দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের চরম সংকট মোকাবিলায় শূন্যপদ পূরণ, আট বিভাগে ক্যানসার হাসপাতাল চালু এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে নিবন্ধনের মাধ্যমে কিউআর ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার ঘোষণা এসেছে জাতীয় সংসদে। একইসঙ্গে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ভুতুড়ে বিল, লোডশেডিং এবং অন্যায্য ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে সংসদীয় কার্যক্রমে বিরোধী দল ও সরকারের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। অধিবেশনে রাজধানীমুখী ওয়াটার বাস ফের চালুর সিদ্ধান্ত ও নতুন চারটি স্থায়ী কমিটি গঠনের পাশাপাশি বহিষ্কৃত এক সংসদ সদস্যকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করাকে কেন্দ্র করে বিরোধী দল ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে বাকযুদ্ধ সৃষ্টি হয়। সামগ্রিকভাবে ওষুধ ও নিত্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতে সরকারের নেওয়া নানা নীতিনির্ধারণী পদক্ষেপও আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম এবং ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের পৃথক সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদীয় কার্যক্রমে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের লিখিত প্রশ্নোত্তর, ৭১ বিধির মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশ এবং ৬৮ বিধির বিশেষ আলোচনায় এসব জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও তথ্যমালা উপস্থাপন করা হয়।
চলতি ২০২৬ সালে দেশে ৮৮ হাজার ৯০৯ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন হলেও বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে সারাদেশে মোট কর্মরত রয়েছেন ৩০ হাজার ৩১১ জন চিকিৎসক। সেই হিসাবে বর্তমানে দেশজুড়ে মোট ৫৮ হাজার ৫৯৮ জন চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে এ তথ্য জানান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের একটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত মোট ৪১ হাজার ৮০৬টি পদ রয়েছে। এর বিপরীতে ৩০ হাজার ৩১১ জন চিকিৎসক সেবা দিচ্ছেন এবং ১১ হাজার ৪৯৫টি পদ সরাসরি শূন্য রয়েছে।
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় স্বাস্থ্য জনবল মানদণ্ড এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যূনতম নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রতি ১ হাজার জনে শূন্য দশমিক ৫০ জন চিকিৎসক ধরে সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণার আলোকে ২০২৬ সালে এই প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা আর সামগ্রিক চিকিৎসকের সংখ্যা এক নয় উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, ৪৪তম ও ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৭তম ও ৫০তম বিসিএসের মাধ্যমেও সরকারি হাসপাতালে সহকারী সার্জন নিয়োগের কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
অধিবেশনে ময়মনসিংহ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সালমান ওমরের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের পক্ষে প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত সংসদকে জানান, দেশের আটটি বিভাগে চিকিৎসাধীন ক্যানসার হাসপাতালগুলোর পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত সেবা আগামী অর্থবছরের মধ্যেই চালু করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, নির্মাণাধীন ১৫ তলাবিশিষ্ট এসব বিভাগীয় বিশেষায়িত হাসপাতালে ক্যানসার, কিডনি ও হৃদরোগের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা এক ছাদের নিচে মিলবে। এটি চালু হলে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রে এক অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফের বারবার দেওয়া আনুষ্ঠানিক সতর্কতা ও চিঠিপত্র সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে হামের টিকার সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিশ্বস্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় হঠাৎ পরিবর্তন এনেছিল বিগত অর্ন্তর্বতীকালীন সরকার। ‘মুক্ত দরপত্র’ চালুর এই ভুল নীতি এবং চরম প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে দেশে তৈরি হয়েছিল টিকার তীব্র সংকট, যার সরাসরি বলি হতে হয়েছে অসংখ্য শিশু ও রানিং টিকাদান কর্মসূচিকে। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাবে তৎকালীন সরকারের নীতিগত ভুল ও আর্থিক বরাদ্দের বিবরণ তুলে ধরে এসব কথা জানান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী।
