বিজ্ঞাপন

এমপির পিএসের বিরুদ্ধে মামলা : ঢাকা পোস্টকে আইনি নোটিশ ও জবাব

এমপির পিএসের বিরুদ্ধে মামলা : ঢাকা পোস্টকে আইনি নোটিশ ও জবাব

চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় দায়ের হওয়া একটি চাঁদাবাজির মামলার খবর প্রকাশকে কেন্দ্র করে ঢাকা পোস্টের সম্পাদক ও চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধানকে আইনি নোটিশ পাঠিয়েছেন অভিযুক্ত মো. আরমান উদ্দিন। প্রকাশিত সংবাদকে ‘মানহানিকর ও বিভ্রান্তিকর’ দাবি করে তা প্রত্যাহার, ক্ষমা প্রার্থনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কনটেন্ট অপসারণের দাবি জানানো হয়েছে নোটিশে।

তবে, এই নোটিশের জবাবে ঢাকা পোস্টের পক্ষ থেকে জানানো যাচ্ছে যে, বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার রীতি মেনেই আদালতের নথি ও আসামি ব্যক্তির জনপরিসরে বহুল প্রচলিত পরিচয়ের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। ফলে সংবাদ প্রত্যাহারের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

আইনি নোটিশে যেসব দাবি ও আপত্তি

গত ২৫ আগস্ট আইনজীবী এন.এইচ.এম সাকিবের মাধ্যমে পাঠানো নোটিশে দাবি করা হয়— 

১। আমার মক্কেল উপরোক্ত সি.আর. মামলা নং- ৪৯২/২০২৬-এর ৩নং আসামি। উক্ত মামলাটি বাদী আমির হোসেন কর্তৃক বিজ্ঞ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং-০৪, চট্টগ্রামে দায়ের করা হয় এবং বিজ্ঞ আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সাতকানিয়া সার্কেল অফিসারকে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ প্রদান করেছেন। অর্থাৎ, অভিযোগসমূহ বর্তমানে তদন্তাধীন এবং আমার মক্কেলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগসমূহ এখনো কোনো বিচারিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়নি।

২। তর্কিত সম্পত্তি আজগর আলীর আর. এস জরিপি স্বত্ব। তৎত্যাজ্যবিত্তে আনোয়ার আনোয়ার আলী মৌরশী ও বি.এস জরিপি স্বত্ব। তৎত্যাজ্যবিত্তে এক স্ত্রী মোহরানা প্রাপ্ত ও চার সন্তানের মৌরিশি কিছমত প্রাপ্ত খাস দখলীয় স্বত্ব। তাহাদের বিক্রিত উপরোক্ত সি.আর মামলার ১নং আসামী মোঃ আরিফ উদ্দীন ও ২নং আসামী শওকত আলী এর বিগত ১৪/০৭/২৫ইং তারিখ ছাপ কবলা দলিল নং- ২৪২৮ মূলে খরিদা সম্পত্তি এবং তাহাদের নামে সৃজিত খতিয়ান নং- ২০২৬-১০০০৯৪ প্রচারিত এবং উক্ত মতে সরকারি খাজনাদি পরিশোধিত। উপরোক্ত সি. আস মামলার ৩নং আসামী আমার মক্কেল বিগত ০৮/০৮/২৬ইং তারিখ হতে ওমরার উদ্দেশ্যে সৌদি আরব অবস্থান করছেন। বাদীর সহিত বা উক্ত সম্পত্তি সংক্রান্তে আমার মক্কেলের কোনো সংশ্লিষ্টতা নাই। তবে আমার মক্কেল যতটুকু অবগত- তা হলো তর্কিত সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সময় কয়েকবার বৈঠক হয়। উক্ত বৈঠকসমূহে বাদী প্রবাস হতে এসে বিষয়টি মীমাংসা ও সমাধান করে দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু পরবর্তীতে দেশে এসে আমার মক্কেলের বিরোধী পক্ষের প্ররোচনা, প্রভাব ও অসৎ উদ্দেশ্যে দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমার মক্কেলকে সামাজিকভাবে ও পেশাগতভাবে হেয়প্রতিপন্ন, হয়রানি ও সম্মানহানি করার লক্ষ্যে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিকভাবে এবং কোনো আইনগত ভিত্তি ব্যতিরেকে উপরোক্ত মামলায় আমার মক্কেলকে আসামী হিসেবে জড়ানো হয়েছে।

৩। উক্ত মামলার অভিযোগপত্র/অভিযোগের অনুলিপি পর্যালোচনায় দেখা যায়; বাদী আমার মক্কেল ৩নং আসামির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করলেও কোথাও আমার মক্কেলকে “শাহজাহান চৌধুরীর পিএস” হিসেবে পরিচয় করিয়ে মামলার অভিযোগের কোনো উপাদান হিসেবে উল্লেখ করেননি। এমনকি মামলার সঙ্গে দাখিলকৃত সংযক্তিতেও আমার মক্কেল ও জনাব শাহজাহান চৌধুরীর কোনো ছবি দাখিল করা হয়নি।

