মাঠপর্যায়ে পুলিশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেও বছরের পর বছর একই পদে আটকে থাকতে হচ্ছে অনেক নন-বিসিএস কর্মকর্তাকে। বিভাগীয় পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় সব ধাপ শেষ করে পদোন্নতির তালিকায় (পিএল) নাম ওঠার পরও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি। দীর্ঘ এই অপেক্ষায় কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পেশাগত মনোবল ও মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়।
পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পদে থাকা কর্মকর্তারা মূলত থানায় মামলা তদন্ত, অপরাধী শনাক্ত, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও মাদকবিরোধী অভিযানসহ সরাসরি মাঠের কাজ পরিচালনা করেন। তবে, একই পদে এক দশক বা তারও বেশি সময় কাটিয়ে দেওয়ায় তাদের অনেকের মধ্যেই পেশাগত ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানার একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে পদোন্নতির জটের এই চিত্র পাওয়া গেছে। তবে, সংবেদনশীল বিষয় হওয়ায় তারা কেউই পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
বিভাগীয় পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় সব ধাপ সম্পন্ন করে ‘প্রমোশন লিস্টে’ (পিএল) নাম ওঠার পরও পদোন্নতি পাচ্ছেন না প্রায় তিন হাজার নন-বিসিএস পুলিশ কর্মকর্তা। ১০ থেকে ১৪ বছর ধরে উপপরিদর্শক (এসআই) পদে আটকে থাকায় কর্মকর্তাদের মধ্যে সামাজিক ও পারিবারিক অস্বস্তির পাশাপাশি পেশাগত তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে
পুলিশের ৩৩তম ব্যাচের (২০১২ সালে প্রশিক্ষণে যোগদানকারী) এক এসআই জানান, চাকরিজীবনের প্রায় ১৪ বছর পার হলেও এখনও একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। তার মন্তব্য, ‘পদোন্নতি নিয়ে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় নিয়মিত, কিন্তু আমার কাছে দেওয়ার মতো সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। দীর্ঘদিন একই পদে কাজ করায় পেশাগত জীবনে স্থবিরতা চলে এসেছে। পরীক্ষা দিয়ে তালিকায় নাম থাকার পরও যখন পদোন্নতি হয় না, তখন হতাশা আরও বাড়ে।’

৩৪ ও ৩৫তম ব্যাচের একাধিক এসআই একই ধরনের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করে জানান, ১০ থেকে ১২ বছর চাকরি করার পরও তাদের যেমন এসআই হিসেবে থাকতে হচ্ছে, আবার সম্প্রতি চাকরিতে যোগ দেওয়া একজন কর্মকর্তা একই পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন। এতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের মধ্যে সামাজিক ও পেশাগত অস্বস্তি তৈরি হচ্ছে।
পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) থেকে এএসপি পদে পদোন্নতির ৩৩ শতাংশ কোটা ঠিকমতো পূরণ না হওয়া এবং ওপরের স্তরে নতুন পদ সৃষ্টি না হওয়ায় নিচের স্তরেও পদোন্নতির পথ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। মামলা তদন্ত ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহা কমে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা ও জনসেবামূলক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে
দীর্ঘ ও জটিল পরীক্ষা প্রক্রিয়া এবং পিএল জট
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, এসআই থেকে পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পদে উন্নীত হতে বিভাগীয় পরীক্ষাসহ একাধিক জটিল ধাপ পার হতে হয়। মাঠপর্যায়ের নিয়মিত ডিউটি পালনের পাশাপাশি এসব কঠিন পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া বেশ চ্যালেঞ্জিং। কেউ প্রথমবারেই সব বিষয়ে উত্তীর্ণ হলে পদোন্নতি পেতে সাধারণত সাত থেকে আট বছর সময় লাগে। তবে, কোনো বিষয়ে আটকে গেলে এই সময় গড়ায় ১০ থেকে ১২ বছর বা তারও বেশি।

অভিযোগ রয়েছে, পরীক্ষার সব ধাপ শেষ করে পিএলভুক্ত (প্রমোশন লিস্ট) হওয়ার পরও পদোন্নতির জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় তিন হাজার এসআই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পিএলভুক্ত হলেও তাদের পদোন্নতি প্রক্রিয়া থমকে আছে। এমনকি বিভাগীয় ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরও ফাইল ৩-৪ মাস আটকে রাখার অভিযোগ করেছেন কোনো কোনো কর্মকর্তা।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, পদোন্নতির ক্ষেত্রে কখনও কখনও মেধা ও জ্যেষ্ঠতার পাশাপাশি অন্যান্য প্রভাব কাজ করে। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই না করেই তাকে পদোন্নতির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে।

