বিজ্ঞাপন

৩৭ বছর পড়িয়েছেন, বিদায় নিলেন রাজকীয় ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে

৩৭ বছর পড়িয়েছেন, বিদায় নিলেন রাজকীয় ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে

শেষবারের মতো বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ পেরিয়ে যাচ্ছেন প্রিয় শিক্ষক। চারপাশে শিক্ষার্থীদের করতালি, হাতে হাতে ফুল। স্কাউট সদস্যদের সম্মানসূচক স্যালুট আর বিদায়ী গানের সুরে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ। এরপর এল সেই বিশেষ মুহূর্ত, ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে বিদ্যালয় ছাড়লেন ৩৭ বছরের শিক্ষকতা জীবন শেষ করা বিপুল চন্দ্র দে।

dhakapost

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক বিপুল চন্দ্র দে–কে এভাবেই ব্যতিক্রমী আয়োজনে বিদায় জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সদস্যরা। শুধু বিদ্যালয় থেকে বিদায় নয়, ঘোড়ার গাড়িতে করে তাকে পৌঁছে দেওয়া হয় বাড়ি পর্যন্ত। প্রিয় শিক্ষককে এমন রাজকীয় বিদায় দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন অনেকেই।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সকালে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বিপুল চন্দ্র দে’র বিদায় সংবর্ধনাকে ঘিরে নানা আয়োজন করা হয়। প্রাত্যহিক সমাবেশে তাকে সম্মানসূচক স্যালুট দেওয়া হয়। স্কাউট সদস্য ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। পরিবেশিত হয় বিদায়ী গান।

পরে বিদ্যালয়ের মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় বিদায় সংবর্ধনা। সেখানে শিক্ষকেরা স্মৃতিচারণ করেন। শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেয়। পাঠ ও বিতরণ করা হয় মানপত্র। ছিল নাটিকা, উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া, ধর্মীয় গ্রন্থ, গীতা প্রদান ও উপহার বিতরণের আয়োজন।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, বিপুল চন্দ্র দে’র শিক্ষকতা জীবনের শুরু ১৯৮৯ সালের ১ আগস্ট। সেদিন করেরহাট কামিনী মজুমদার উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন তিনি। সেখানে প্রায় ২২ বছর গণিতের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১১ সালের ১ অক্টোবর তিনি যোগ দেন জোরারগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে। এখানেও গণিত বিষয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন। পরে দায়িত্ব পান সহকারী প্রধান শিক্ষকের। প্রায় ১৫ বছর এই বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে শিক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন তিনি।

দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতিও পেয়েছেন বিপুল চন্দ্র দে। ২০২৫ সালে তিনি জোরারগঞ্জ আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক নির্বাচিত হন। গত ৪ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে চাকরি থেকে অবসর নেন তিনি।

‘শিক্ষকতা শুধু পেশা নয়, ভালোবাসা’

বিদায়ী সংবর্ধনায় আবেগাপ্লুত বিপুল চন্দ্র দে বলেন, শিক্ষকতা তার কাছে শুধু একটি পেশা নয়, জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসা। দীর্ঘ কর্মজীবনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও পরিচালনা পরিষদের কাছ থেকে যে সহযোগিতা ও ভালোবাসা পেয়েছেন, তা আজীবন মনে রাখবেন তিনি।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু ভালো ফলাফল অর্জন করলেই হবে না, ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। সততা, মানবিকতা ও নৈতিক মূল্যবোধ ধারণ করে দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ করতে হবে।

dhakapost

বিদ্যালয় পরিচালনা পরিষদের সভাপতি আবুল হাশেম ভূঁইয়া বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বিপুল চন্দ্র দে দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন। তার কর্মনিষ্ঠা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসা অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাইফুল আলম বলেন, বিপুল চন্দ্র দে শুধু একজন দক্ষ শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিদ্যালয় পরিবারের একজন অভিভাবক। দীর্ঘ কর্মজীবনে সততা, নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তার অবদান বিদ্যালয়ের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শেষবারের মতো সাক্ষাৎ করেন বিপুল চন্দ্র দে। এরপর বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণ থেকে তাকে ঘোড়ার গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা আর শুভেচ্ছা সঙ্গে নিয়ে ঘোড়ার গাড়িটি যখন বাড়ির পথে এগিয়ে যায়, তখন অনেকেই অশ্রুসিক্ত নয়নে প্রিয় শিক্ষককে বিদায় জানান।

এএইচ/জেআই