বিজ্ঞাপন

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত হিসাবে ঘরে ফিরলেন পথহারা বৃদ্ধা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত হিসাবে ঘরে ফিরলেন পথহারা বৃদ্ধা

চট্টগ্রামে পথহারা এক বৃদ্ধার ঠিকানা উদ্ধারে প্রযুক্তির অভিনব সহায়তা নিলেন নগরীর চকবাজার থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ফিরোজ আলম মুন্সি। অস্পষ্ট ও বিচ্ছিন্ন কিছু তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা চ্যাটজিপিটির দেওয়া সম্ভাব্য সূত্রের সুবাদেই শেষ পর্যন্ত খোঁজ মিলেছে হবিগঞ্জে নিখোঁজ হওয়া রহিমা খাতুনের (৬৫)।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) রাতে চকবাজার এলাকায় এক বৃদ্ধাকে একা ঘুরতে দেখে এক পথচারী তাকে থানায় নিয়ে আসেন। তবে কোনো কাগজপত্র, মোবাইল নম্বর বা পূর্ণ ঠিকানা না থাকায় বিপাকে পড়ে পুলিশ। ডিউটি অফিসারের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে বৃদ্ধাকে নিজের কাছে বসিয়ে কথা বলতে শুরু করেন চকবাজার থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মো. ফিরোজ আলম মুন্সি।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ওই নারী কেবল নিজের নাম ‘রহিমা’ এবং বাড়ি ‘মিরপুর’ বলে জানান। তবে কোন মিরপুর, জেলা বা থানা—সে বিষয়ে কোনো ধারণা দিতে পারেননি তিনি। দীর্ঘক্ষণ কথা বলার পর তার কাছ থেকে জানা যায়, তার মেয়ের জামাইয়ের বাড়ি কুলাউড়া এলাকায়, বড় ছেলের নাম কদর আলী, ছোট ছেলের আরব আলী এবং মেয়ের নাম রুপবানু। এছাড়া তার স্বামী অসুস্থ হয়ে বিছানায় থাকেন বলেও জানান তিনি।

এই বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে এসআই ফিরোজ ধারণা করেন, বৃদ্ধার বাড়ি সিলেট বিভাগের কোনো এলাকায় হতে পারে। কিন্তু ‘মিরপুর’ নামে দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্রাম থাকায় শুধু এই তথ্যে সুনির্দিষ্ট ঠিকানা পাওয়া অসম্ভব ছিল।

পরে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটজিপিটির সহায়তা নেন। বৃদ্ধার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যগুলো ইনপুট দিয়ে জানতে চান, সিলেট অঞ্চলে এমন কোনো মিরপুর এলাকা আছে কি না, যার সঙ্গে কুলাউড়া এলাকার কোনো ভৌগোলিক সংযোগ রয়েছে। 

চ্যাটজিপিটির বিশ্লেষণ থেকে হবিগঞ্জের বাহুবল থানার মিরপুর এলাকার একটি সম্ভাব্য সূত্র পাওয়া যায়।

তবে চ্যাটজিপিটির দেওয়া তথ্যকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে না নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বাহুবল থানায় ফোন করেন এসআই ফিরোজ। তিনি বৃদ্ধার নাম, বয়স এবং তার ছেলে-মেয়ের নাম উল্লেখ করে খোঁজ নিতে অনুরোধ জানান।

খবর পেয়ে বাহুবল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মহসিন রেজা সৌরভ চকবাজার থানার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি জানান, রহিমা খাতুন নামে এক নারীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় ইতোমধ্যে তাদের থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। পরে ছবি ও বিস্তারিত তথ্য বিনিময় করে পরিচয় নিশ্চিত হয় উভয় থানা পুলিশ।

বাহুবল থানার জিডি সূত্রে জানা যায়, গত ২২ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে পরিবারের কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন রহিমা খাতুন। পাঁচ দিন ধরে খোঁজাখুঁজির পর গত ২৭ আগস্ট তার ছেলে কদর আলী বাহুবল থানায় নিখোঁজের জিডি করেন। আর কাকতালীয়ভাবে ওই রাতেই চট্টগ্রাম নগরীর চকবাজার এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। বৃদ্ধার বাড়ি হবিগঞ্জের বাহুবল থানার কামারগাঁও এলাকার ৬ নম্বর মিরপুর ইউনিয়ন বলে নিশ্চিত হওয়া যায়।

চকবাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুর হোসেন মামুন ঢাকা পোস্টকে বলেন, 'এটা আমাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। ক্লুলেস এমন ঘটনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এতদ্রুত আমরা কাজ করতে পারব ভাবিনি। ওই বৃদ্ধা মানসিকভাবে কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। তাকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। 

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রেজাউল করিম ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইকে সহায়ক অনুসন্ধানী প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। নিখোঁজ ব্যক্তির দেওয়া বিচ্ছিন্ন তথ্যগুলোর মধ্যে ভৌগোলিক ও পারিবারিক সংযোগ বিশ্লেষণ করে এআই সম্ভাব্য দিকনির্দেশনা দিতে পারে। তবে একে চূড়ান্ত প্রমাণ না ভেবে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সবসময় মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের মাধ্যমেই তা যাচাই করতে হবে।’

প্রযুক্তির এই ইতিবাচক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে রোববার (৩০ আগস্ট ) স্বজনেরা চট্টগ্রামে এসে রহিমা খাতুনকে শনাক্ত করেন। পরে প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এমআর/আরএফ