হামের টিকা সংকটে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ভুল নীতি
গোপালগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. সেলিমুজ্জামান মোল্যা লিখিত প্রশ্নে অভিযোগ তোলেন, বিগত সরকারের মেয়াদে সঠিক সময়ে হামের টিকা না কেনার কারণে তীব্র সংকট তৈরি হয়ে শিশুদের মৃত্যু ঘটেছিল এবং ২০২৪-২০২৫ ও ২০২৫-২০২৬ অর্থ-বছরের বিশাল অঙ্কের বাজেটের সিংহভাগ ব্যয়ের সঠিক হিসাব তিনি দাবি করেন।
জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান দিয়ে জানান, ২০২৪-২০২৫ অর্থ-বছরে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২০২৬ অর্থ-বছরে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়িয়ে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। এই বিপুল অর্থ মূলত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ, অবকাঠামো এবং টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনার মতো পরিচালন ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়।
তবে মূল সংকট তৈরি হয় নীতির পরিবর্তনে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ইউনিসেফ এবং গ্যাভির সহায়তায় সরাসরি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত হামের টিকা আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইন থেকে সংগ্রহ করে আসছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অর্ন্তর্বতীকালীন সরকার এই সুপ্রতিষ্ঠিত পদ্ধতি বদলে মুক্ত দরপত্র চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশের তৎকালীন প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এ সিদ্ধান্তকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঁচ থেকে ছয়টি আনুষ্ঠানিক চিঠি এবং ১০টি জরুরি বৈঠক করে সতর্ক করলেও নীতিনির্ধারকেরা তা পুরোপুরি উপেক্ষা করেন। এরসঙ্গে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ফাইল আটকে থাকা এবং দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাস রাজনৈতিক আন্দোলন-পরবর্তী আহতদের চিকিৎসায় মনোযোগ দিতে গিয়ে নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি দেখা দেয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে বিশেষ হাম-রুবেলা (এমআর) ক্যাম্পেইন বাতিল হওয়ায় দেশে সাধারণ শিশু এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হামের ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
ঢাকার চারপাশে ওয়াটার বাস ফের চালু, চট্টগ্রাম বন্দরের জমি উদ্ধারে কঠোর নৌমন্ত্রণালয়
রাজধানীর চিরচেনা যানজট নিরসন ও নৌপথকে নতুন করে কার্যকর করতে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নৌপথে পুনরায় ওয়াটার বাস সেবা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সংসদ অধিবেশনে কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম তথ্য নিশ্চিত করেন। মন্ত্রী বলেন, বিগত ১০ বছর চালু থাকা এই ওয়াটার বাস সেবায় চরম অব্যবস্থাপনার কারণে প্রতি বছর গড়ে ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা হিসেবে মোট ৫৭ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তবে বিআইডব্লিউটিএ এবার সব ভুল ও ঘাটতি চিহ্নিত করেছে এবং সম্পূর্ণ নতুন ও পেশাদার ব্যবস্থাপনায় দ্রুতই যাত্রী যাতায়াতের জন্য সেবাটি খুলে দেওয়া হবে। বুড়িগঙ্গাসহ নদীর বর্জ্য ও দূষণ রোধে ৪২৪টি ক্ষতিকর স্পট চিহ্নিত করে কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
