চট্টগ্রামের পাহাড়তলী কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মো. মিজানুর রহমান চৌধুরীকে অপহরণ করে টর্চার সেলে আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। এ সময় তার কাছ থেকে ১২ হাজার টাকা নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি চাকরি করতে হলে অধ্যক্ষসহ দুজনকে ১০ লাখ টাকা দিতে এবং বিভিন্ন অভিযোগ প্রত্যাহার করতে চাপ দেওয়া হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় পাহাড়তলী কলেজের অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় মামলা করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) তিনি মামলাটি করেন। মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও চার থেকে পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে অভিযুক্ত অন্যদের মধ্যে রয়েছেন— ওয়াকিল হোসেন বগা, ফয়সাল ওরফে মুরগী ফয়সাল, ইমন, সাজিদ, সালাহ উদ্দিন কাদের ও মনির আহমদ।
পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ওয়াকিল হোসেন বগা নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতা। মামলার পর থেকে বগাবাহিনী হত্যার হুমকি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী শিক্ষক মিজানুর রহমান চৌধুরী। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, মামলার পর থেকে বগা বাহিনী আমাকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। আমি নিরাপত্তা চাই।
ওই ঘটনায় আসামি বগাকে ধরতে শুক্রবার (৪ সেপ্টেম্বর) ভোররাত সাড়ে ৪টার দিকে খুলশীর ওয়্যারলেস মোড় ও পাহাড়তলী এলাকায় অভিযানে নামে পুলিশ। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছামাত্র বগাবাহিনী রাস্তায় ব্যারিকেড সৃষ্টি করে। এরপর পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল, বোতল এবং ককটেলসদৃশ বিস্ফোরক নিক্ষেপ করা হয়। সন্ত্রাসীদের হামলায় খুলশী থানার ওসির সরকারি গাড়িটি ভাঙচুর ও সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়।
এজাহারে শিক্ষক মিজানুর রহমান অভিযোগ করেন, পাহাড়তলী কলেজের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি ও তার সহকর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার। এ বিষয়ে বিভিন্ন দপ্তরে প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তিনি। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ড তদন্ত করছে।
অভিযোগে বলা হয়, গত ২৪ আগস্ট কলেজ ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে তিনি দৈনিক যুগান্তর ও বাংলা এডিশনের প্রতিনিধিদের কাছে কলেজের অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদারের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে বক্তব্য দেন। ২৯ আগস্ট এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর অধ্যক্ষ তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি ও হুমকি দিতে থাকেন।
এজাহার অনুযায়ী, ওই দিন বিকেল ৪টা ১২ মিনিটের দিকে অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদার কলেজের মূল ফটকের সামনে কয়েকজনের সঙ্গে গোপনে কথা বলেন। এর কয়েক মিনিট পর ফয়সাল, ইমন ও সাজিদ নামে তিনজন শিক্ষক মিজানুর রহমানের আবাসিক কক্ষের সামনে গিয়ে তাকে অধ্যক্ষ ও ওয়াকিল হোসেন বগার সঙ্গে দেখা করতে বলেন।
তারা তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে এবং গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়া ও বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ করার কারণে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভুক্তভোগী শিক্ষক মিজানুর রহমান যেতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে মারধর করে নিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। পরে অভিযুক্তরা জোরপূর্বক তার কক্ষে প্রবেশ করে জিনিসপত্র তছনছ করে এবং বালিশের নিচে থাকা ১২ হাজার টাকা নিয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে বিকেল ৪টা ২৯ মিনিটের দিকে তাকে জোরপূর্বক একটি গাড়িতে তুলে নগরের ওয়্যারলেস এলাকার ২ নম্বর লেনের একটি কথিত টর্চার সেলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
সেখানে আগে থেকেই ওয়াকিল হোসেন বগাসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজন অবস্থান করছিলেন বলে অভিযোগ করেন শিক্ষক মিজানুর রহমান। এজাহারে বলা হয়েছে, ফয়সাল, ইমন ও সাজিদ তার কাছ থেকে নেওয়া ১২ হাজার টাকা ওয়াকিল হোসেন বগার কাছে তুলে দেন।
এরপর ওয়াকিল হোসেন বগা ভিডিও কলে অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদারের সঙ্গে কথা বলেন এবং শিক্ষক মিজানুর রহমানকে কী করা হবে জানতে চান বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। অধ্যক্ষ তাকে মারধরের নির্দেশ দেন বলেও অভিযোগ করেন বাদী।
অভিযোগ অনুযায়ী, এরপর ওয়াকিল হোসেন বগা লোহার রড দিয়ে শিক্ষককে বেধড়ক মারধর করেন। একই সময় অজ্ঞাতনামা কয়েকজন হাতুড়ি, লোহার রড ও লাঠি দিয়ে তাকে এলোপাতাড়ি মারধর করে। এ সময় অধ্যক্ষসহ মামলার আরও দুই আসামি ভিডিও কলে সেই নির্যাতন দেখছিলেন বলে এজাহারে দাবি করা হয়েছে।
লোহার রডের আঘাতে তার ডান হাতের আঙুল ভেঙে যায়। হাতের কব্জি ফুলে যায় এবং পিঠ, কোমর ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে রক্তাক্ত ও নীলাফোলা জখম হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে তার কানে লোহার রড দিয়ে আঘাত এবং মুখে রড ঢুকিয়ে দাঁতে আঘাত করার অভিযোগও করেছেন তিনি।
এজাহারে আরও বলা হয়, নির্যাতনের সময় তাকে বলা হয় চাকরি করতে হলে অধ্যক্ষ শ্যামল কান্তি মজুমদার ও ওয়াকিল হোসেনকে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দপ্তরে করা অভিযোগ প্রত্যাহার এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ দিতে চাপ দেওয়া হয়। এসব দাবি না মানলে তাকে হত্যা করার হুমকি দেওয়া হয়।
প্রাণভয়ে তিনি অভিযুক্তদের সব দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানান। এরপর তাকে দিয়ে অধ্যক্ষের পক্ষে একটি বক্তব্য বলানো হয় এবং মোবাইল ফোনে সেই বক্তব্যের ভিডিও ধারণ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পরে আগে থেকে টর্চার সেলে রাখা ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক তার স্বাক্ষর নেওয়া হয়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তাকে ওয়্যারলেস মোড়ে ফেলে রেখে অভিযুক্তরা চলে যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে পথচারীদের সহায়তায় সিএনজি অটোরিকশায় করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান শিক্ষক মিজানুর রহমান। রাত ৯টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা নেন তিনি।
এ বিষয়ে খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আবদুর রহিম বলেন, কলেজ শিক্ষক পেটানোর ঘটনায় নিয়মিত মামলা হওয়ার পর আসামির বিরুদ্ধে থাকা অস্ত্র মামলার ওয়ারেন্ট ও অন্যান্য অপরাধের ভিত্তিতে পুলিশ অভিযানে যায়। কিন্তু আসামিরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে পুলিশের ওপর অতর্কিত হামলা চালায় এবং সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করে।
তিনি বলেন, হামলায় তার নিজের হাতসহ ৫-৬ জন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। বর্তমানে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে এবং ওয়াকিল হোসেনসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
আরএমএন/এমএন
