বিজ্ঞাপন

তিন বাহিনী, এক বার্তা; নেপথ্যে রহস্যে ঘেরা ভাষানটেকের ‘অস্ত্র অভিযান’

তিন বাহিনী, এক বার্তা; নেপথ্যে রহস্যে ঘেরা ভাষানটেকের ‘অস্ত্র অভিযান’

একটি বিদেশি নম্বর থেকে একই সময়ে পুলিশ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) ও গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) পাঠানো হয় রাজধানীর ভাষানটেক এলাকার একটি বাসায় বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গুলি থাকার তথ্য। বার্তায় নির্দিষ্ট ঠিকানা উল্লেখ করে অস্ত্রের অবস্থানও জানানো হয়।

তথ্য পাওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তিন সংস্থা একযোগে অভিযান চালায়। তবে, কথিত অস্ত্রের সন্ধানে গিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র বা গুলি নয়, উদ্ধার করা হয় পিস্তলসদৃশ দুটি গ্যাস লাইটার। এ ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে— কে এই বিদেশি নম্বর থেকে এমন বার্তা পাঠালেন? আর কী উদ্দেশ্যেই বা একই সঙ্গে তিনটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অস্ত্রের এই তথ্য দেওয়া হলো? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে গোয়েন্দা পুলিশ।

গত শনিবার দুপুরে +৯১ ৮৭৭৮ ২৭০৯৬ নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে এসব বার্তা ও ছবি পাঠানোর স্ক্রিনশট এসেছে ঢাকা পোস্টের হাতে। স্ক্রিনশটে দেখা যায়, বার্তা পাঠানো ব্যক্তি নিজেকে ‘মো. আবদুল্লাহ আল-আমিন শুভ’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন বলেও দাবি করেন।

একটি বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে পুলিশ, র‍্যাব ও গোয়েন্দা পুলিশকে (ডিবি) একই সঙ্গে ভুয়া বার্তা পাঠানোর মাধ্যমে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়। নিজেকে প্রবাসী অপরাধী পরিচয় দিয়ে রাজধানীর ভাষানটেকের একটি ফ্ল্যাটে বিপুল অবৈধ অস্ত্র ও গুলি রাখার সুনির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তিন সংস্থা একযোগে সাঁড়াশি যৌথ অভিযান পরিচালনা করে

বার্তায় তিনি লেখেন, ‘আমি মো. আবদুল্লাহ আল-আমিন শুভ। আমি সন্ত্রাসী ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার নোংরা জীবন থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাই।’ আরেকটি বার্তায় তিনি দাবি করেন, বর্তমানে তিনি প্রবাসে পলাতক রয়েছেন। অতীতে রাজনৈতিক স্বার্থে তাকে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করতে হয়েছে। পরে অর্থের লোভে তিনি অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তিনি আরও লেখেন, ‘পরবর্তীতে অর্থের লোভে বশবর্তী হয়ে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায় গোপনে ও পরিবারে প্রকাশ্যে জড়িয়ে যাই।’

হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় ভাষানটেক এলাকার তিনটি বাসা বা হোল্ডিংয়ের তথ্য দেওয়া হয়। সেগুলো হলো— ১৬০/বি, ৩-ই উত্তর ভাষানটেক, থানা: ভাষানটেক, ঢাকা; ১৬৩/৩, উত্তর ভাষানটেক, থানা: ভাষানটেক, ঢাকা এবং ৬৫/৩, উত্তর ভাষানটেক, থানা: ভাষানটেক, ঢাকা। বার্তায় ওই ব্যক্তি দাবি করেন, অবৈধ উপায়ে অর্জিত অর্থ দিয়ে এসব ফ্ল্যাট কেনা হয়েছে। তবে, বার্তায় করা এসব দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ভাষানটেকের ১৬০/বি নম্বর ‘বিলাস ভবন’-এর একটি ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালিয়ে বার্তায় দাবিকৃত ১৩টি অস্ত্র, ৩০০ রাউন্ড গুলি কিংবা ২৪টি ম্যাগাজিনের কোনো অস্তিত্ব মেলেনি। এর পরিবর্তে ঘর থেকে কেবল পিস্তলসদৃশ দুটি লাইটার উদ্ধার করা হয়। শেষ পর্যন্ত কোনো অবৈধ বস্তু না পাওয়ায় যৌথ বাহিনী শূন্য জব্দ তালিকা দিয়ে অভিযান শেষ করে

‘১৩ অস্ত্র, ৩০০ গুলি’ থাকার দাবি

অন্য একটি বার্তায় নিজেকে আবদুল্লাহ আল-আমিন শুভ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি ভাষানটেকের একটি বাসায় ১৩টি অবৈধ অস্ত্র, ৩০০ রাউন্ড গুলি ও ২৪টি ম্যাগাজিন থাকার দাবি করেন।  তিনি লেখেন, ‘আমার ১৩টি অবৈধ অস্ত্র, ৩০০ রাউন্ড গুলি ও ২৪টি ম্যাগাজিন রয়েছে।’ বর্তমান ঠিকানা হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন— বাসা/হোল্ডিং ১৬০/বি, ৩-ই উত্তর ভাষানটেক, থানা: ভাষানটেক (ডিএমপি), জেলা: ঢাকা। 

