বিজ্ঞাপন

শিল্প বাঁচাতে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার ‘ওপেন অ্যাক্সেসের’ প্রস্তাব জামায়াতের

শিল্প বাঁচাতে সরাসরি বিদ্যুৎ কেনার ‘ওপেন অ্যাক্সেসের’ প্রস্তাব জামায়াতের

সাধারণ গ্রাহকদের ওপর থেকে অযৌক্তিক ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়ার নামে প্রতি মাসে শত শত কোটি টাকা কেটে নেওয়াকে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন।

সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের সংকটকাল কাটিয়ে উঠতে তিনি স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা পেশ করেন। এর পাশাপাশি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ‘জ্বালানি জরুরি সেল’ গঠন, এলএনজি খাতের দুর্নীতির তদন্ত এবং শিল্পকারখানাগুলোকে সরাসরি উৎপাদকের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ সুবিধা দেওয়ার জোর দাবি জানান তিনি।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল এর সভাপতিত্বে ৬৮ বিধির আলোচনায় অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন পাবনা-১ আসন থেকে নির্বাচিত এ সংসদ সদস্য।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে জনগণের অধিকার হিসেবে বর্ণনা করে জাতীয় সংসদে দেশের বর্তমান সার্বিক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের চরম বাস্তবতা তুলে ধরে নাজিবুর রহমান মোমেন বলেছেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাওয়ার অধিকার জনতার, এটা কারো দয়া বা দান নয়। দেশের মানুষ নিয়মিত বিল ও ট্যাক্স দেয়, কৃষকের ঘাম বেচা টাকা, শ্রমিকের কষ্টার্জিত আয় এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স থেকে এই খাতে বিপুল পরিমাণ সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হয়। ফলে এই বরাদ্দের সঠিক হিসাব ও সুশাসন নিশ্চিত করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে সংকট সমাধানে বিরোধী দলকে চ্যালেঞ্জ জানানো হলেও, বিরোধী দল কেবল জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এবং একটি কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা তুলে ধরতেই তথ্য-উপাত্তসহ এই সংকট সমাধানের স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা সংসদে উপস্থাপন করছে বলে জানান তিনি।

সংসদে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বর্তমান অচলাবস্থার চিত্র তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমানে দেশে প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। যেখানে দৈনিক সর্বোচ্চ চাহিদা মাত্র ১৭ হাজার থেকে ১৭ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। তা সত্ত্বেও সারা দেশে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং সহ্য করতে হচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ আর্থিক ও ব্যবস্থাপনার সংকট। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছে সরকারের পাওনা বকেয়া জমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। বকেয়া না পাওয়ায় উৎপাদকেরা কয়লা, তেল বা প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ কিনতে পারছেন না, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ উৎপাদনে। অথচ অন্যদিকে অলস বসিয়ে রেখে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্র ভাড়া মিটিয়ে যেতে হচ্ছে।

গ্যাস সংকটের বিষদ বিবরণ দিতে গিয়ে এই সংসদ সদস্য জানান, বিগত ১৭ বছরে অনশোর কিংবা অফশোর কোনো গ্যাস কূপের প্রয়োজনীয় খনন বা পুনঃখনন তথা ওয়ার্কওভার না করায় দেশীয় গ্যাস উত্তোলন আশঙ্কাজনকভাবে কমে প্রতিদিন ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে দেশে দৈনিক প্রায় ১৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। পাইপলাইনের অভাবে প্রায় ৭৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। আর এই ঘাটতি মেটাতে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির পেছনেই গত অর্থবছরে ৫৯ হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া ২১শে জুলাই একটি এফএসআরইউ-তে অগ্নিকাণ্ডের পর তৈরি হওয়া গ্যাস সংকট এখনো বহাল রয়েছে। সেই অগ্নিকাণ্ড কোনো নাশকতার অংশ কি না, কিংবা এই বিষয়ে কোনো তদন্ত হয়েছে কি না, তার সঠিক তথ্য জাতির সামনে প্রকাশের দাবি জানান তিনি।