৪। পরবর্তীতে আপনার প্রতিষ্ঠানের অনলাইন সংস্করণে “জামায়াত এমপি শাহজাহান চৌধুরীর পিএসের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা” শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করা হয় এবং উক্ত সংবাদের সঙ্গে আমার মক্কেলের ও জনাব শাহজাহান চৌধুরীর ছবি ব্যবহার করা হয়।

৫। আমার মক্কেল অতীতে জনাব শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে পেশাগতভাবে সংশ্লিষ্ট থাকলেও সংসদ নির্বাচনের পর হতে বর্তমানে তিনি উক্ত দায়িত্বে নেই। তিনি ০৮/০৮/২০২৬ তারিখ হতে সৌদি আরবে অবস্থান করছেন। অতএব, একটি চলমান ফৌজদারি অভিযোগের সংবাদে তার অতীত রাজনৈতিক/পেশাগত পরিচয়কে headline-এর প্রধান পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করার ফলে সাধারণ পাঠকের কাছে এমন একটি ধারণা সৃষ্টি করা পাঁয়তারা করা হয়েছে যে-তিনি বর্তমানে উক্ত সংসদ সদস্যের পিএস এবং উক্ত রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে কথিত অপরাধের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।

৬। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, মামলার প্রকৃত অভিযোগের সঙ্গে উক্ত রাজনৈতিক পরিচয়ের কোনো প্রত্যক্ষ সম্পর্ক বাদী প্রতিষ্ঠা করেননি। ফলে মামলার অভিযোগের সংবাদ পরিবেশনের সময় এমন একটি পরিচয়কে headline-এ প্রধান করে তোলা, যা মামলার অভিযোগের অবিচ্ছেদ্য অংশ নয়, তা আমার মক্কেলের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও পেশাগত পরিচয় সম্পর্কে পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তিকর ধারণা সৃষ্টি করেছে।

৭। আরও গুরুতর বিষয় হলো, আমার মক্কেল বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন এবং ২০/০৮/২০২৬ তারিখের ঘটনার সময় তিনি সৌদি আরবে অবস্থান করছিলেন-এমন নথিপত্র তার নিকট বিদ্যমান। তথাপি তার বিরুদ্ধে তদন্তাধীন অভিযোগকে এমনভাবে headline ও ছবির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা সংবাদটি পাঠকারী সাধারণ ব্যক্তির নিকট তার বিরুদ্ধে অভিযোগকে প্রায় প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে প্রতীয়মান করতে পারে।

৮। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার স্বাভাবিক দায়িত্ব হলো অভিযোগ, অভিযুক্তের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট নথি এবং প্রাসঙ্গিক বাস্তবতা যথাসম্ভব যাচাই করে সংবাদ পরিবেশন করা। বিশেষত কোনো ব্যক্তিকে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত করে headline দেওয়ার ক্ষেত্রে তথ্যের সঠিকতা ও প্রাসঙ্গিকতা আরও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।

৯। আপনার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নীতিতেও নির্ভুল, বস্তুনিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মত সংবাদ পরিবেশনের অঙ্গীকারের কথা উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সংবাদটি যথাযথ যাচাই ছাড়া অথবা অসম্পূর্ণ/বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়ে থাকলে তা সংশোধন করা আপনাদের নৈতিক ও পেশাগত দায়িত্ব।

১০। আমার মক্কেল একজন ব্যক্তি হিসেবে তার সুনাম, সামাজিক মর্যাদা, পেশাগত পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের ওপর উক্ত প্রকাশনার ক্ষতিকর প্রভাবের কারণে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে headline, সংশ্লিষ্ট ছবি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের ফলে সংবাদটির বিস্তৃতি মূল প্রতিবেদনের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

১১। উল্লেখ্য, উক্ত সংবাদ পরবর্তীতে বিভিন্ন Facebook account/page এবং অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পুনঃপ্রচার/শেয়ার করা হয়েছে। ফলে আমার মক্কেলের পরিচয় ও কথিত অপরাধের মধ্যে একটি ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর association তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

১২। এই নোটিশের মাধ্যমে আপনাকে অবহিত করা যাচ্ছে যে, আমার মক্কেল উক্ত প্রকাশনার মাধ্যমে তার সুনাম ক্ষুণ্ণ হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এবং প্রয়োজনে আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার গ্রহণের অধিকার সংরক্ষণ করছেন। অতএব, এই নোটিশ প্রাপ্তির ৭ (সাত) দিনের মধ্যে আপনাকে নিম্নলিখিত কার্যক্রম গ্রহণের জন্য বলা যাচ্ছে:-