অস্ত্রগুলো কোথায় রাখা আছে জানতে চাইলে ওই ব্যক্তি বিস্তারিত অবস্থানের কথা উল্লেখ করে লেখেন, ‘আমাদের ঘরে আলমারিতে কাপড়ের নিচে লাল কস্টেপ দিয়ে পেঁচানো ৮টি অবৈধ অস্ত্র, ম্যাগাজিন ও ২০০ রাউন্ড গুলি রয়েছে।’ বাকি পাঁচটি অস্ত্র ও গুলি নিজের কক্ষের আলমারিতে রয়েছে দাবি করে বার্তায় লেখা হয়, ‘আমার নিজ রুমের আলমারিতে বাকি ৫টি অবৈধ অস্ত্র, ম্যাগাজিন ও ১০০ রাউন্ড গুলি রয়েছে।’ প্রয়োজনে পরিবারের সদস্যদের কক্ষসহ পুরো বাসায় তল্লাশি চালানোর অনুরোধও জানানো হয় ওই বার্তায়।

একযোগে যৌথ অভিযান 

বার্তার তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ, র‍্যাব ও ডিবির সদস্যরা ভাষানটেক এলাকায় একযোগে অভিযান চালান। অভিযান চালানো হয় এম এ হালিম রোডের বাগানবাড়ি এলাকার ১৬০/বি নম্বর ‘বিলাস ভবন’-এ। তবে, তল্লাশি চালিয়ে বার্তায় উল্লেখ করা ১৩টি অস্ত্র, ৩০০ রাউন্ড গুলি কিংবা ২৪টি ম্যাগাজিনের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। অভিযানে কেবল উদ্ধার করা হয় পিস্তলের মতো দেখতে দুটি গ্যাস লাইটার।

তথ্যদাতার পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে রহস্য

এখন পর্যন্ত ওই বিদেশি নম্বর ব্যবহারকারী ব্যক্তির প্রকৃত পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় নিজেকে মো. আবদুল্লাহ আল-আমিন শুভ পরিচয় দিলেও প্রকৃতপক্ষে তিনিই বার্তাগুলো পাঠিয়েছেন কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। একই সঙ্গে কী উদ্দেশ্যে পুলিশ, র‍্যাব ও ডিবিকে একযোগে এত বিস্তারিত অস্ত্রের তথ্য দেওয়া হলো, সেটিও রহস্যজনক।

একই বার্তা তিন প্রধান আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একযোগে পাঠিয়ে যৌথ অভিযান চালানোর ঘটনাটিকে রহস্যজনক বলে মনে করছে গোয়েন্দা পুলিশ। এ ঘটনায় মূল তথ্যদাতার প্রকৃত পরিচয় ও বার্তার উৎস অনুসন্ধানে মাঠে নেমেছে ডিবি। শত্রুতাবশত কাউকে ফাঁসাতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্যে এটি করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে

ঢাকা পোস্টের হাতে আসা হোয়াটসঅ্যাপ বার্তার স্ক্রিনশট ও অস্ত্রসংক্রান্ত ছবি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। গোয়েন্দারা এখন বার্তার উৎস, বিদেশি নম্বরের প্রকৃত ব্যবহারকারী এবং এসব তথ্য পাঠানোর পেছনে কাউকে ফাঁসানো, বিভ্রান্তি সৃষ্টি কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা অনুসন্ধানের চেষ্টা করছেন।

যা বলছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা

অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে ভাষানটেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম হোসেন বলেন, ‘কোন তথ্যের ভিত্তিতে সেখানে অভিযান হয়েছে সে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলতে পারবেন। কে কোথায় কীভাবে মেসেজ দিয়েছেন, সে বিষয়টি আমার জানা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশে শুধু ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম। সেখানে র‍্যাব, পুলিশ ও ডিবি উপস্থিত ছিল। ভাষানটেকের ওই বাসায় অভিযানে কিছুই পাওয়া যায়নি।’

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) রাকিব খাঁন বলেন, ‘গতকাল শনিবার দুপুরের দিকে আমাদের কাছে কিছু তথ্য আসে। একটি বিদেশি নম্বর থেকে ভাষানটেক এলাকায় একটি বাসায় অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে— এমন বার্তার ভিত্তিতে আমাদের একটি টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। ঘটনাস্থলে গিয়ে আমাদের টিম দেখতে পায় সেখানে মিরপুর বিভাগের পুলিশ এবং ‍র‍্যাবের কর্মকর্তারা উপস্থিত রয়েছেন। পরে সেখানে তল্লাশি চালানো হয়, কিন্তু সন্দেহজনক কিছুই পাওয়া যায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ওই ব্যক্তি একই মেসেজ ডিবি, পুলিশ ও র‍্যাবকে দিয়েছিল। ফলে একই সময়ে তিন বাহিনী ওই ঠিকানায় অভিযান চালায়। তবে, ওই ব্যক্তি কেন বা কী কারণে একই মেসেজ তিন বাহিনীকে দিয়েছে, সে বিষয়টি এখনও জানা যায়নি। যে ব্যক্তি ওই বিদেশি নম্বর থেকে মেসেজ দিয়েছিল, তার পরিচয় শনাক্ত ও অনুসন্ধানের কাজ চলছে।’

এদিকে, র‍্যাব-৪ এক খুদে বার্তায় জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গত ২৯ আগস্ট বিকেল ৩টা ৪৯ মিনিট থেকে ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ভাষানটেকের বাগানবাড়ি এলাকার ১৬০/বি নম্বর বাড়িতে অস্ত্র উদ্ধারে যৌথ অভিযান চালানো হয়। র‍্যাব-৪ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব আলমের নেতৃত্বে পরিচালিত এ অভিযানে র‍্যাব ও ভাষানটেক থানা পুলিশের সদস্যরা অংশ নেন। অভিযানে বাড়িটির চতুর্থ তলায় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট অহিদুল হকের ই/৩ নম্বর ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালানো হয়। তবে, কোনো সন্দেহজনক বস্তু বা অস্ত্র না পাওয়ায় ‘শূন্য জব্দ তালিকা’ দিয়ে অভিযান শেষ করে যৌথ বাহিনী।

এসএএ/এমএআর/