মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। সামনে শুধু দিন-তারিখ চূড়ান্ত করার অপেক্ষা। সেই বিয়ের আয়োজনের জন্যই গ্রামের বসতভিটার ১১ শতাংশ জমি বিক্রি করেছিলেন বাবা ইসমাইল হোসেন। জমি বিক্রির টাকা থেকে ঋণ শোধ করেছেন, গ্রামের বাড়িতে ঘর তুলেছেন। সবশেষে বাকি ৫ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরের নিজ বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে নিজ জেলা জামালপুর থেকে রওনা হয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু সেই ফেরা আর হলো না। শুক্রবার সকালে রাজধানীর বনানী কাকলি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ১৭৯ ও ১৮০ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী স্থান থেকে মুখ ও হাতে স্কচটেপ পেঁচানো এবং রক্তাক্ত অবস্থায় ইসমাইল হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তার সঙ্গে থাকা ৫ লাখ টাকা, দুটি মোবাইল ফোন ও বাজারের ব্যাগও পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে র্যাব বাসের চালকসহ তিনজনকে আটক করেছে। তারা হলেন ‘রাজ ক্লাসিক’ বাসের চালক সোহেল রানা, সুপারভাইজার সাজু ও হেলপার মনির।
নিহত ইসমাইল হোসেন (৫০) জামালপুর সদর উপজেলার হবদেশ গ্রামের জালাল উদ্দিনের ছেলে। বর্তমানে তার পরিবার গাজীপুরের কাশিমপুরের করলাপাড়া এলাকায় বসবাস করে। এক ছেলে হাসান ও মেয়ে শারমিনকে নিয়ে ছিল তার সংসার।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে নিহত ব্যক্তির ছেলে মো. হাসান যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে বাবাকে সকালে জিরানী বাসস্ট্যান্ডে রিসিভ করতে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু দুপুরে সেই বাবার মরদেহ শনাক্ত করতে হয়েছে তাকে।

হাসান বলেন, আমার ছোট বোন শারমিনের বিয়ে ঠিক হয়েছে। সামনে বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করার কথা ছিল। বাবা সেই জন্যই গ্রামের বাড়ি থেকে আমাদের কাছে আসছিলেন।
পরিবারের আর্থিক সংকটের কথা উল্লেখ করে হাসান জানান, তাদের অনেক টাকা ঋণ ছিল। প্রায় চার মাস আগে তার বাবা স্ত্রী-সন্তানদের গাজীপুরে রেখে একা জামালপুরের গ্রামের বাড়িতে যান জমি বিক্রি করতে। বসতভিটার ১১ শতাংশ জমি সাড়ে ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেন তিনি।
হাসান বলেন, জমি বিক্রির টাকা থেকে প্রায় আড়াই লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করেন তার বাবা। এরপর গ্রামের বাড়িতে একটি ঘর করেন। সবকিছু শেষে বাকি ৫ লাখ টাকা সঙ্গে নিয়ে কাশিমপুরের বাসায় ফিরছিলেন তিনি।
হাসান বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে বাবার সঙ্গে আমাদের শেষ কথা হয়। বাবা বলেছিলেন, রাত ৩টার গাড়িতে জামালপুর থেকে রওনা দেবেন। শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আমি আশুলিয়ার জিরানি বাসস্ট্যান্ডে বাবাকে নিতে যাই। কিন্তু সেখানে গিয়ে বারবার ফোন করেও বাবার ফোনে কল ঢুকেনি। ফোন বন্ধ ছিল। পরে বাসায় ফিরে আসি। দুপুরে পুলিশের মাধ্যমে জানতে পারি, বাবার মরদেহ বনানী এক্সপ্রেসওয়ের ওপর পাওয়া গেছে।
হাসান বলেন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে আমার বাবার ময়নাতদন্ত শেষে আমাদের গ্রামের বাড়ি জামালপুরের উদ্দেশ্যে বিকেলেই রওনা হয়েছি। সেখানেই আমার বাবার জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন হবে। আমার বাবাকে যারা হত্যা করেছে এবং আমার বাবার কাছ থেকে যারা টাকা ছিনিয়ে নিয়েছে আমি তাদের বিচার চাই।
ইসমাইল হোসেন ডেল্টা স্পিনিং মিলে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করতেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে প্রায় ৯ মাস আগে চাকরি ছেড়ে দেন তিনি। উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় ভুগতেন। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেও পারতেন না— জানান হাসান।
জানা যায়, চাকরি ছাড়ার পর প্রায় পাঁচ মাস স্ত্রী, দুই সন্তান ও ছেলের বউকে নিয়ে গাজীপুরের কাশিমপুরে থাকতেন ইসমাইল। চার মাস আগে জমি বিক্রির জন্য গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। সেখানে তার মা ও বড় বোন থাকেন।
নিহত ব্যক্তির ভাতিজা মো. মোকাদ্দেস বলেন, আমার চাচা তো জামালপুর থেকে গাজীপুরের কাশিমপুরে আমাদের বাসায় আসছিলেন। ঢাকায় তার আসার কোনো কারণ ছিল না। আমাদের ধারণা, পথে কোনো ছিনতাইকারী বা কোনো চক্র তার সঙ্গে টাকা থাকার বিষয়টি জানতে পেরে তাকে অপহরণ করে থাকতে পারে। এরপর টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে হত্যা করে মরদেহ ফেলার জন্য বনানী এক্সপ্রেসওয়েতে রেখে গেছে। অন্য কোনো কারণ আমরা খুঁজে পাচ্ছি না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, ইসমাইলের সঙ্গে একটি অ্যান্ড্রয়েড ফোন ও একটি বাটন ফোন ছিল। সঙ্গে ছিল বাজারের একটি ব্যাগ। কিন্তু মরদেহ উদ্ধারের সময় এসবের কিছুই পাওয়া যায়নি। জমি বিক্রির বাকি ৫ লাখ টাকাও নেই।