জ্বালানি খাতে নিজস্ব কয়লার ব্যবহার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে পায়রা, রামপাল, বাঁশখালী ও মাতারবাড়ীর মতো বড় কেন্দ্রগুলো মিলিয়ে প্রায় ৬ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ভৌত সক্ষমতা রয়েছে এবং সঞ্চালন লাইনও প্রস্তুত আছে। কেবল নিয়মিত কয়লা সরবরাহ ও এলসি অর্থায়ন নিশ্চিত করা গেলে এখান থেকেই দ্রুত সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। দেশীয় কয়লার গুণগত মান বা হিট বেশি হওয়ার দোহাই দিয়ে তা ব্যবহার না করে ফেলে রাখা হচ্ছে এবং তা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে বিদেশ থেকে অপর্যাপ্ত কয়লা আনা হচ্ছে। দেশীয় কয়লা ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানান তিনি।

তেল খাতের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, অপরিশোধিত ক্রুড অয়েল আমদানি ও শোধন নিশ্চিত করা গেলে বছরে ৮ হাজার কোটি টাকা এবং সিঙ্গেল পয়েন্ট মুড়িং সচল রাখলে আরও ৮০০ কোটি টাকা সাশ্রয় সম্ভব, কিন্তু সঠিক তদারকির অভাবে দেশের একমাত্র শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রায়ই কাঁচামালের অভাবে বন্ধ থাকে।

জনদুর্ভোগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে নাজিবুর রহমান মোমেন বিদ্যুৎ খাতের ভূতুড়ে বিল, অযৌক্তিক ডিমান্ড চার্জ এবং মিটার ভাড়াকে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ হিসেবে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, দেশে প্রায় সাড়ে ৪ কোটি গ্রাহকের কাছ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১৯০ কোটি টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৮০ থেকে ১৬০ কোটি টাকা মিটার ভাড়া হিসেবে কেটে নেওয়া হচ্ছে, যার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। তিনি অবিলম্বে সরকারের কাছে এই প্রথা বন্ধ করার দাবি জানান। 

এছাড়া, নবায়নযোগ্য ও সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে ট্যারিফ নির্ধারণে সরকারের বৈষম্যমূলক নীতির কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বাণিজ্যিক উৎপাদনে লোকসানের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে এবং মাত্র ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ ক্রয়ের গ্যারান্টি দেওয়া হচ্ছে। ফলে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে উদ্যোক্তারা সৌরবিদ্যুৎ তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছেন না, যা সরকারের নীতিগত ব্যর্থতা।

সংকট উত্তরণে নাজিবুর রহমান মোমেন ছয় মাসের স্বল্পমেয়াদি, তিন বছরের মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি একগুচ্ছ প্রাতিষ্ঠানিক ও নীতিগত পদক্ষেপের প্রস্তাব দেন। স্বল্পমেয়াদে দুটি এফএসআরইউ পূর্ণ ক্ষমতায় চালু রাখা, জরুরি এলএনজি ক্রয়, এবং বিদ্যুৎ, সার ও রফতানিমুখী শিল্পে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের তাগিদ দেন। মধ্যমেয়াদে ভোলা, জামালপুর, জকিগঞ্জ ও নোয়াখালীর গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনা, নতুন কূপ খনন কর্মসূচি জোরদার করা এবং বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। তিনি সতর্ক করে বলেন, ভোলার গ্যাস যদি এলএনজিতে রূপান্তর করে সরবরাহ করা হয় তবে এর ব্যয় ১০ থেকে ২০ গুণ বেড়ে যাবে, যা পরিহার করা দরকার। বিদ্যুৎ সংকট কাটাটে তিনি 'ওপেন অ্যাক্সেস' পদ্ধতির প্রস্তাব করে বলেন, শিল্পকারখানাগুলোকে সরাসরি উৎপাদকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনার সুযোগ দিলে অর্থ পরিশোধের নিশ্চয়তা তৈরি হবে, উৎপাদন সচল থাকবে এবং শিল্পখাত বাঁচবে।

বক্তব্যের শেষাংশে সংসদ সদস্য বলেন, হাইকোর্ট ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিশেষ আইনকে অবৈধ ঘোষণা করা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে এটি আন্তর্জাতিক সালিশে নেওয়া বা যাচাই করার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো অগ্রগতি দেখায়নি। তিনি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে একটি পাওয়ারফুল ‘জ্বালানি জরুরি সেল’ গঠন, বকেয়া পরিশোধে স্বচ্ছ রোডম্যাপ তৈরি করা, এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বার্ক) শক্তিশালী করা এবং এলএনজি ও জ্বালানি খাতের সবরকম কেনাকাটায় জড়িতদের দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। একইসঙ্গে অন্তত তিন মাসের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির নিজস্ব মজুত গড়ে তুলে বর্তমান বিদ্যমান পরিকাঠামোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।

এসআর/জেআই