ক) উক্ত সংবাদের headline সংশোধন করে বিভ্রান্তিকর পরিচয় সরাতে হবে;
খ) সম্মানহানি/ব্যক্তিগত মর্যাদার ক্ষতিসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে এবং যথাসম্ভব গুরুত্ব ও দৃশ্যমানতা প্রদান করতে হবে;
গ) সংশ্লিষ্ট Facebook page/profile এবং অন্যান্য social-media platform-এ প্রকাশিত/আপলোডকৃত headline, caption, photograph ও পোস্টের যথাযথ correction/clarification দিতে হবে;
ঘ) আমার মক্কেলের সঙ্গে জনাব শাহজাহান চৌধুরীর ছবি ব্যবহার করে যে বিভ্রান্তিকর association তৈরি হয়েছে, তা অবিলম্বে প্রত্যাহার/সংশোধন করতে হবে;
ঙ) সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের URL, publication record, update history, ব্যবহৃত ছবি, caption এবং সংশ্লিষ্ট social-media publication-এর রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে; এবং
চ) ভবিষ্যতে একই অভিযোগকে পুনঃপ্রচার অথবা এমন কোনো headline, caption বা ছবি দ্বারা প্রচার করা যাবে না, যা আমার মক্কেলের বর্তমান কার্যাবলীকে দৃশ্যমান বা বিভ্রান্তিকর ধারণা সৃষ্টি করে;
ছ) উপরোক্ত correction/clarification প্রকাশ করা নিশ্চিত করতে হবে।

১৩। নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে উপরোক্ত প্রতিকার প্রদান করা না হলে আমার মক্কেল আর কোনো নোটিশ প্রদান না করে তার সুনাম ও আইনগত অধিকার রক্ষার্থে ফৌজদারি মানহানি মামলা, দেওয়ানি ক্ষতিপূরণমূলক কার্যক্রম, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট আইনগত/নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের নিকট অভিযোগ এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। উক্ত কার্যক্রমের ফলে উদ্ভূত যাবতীয় ব্যয়, ক্ষতিপূরণ, মামলা পরিচালনার খরচ এবং অন্যান্য আইনগত পরিণতির জন্য আপনারা ব্যক্তিগত ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দায়ী থাকবেন।

ঢাকা পোস্টের জবাব: আদালতের নথি ও বহুল প্রচলিত পরিচয়

আইনি নোটিশের জবাবে ঢাকা পোস্ট কর্তৃপক্ষ জানায়, এটি কোনো মনগড়া বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন নয়; বরং গত ২৩ আগস্ট চট্টগ্রাম জজ আদালতে দায়ের হওয়া একটি সি.আর মামলার ওপর ভিত্তি করে তৈরি বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ। লোহাগাড়ার একজন আলোচিত ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলার তথ্য পাওয়ার পর জনস্বার্থে খবরটি পরিবেশন করা পেশাগত দায়িত্ব এবং দেশের প্রায় সব শীর্ষ গণমাধ্যমই খবরটি গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করেছে।

dhakapost
 জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনে যোগ দিতে এমপি শাহজাহান চৌধুরীর সঙ্গে অভিযুক্ত আরমান উদ্দিন / আরমান উদ্দিনের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

প্রতিবেদনে সংবাদদাতার নিজস্ব কোনো বক্তব্য বা আপত্তিকর বিশেষণ ব্যবহার করা হয়নি; কেবল মামলার আরজিতে থাকা অভিযোগই তুলে ধরা হয়েছে।

নোটিশদাতার ‘পিএস’ পরিচয়ের বিষয়ে জবাবে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর লোহাগাড়া থানায় দায়ের করা একটি জিডিতে আরমান উদ্দিন নিজেকে শাহজাহান চৌধুরীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তাছাড়া, সংসদ নির্বাচনের পরও বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ ও সফরে তাকে উক্ত সংসদ সদস্যের সঙ্গে সক্রিয় দেখা গেছে, যার ছবি ও ভিডিও তিনি নিজেই ২৬ আগস্ট পর্যন্ত নিজ ফেসবুক আইডিতে শেয়ার করেছেন। গণমাধ্যমের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, একজন মানুষের জনপরিসরে সবচেয়ে পরিচিত পরিচয়টিই সংবাদে ব্যবহার করা হয়।

dhakapost
সাময়িকী ‘প্রিয় সাতকানিয়া লোহাগাড়া’-তে প্রকাশিত নিবন্ধ ‘শাহজাহান চৌধুরী এমপির ১০০ দিন’। লেখাটিতে নিজেকে সংসদ সদস্যের ‘ব্যক্তিগত সহকারী’ হিসেবে পরিচয় দেন আরমান উদ্দিন / আরমান উদ্দিনের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত 

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, মামলায় তদন্তকারী কর্মকর্তা যদি তাকে অব্যাহতি দেন কিংবা নির্দোষ হিসেবে প্রতিবেদন জমা দেন, একজন পেশাদার গণমাধ্যম হিসেবে ঢাকা পোস্ট সেই খবরটিও সম-গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করবে। সুতরাং, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানহানির অভিযোগ তুলে সংবাদ প্রত্যাহারের দাবি আইনগত ও নৈতিকভাবে ভিত্তিহীন।

এমএআর/