একদিকে মেয়ের বিয়ের আয়োজন, অন্যদিকে বাবার মরদেহ। যে টাকা দিয়ে মেয়ের নতুন জীবনের স্বপ্ন সাজানোর কথা ছিল, সেই টাকাও এখন নিখোঁজ। আর যে বাবা মেয়ের বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করতে পরিবারের কাছে ফিরছিলেন, তার মরদেহ পড়ে ছিল বনানীর ব্যস্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর।
ইসমাইল কীভাবে কাশিমপুরের পথ থেকে বনানীতে গেলেন, কারা তাকে সেখানে নিয়ে গেল, তার সঙ্গে থাকা ৫ লাখ টাকা ও মোবাইল ফোন কোথায় গেল-এসব প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে স্বজনদের মনে।
নিহত ইসমাইলের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন বনানী থানার উপ-পরিদর্শক (এস আই) নজরুল ইসলাম তালুকদার। সুরতহাল প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, বনানী থানাধীন বনানী-এয়ারপোর্ট সড়কের কাকলী থেকে কুর্মিটোলা অভিমুখে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ১৭৯ ও ১৮০ নম্বর পিলারের মধ্যবর্তী স্থানে সড়কের ওপর থেকে ইসমাইল হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে মরদেহ উদ্ধারের সময় সকাল ৮টা ৪৫ মিনিট উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মরদেহটি চিৎ হয়ে পড়া অবস্থায় ছিল। তার দুই হাত দুই দিকে প্রসারিত ছিল। ডান হাতের কব্জি এবং নাক-কান বরাবর স্বচ্ছ স্কচটেপ দিয়ে প্যাঁচানো ছিল। পরনে ছিল নীল রঙের ফুলহাতা শার্ট ও নীল-কালচে রঙের চেক লুঙ্গি, যা অর্ধপরিহিত অবস্থায় ছিল।
মরদেহের মাথার পেছনের বাম পাশে জখম ছিল এবং সেখান থেকে রক্তক্ষরণের চিহ্ন পাওয়া যায়। কপালের উপরিভাগেও জখম ছিল। মুখ বন্ধ অবস্থায় থাকলেও মুখে রক্ত দৃশ্যমান ছিল। থুতনির নিচে ও গলায় কালচে দাগ পাওয়া যায়।
সুরতহাল প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ডান হাতের মুষ্টি বন্ধ এবং ডান কব্জি স্বচ্ছ স্কচটেপ দিয়ে প্যাঁচানো ছিল। বাম হাত খোলা অবস্থায় ছিল। বাম হাতের মধ্যমা আঙুল ও তালুতে জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়। বাম হাঁটুতেও জখম ছিল। দুই পা ও পায়ের আঙুল স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাথার চুল সাদা-কালো এবং আনুমানিক আধা ইঞ্চি লম্বা ছিল। চোখের বর্ণ কালো/ঘোলাটে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মরদেহের মুখে রক্তের উপস্থিতিও দেখা যায়।
নিহত ইসমাইল হোসেনের মৃত্যু রহস্য উন্মোচন করে র্যাব-১ জানায়, ৪ সেপ্টেম্বর বনানী এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর থেকে ইসমাইল হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিচয় শনাক্তের পর জানা যায়, তিনি জামালপুর সদর উপজেলার জালাল উদ্দিনের ছেলে। জমি বিক্রির ৫ লাখ টাকা নিয়ে জামালপুর থেকে গাজীপুরের কাশিমপুরে নিজ বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন তিনি।
র্যাব আরও জানায়, পথে তাকে শ্বাসরোধে হত্যার পর মরদেহ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ওপর ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় ছায়াতদন্তের পাশাপাশি সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বাসচালক সোহেল রানাকে প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে মহাখালী এলাকা থেকে আটক করা হয়। পুলিশের সঙ্গে যৌথ অভিযানে বাসের সুপারভাইজার সাজু ও হেলপার মনিরকেও আটক করা হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ‘রাজ ক্লাসিক’ বাসটিও জব্দ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র্যাব। গ্রেপ্তার সোহেল রানাকে বনানী থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
র্যাব জানায়, ঘটনাটির সঙ্গে জড়িত অন্যদের বিষয়েও তদন্ত ও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ইসমাইল হোসেনের রহস্য উদঘাটনে রোববার (৫ সেপ্টেম্বর) বেলা সাড়ে ১১টায় ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে ডিএমপি। সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার বিস্তারিত জানানো হবে।
ঘটনার বিষয় জানতে চাইলে বনানী থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) এটিএম মইনুদ্দিন জানান, এই ঘটনায় বনানী থানা একটি মামলা দায়ের হয়েছে। ঘটনার রহস্য উন্মোচন এবং আসামিদের গ্রেপ্তারে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এসএএ/এসএম