পারিবারিক অস্বস্তি ও সামাজিক মর্যাদার সংকট
ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের মতে, পদোন্নতির প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও সব ধাপ শেষ করার পরও কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়ায় ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিয়ে ঘোর অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে বেতন-ভাতা, সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত অবস্থানে প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে।
তেজগাঁও থানায় কর্মরত এক উপপরিদর্শক (এসআই) আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘদিন একই পদে আটকে থাকা শুধু চাকরির ক্ষেত্রেই নয়, পারিবারিক জীবনেও চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজন বা পরিচিত কেউ পদোন্নতির কথা জানতে চাইলে উত্তর দেওয়ার মতো কিছু থাকে না। এক পদে বছরের পর বছর কাজ করতে করতে যে একঘেয়েমি তৈরি হয়, তা পেশাগত দায়িত্বের ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলে।’
নিজের হতাশা প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘আমাদের এই কষ্টের কথা আমরা কার কাছে বলব? মনে হয় আমাদের সমস্যা নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যথাই নেই।’
অভিযোগের পর্যালোচনার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই কর্মকর্তা জানান, কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলেই তাকে পদোন্নতির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়; কিন্তু সেই অভিযোগ আদৌ সত্য কি না, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হচ্ছে কি না— তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
অন্যদিকে, ৩৪ ও ৩৫তম ব্যাচের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করে জানান, পদোন্নতির ক্ষেত্রে অনেক সময় মেধা ও জ্যেষ্ঠতার তোয়াক্কা না করে অন্যান্য বাহ্যিক প্রভাব খাটানো হয়। পরীক্ষার সব ধাপ সফলভাবে শেষ করার পরও কাঙ্ক্ষিত পদে যেতে না পেরে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তারা। দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পরও মূল্যায়ন না মেলায় কাজের প্রতি স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ ও উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলছেন মাঠপর্যায়ের এসব কর্মকর্তা।
পরিদর্শক পর্যায়েও জট, মাঠপর্যায়ে প্রভাব
পদোন্নতির এই জট কেবল উপপরিদর্শকদের (এসআই) মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) পর্যায়েও। এসআইরা যেমন দীর্ঘদিন একই পদে আটকে থেকে পরিদর্শক হতে পারছেন না, তেমনি পরিদর্শকদের একটি অংশ সময়মতো পদোন্নতি পেয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) হতে পারছেন না। উচ্চপর্যায়ে পদোন্নতির গতি ধীর হওয়ায় নিচের স্তরেও সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসছে, যা পুলিশের নন-বিসিএস কাঠামোর সার্বিক পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে স্থবির করে দিয়েছে।
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) পরিদর্শক পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা বলেন, পরিদর্শক থেকে এএসপি পদে পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় ৩৩ শতাংশ কোটা নির্ধারিত থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফলে পদোন্নতিপ্রত্যাশী কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম হতাশা তৈরি হচ্ছে এবং তাদের পেশাগত মনোবল ভেঙে পড়ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পরিদর্শক পদে শূন্যতা তৈরি না হলে এসআইদের পদোন্নতির পথ তৈরি হয় না। ফলে ওপরের স্তরে জট না ছুটলে নিচের স্তরের জটিলতাও কাটছে না।
তবে কিছু কর্মকর্তার মতে, নির্ধারিত পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় ধাপ সফলভাবে সম্পন্ন করেই যোগ্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। অনেক এসআই প্রথমবারে সব বিষয়ে উত্তীর্ণ হতে না পারায় পুনরাবৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে এই প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়। পাশাপাশি, নতুন পদ সৃষ্টি না হওয়াকেও এই ধীরগতির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।
তাদের মতে, পরিদর্শক থেকে এএসপি পদে পদোন্নতির গতি বাড়ানো ও নতুন পদ সৃষ্টি করা গেলে পুরো কাঠামোর স্থবিরতা দূর হবে।
পদোন্নতির এই দীর্ঘসূত্রতার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন মাঠপর্যায়ের দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা। থানায় মামলা তদন্ত, আসামি গ্রেপ্তার, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও মাদকবিরোধী অভিযানের মতো স্পর্শকাতর কাজের বড় অংশই এসআই ও পরিদর্শকদের পরিচালনা করতে হয়। পরীক্ষা শেষ করে পিএলভুক্ত হওয়ার পরও পদোন্নতি না মেলায় কর্মকর্তাদের মধ্যে দায়িত্ব পালনে অনাগ্রহ, একঘেয়েমি ও মানসিক চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অভিজ্ঞ এই কর্মকর্তাদের কর্মস্পৃহায় ভাটা পড়লে পুলিশের দৈনন্দিন সেবা ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তার নেতিবাচক প্রতিফলন ঘটতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সমাধানের পথ ও কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া
সংশ্লিষ্টদের মতে, পদোন্নতির এই জটিলতা কাটাতে দ্রুত নতুন পদ সৃষ্টি, উচ্চপর্যায়ে পদোন্নতির সুযোগ বাড়ানো এবং পিএলভুক্ত কর্মকর্তাদের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটানো এখন সময়ের দাবি। পদোন্নতিপ্রক্রিয়া যতটা স্বচ্ছ ও সময়োপযোগী হবে, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনোবলও ততটাই সুদৃঢ় থাকবে। আর কর্মকর্তাদের এই পেশাগত উদ্দীপনা ধরে রাখা সম্ভব হলে পুলিশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সাধারণ মানুষের সেবামূলক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে বলে মনে করছেন তারা।
এ বিষয়ে জানতে পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স উইংয়ের এআইজি এ. এইচ. এম. শাহাদাত হোসাইনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিবেদনটি তৈরিতে তার কোনো বক্তব্য যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
এমএসি/এমএআর/
