ে যাওয়া ব্যক্তিরাও এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজের সুযোগ পেতে পারেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সংসদ সদস্য আরও বলেন, ‘ইন্টেরিম গভমেন্ট যদি এটাকে একদিন বা সাত দিনে পারে, তাহলে আমার গভমেন্ট এইটা যদি প্রসিডিং অ্যান্ড প্রসিডিং করে, যদি মন্ত্রিসভার সম্মিলিত প্রচেষ্টা নিয়ে যদি বলে যে, এইটা করতে হবে—শুধু বিএনপির জন্য নয়, অল ওভার বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ এই প্রক্রিয়া সহজীকরণের মাধ্যমে অংশগ্রহণ করে অতি দ্রুত যেন এই কাজটা করতে পারে।’
তিনি বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রীর কাছে এটা আমার প্রশ্ন যে, তিনি এটা কতদিনে অতিদ্রুত করবেন—সেটাই এখন আমাদের দেখার বিষয়। জাতি এদিকে তাকিয়ে আছে।’
এরপর ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রী, ছয় মাস চলে গেল, আর কয় মাস লাগবে?’
জবাবে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল, বর্তমান সরকার সেভাবে কাজ করার সুযোগ পায়নি। কারণ বর্তমান সরকার জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আইন-কানুন ও নিয়মের মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘ইন্টেরিম গভমেন্ট তাৎক্ষণিকভাবে যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সেখানে কিন্তু আমাদের দেশের যে জেনারেল রুলস, সংবিধান থেকে শুরু করে বিভিন্ন আইন—সেগুলো কিন্তু তারা অনুসরণ অথবা মান্য করার জন্য বাধ্য ছিল না। এটা ছিল একটা সাময়িক ব্যবস্থা। এটা ছিল একটা বাস্তবতা।’
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে আমরা যেহেতু জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে এসেছি, যেহেতু আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করি, যেহেতু আমরা এই পার্লামেন্টের শক্তিতে বিশ্বাসী, যারা আইন প্রণয়ন করে থাকে, সেই কারণে আমরা কিন্তু প্রত্যেকটি কাজ আইন-কানুনের ভিতর দিয়ে করে থাকি।’
সংসদ সদস্যের অভিযোগ স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘ভালো কাজ করতে গেলে অনেক সময় একটু সময় লাগে। আইন অনুসরণ করতে হয়, নিয়ম-কানুনের ভিতর দিয়ে যেতে হয়। তাড়াহুড়ো করে আমরা যদি কোনও আইনের ব্যত্যয় করি, তাহলে কিন্তু আমরা এই দেশবাসীর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকব।’
তবে সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আপনি যে কথাগুলো বলেছেন অত্যন্ত যুক্তিসংগত।’
তিনি বলেন, কর্মসংস্থান শুধু টেন্ডার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। দেশের সার্বিক অর্থনীতি এবং সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
পরে জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় চিফ হুইপ স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইনমন্ত্রীকে নোটিশের বিষয়ে আরও বলার সুযোগ চান।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৬ এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস, ২০০৮ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সময়ে সংশোধন করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, ‘ফ্যাসিস্টরা এমন একটা স্কিম করেছিল’, যার মাধ্যমে গত ১৭ বছরে বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতের মানুষকে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে দূরে রাখার প্রক্রিয়া করা হয়েছিল।
তিনি বলেন, বিষয়টি শনাক্ত হওয়ার পর সরকার রাতারাতি অনেক পদক্ষেপ নিতে পারত। তবে ‘ডিউ প্রসেসে’ এগোনোর জন্য মন্ত্রিসভা একটি সাব-কমিটি গঠন করেছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অ্যাক্ট এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসকে যুগোপযোগী করে এই সমস্ত সিন্ডিকেট এবং সিন্ডিকেটের যে ব্যারিকেড দেওয়া আছে, সবগুলো ভাঙার জন্য’ কাজ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, এ বিষয়ে গঠিত সাব-কমিটির তিনি চেয়ারম্যান ছিলেন। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করে একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, ‘অচিরেই সেইটা পার্লামেন্টের সামনে আসবে। আসলে আমরা ডিউ প্রসেসে এই সিন্ডিকেট ভাঙার ব্যবস্থা করব বলে আশা করছি, ইনশাআল্লাহ। আমরা খুব অতি দ্রুতই ওই সিন্ডিকেট ভাঙার যে আইন, আইনি প্রক্রিয়ায় আমরা এটা মোকাবিলা করব।’
এমএসআই/এমএসএ
