রোগ সারানোর আশ্বাস দিয়ে প্রথমে তৈরি করা হতো বিশ্বাস। এরপর ঝাড়-ফুঁক, মন্ত্রপাঠ আর নানা আচার-অনুষ্ঠানের নামে চলতো কথিত চিকিৎসা। চিকিৎসার একপর্যায়ে ঘরে থাকা স্বর্ণালংকার একসঙ্গে করতে বলতো চক্রটি। রুমালে মুড়িয়ে সেই স্বর্ণ পানিতে ডুবিয়ে রাখা হতো। এরপর সেই পানি পুরো ফ্ল্যাটে ছিটানোর অভিনয় চলতো। ভুক্তভোগীর চোখ যখন কথিত চিকিৎসার দিকে, ঠিক তখনই বদলে যেতো রুমাল। চিকিৎসার নামে হাতে নেওয়া স্বর্ণালংকার নিয়ে মুহূর্তেই সটকে পড়ত চক্রের সদস্যরা।
ফেসবুকে কবিরাজি চিকিৎসার বিজ্ঞাপন দিয়ে এভাবেই মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে স্বর্ণালংকার আত্মসাৎকারী একটি চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
তাদের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা স্বর্ণালংকারের একটি অংশ উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তার দুজন হলেন সুনামগঞ্জের ছাতক থানার ফকিরটিলা এলাকার মোছাম্মৎ জিয়াসমিন আক্তার (২১) ও মো. আব্দুল্লাহ মিয়া (৬৬)।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ এসব তথ্য জানান।
তিনি বলেন, চক্রটি ফেসবুক পেজে কবিরাজি চিকিৎসার বিজ্ঞাপন দিত। সেখানে দুরারোগ্য রোগসহ নানা সমস্যার চিকিৎসার কথা বলে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হতো। বিজ্ঞাপন দেখে কেউ যোগাযোগ করলে তাকে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হতো। এরপর কথিত কবিরাজরা ভুক্তভোগীর বাসায় গিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলে নানা ধরনের ঝাড়-ফুঁক ও আচার-অনুষ্ঠান শুরু করত।
সিআইডির এই কর্মকর্তা বলেন, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ভুক্তভোগীর বিশ্বাস অর্জন করাই ছিল তাদের মূল কৌশল। একপর্যায়ে চিকিৎসার অংশ হিসেবে বাসায় থাকা সোনা-গয়না এক জায়গায় করতে বলা হতো। এরপর স্বর্ণালংকার রুমালে মুড়িয়ে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হতো। সেই পানি পুরো ফ্ল্যাটে ছিটানোসহ নানা ধরনের কৌশলে চিকিৎসা চালানোর অভিনয় করা হতো। এ সময় ভুক্তভোগীর দৃষ্টি অন্যদিকে থাকার সুযোগে কৌশলে স্বর্ণালংকার নিয়ে পালিয়ে যেত চক্রের সদস্যরা।
এভাবে প্রতারণার শিকার হন রাজধানীর শাহজাহানপুরের এক ভুক্তভোগী। পরে তিনি শাহজাহানপুর থানায় মামলা করেন। গত ২ জুলাই করা ওই মামলায় দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় অভিযোগ আনা হয়।
মামলাটির তদন্তভার সিআইডি গ্রহণের পর শুরু হয় প্রতারক চক্রের সন্ধান। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে চক্রটির সদস্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হয়। একই সঙ্গে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ফেসবুক পেজ এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য সংগ্রহ করে তদন্তকারী দল।
সিআইডি জানায়, তদন্তে চক্রটির ব্যবহৃত ফেসবুক পেজ শনাক্ত করা হয়। পাশাপাশি ওই পেজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পেজ ও ব্যক্তিদের সম্পর্কেও তথ্য পাওয়া যায়। তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।
তদন্তে পাওয়া তথ্য ও গোয়েন্দা সংবাদের ভিত্তিতে চক্রের সদস্যদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর গত ৩ সেপ্টেম্বর রাতে অভিযান চালায় সিআইডি ঢাকা মেট্রো-পূর্ব ইউনিটের একটি দল। রাত আনুমানিক ২টার দিকে সুনামগঞ্জের ছাতক থানার ফকিরটিলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে মামলার এজাহারনামীয় আসামি জিয়াসমিন আক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সন্দিগ্ধ আসামি আব্দুল্লাহ মিয়াকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের সময় জিয়াসমিনের হেফাজত থেকে প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা স্বর্ণালংকারের মধ্যে একটি স্বর্ণের আংটি এবং লকেটসহ একটি স্বর্ণের চেইন জব্দ করা হয়। জব্দ করা স্বর্ণালংকারের মোট ওজন ২১ দশমিক ৮৩ গ্রাম। এগুলোর আনুমানিক বর্তমান বাজারমূল্য ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ছুফি উল্লাহ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন প্রতারণার ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে চক্রটির অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করা অবশিষ্ট স্বর্ণালংকার উদ্ধারের জন্যও অভিযান ও তদন্ত চলমান রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গ্রেপ্তার আসামিদের রিমান্ডের আবেদনসহ আদালতে পাঠানো হয়েছে। চক্রটির সঙ্গে আরও কারা জড়িত এবং ফেসবুকের মাধ্যমে তারা কতজনকে টার্গেট করেছিল, সে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জেইউ/আরএফ