নদী দখল ও উচ্ছেদ অভিযানের আইনি সীমা স্পষ্ট করে মহিলা আসন-৩৯ এর সংসদ সদস্য সাবিকুন নাহারের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, বিআইডব্লিউটিএ সরাসরি কোনো দখলদারকে উচ্ছেদের সরাসরি ক্ষমতার অধিকারী নয়, তাদের কাজ সীমানা চিহ্নিত করা ও তালিকা করা। উচ্ছেদের জন্য পুরোপুরি স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হয় বলেই মাঠপর্যায়ে কিছুটা বিলম্ব হয়। তবে সরকার বর্তমানে সাড়ে ৭ হাজার কিলোমিটার নৌপথ সচল রেখেছে এবং নতুন করে ১২০০ কিলোমিটার নদীতে নিয়মিত ড্রেজিং পরিচালনা করছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন সংস্কার প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম-১৫ আসনের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে নৌমন্ত্রী জানান, বিগত সরকারের আমলে অনিয়ম করে লিজ দেওয়া দুটি জায়গা ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে এবং রেল ও নৌমন্ত্রণালয়ের মধ্যকার যৌথ মালিকানার জটিলতা আরবিট্রেশনের মাধ্যমে সমাধান করে আগামী দুই মাসের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের সব জমি সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করা হবে। বর্তমানে বন্দরটিতে ‘জিরো আওয়ার’ ওয়েটিং টাইম বজায় রেখে দুই দিনের মধ্যে পণ্য খালাস করা হচ্ছে। পাশাপাশি লালদিয়ায় ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের মাধ্যমে প্রায় ৮ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে একটি আধুনিক গ্রিন টার্মিনাল গড়ে তোলা হচ্ছে, যা প্রায় তিন হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র তৈরি করবে।
ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে নতুন নিয়ন্ত্রণ এবং অটোরিকশার ডিজিটাল কিউআর ট্র্যাকিং
দেশের বাজার ও সাধারণ মানুষের সার্বিক স্বার্থ সুরক্ষায় ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ও সংশোধনের ক্ষেত্রে নতুন ও সমন্বিত রূপরেখা ঘোষণা করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। সংসদ সদস্য নেওয়াজ হালিমা আরলীর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ওষুধের দাম ঠিক করার ক্ষেত্রে উৎপাদন ও আমদানি খরচ, শুল্ক-কর, সরবরাহ চেইনের ব্যয়, দেশি-বিদেশি বাজার দর, বিকল্প ওষুধের সহজলভ্যতা এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কঠোরভাবে বিবেচনা করা হবে। ওষুধ ও প্রসাধন আইন ২০২৩-এর অধীনে গঠিত পুনর্গঠিত ১৫ সদস্যের ‘ওষুধ মূল্য নির্ধারণ কমিটি’ এই কাজ তদারকি করবে।
মন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার ১১৭টি ওষুধের দাম সরকার বেঞ্চমার্ক হিসেবে নির্ধারণ করে দেয় এবং অন্য ওষুধের নির্দেশক মূল্য নির্ধারিত থাকে। সরকারের নির্ধারিত নির্দেশিকা বা মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে ওষুধ বিক্রি করলে আইন অমান্যকারীর বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অনধিক ২ লাখ টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডের কঠোর আইনি বিধান রাখা হয়েছে।
এদিকে, রাজধানীসহ সারাদেশে চালকদের রুটি-রুজির কথা চিন্তা করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে একটি ডিজিটাল, নিবন্ধিত ও শৃঙ্খলিত কাঠামোর মধ্যে আনার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সংসদ অধিবেশনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর ৭১ বিধির মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ জানান, ঢাকায় চালু থাকা এআই ক্যামেরায় ব্যাটারিচালিত রিকশার নিয়ম ভাঙা ও অনিয়ম ধরা পড়লেও নম্বর প্লেট না থাকায় জরিমানা করা সম্ভব হচ্ছিল না। তবে এটি রাতারাতি বন্ধ করলে লাখ লাখ শ্রমিকের জীবনজীবিকা এবং যাতায়াত স্থবির হয়ে যাবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সারাদেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লাখ অনিয়ন্ত্রিত থ্রি-হুইলার রয়েছে, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৪৮ হাজার অনানুষ্ঠানিক চার্জিংকেন্দ্র চালু থাকায় প্রতি বছর সরকারের প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। তা ছাড়া ২০১৫ সালে সড়কে হওয়া মোট দুর্ঘটনার ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশের পেছনেই ছিল থ্রি-হুইলার। তাই সরকার ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে প্রতিটি অটোরিকশায় এলাকাভিত্তিক কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে, যাতে একটি নম্বরে একাধিক রিকশা চালানো না যায়। একইসঙ্গে ক্ষতিকর লেড-এসিড ব্যাটারি তুলে দিয়ে পরিবেশবান্ধব ডিজিটাল ব্যাটারি ব্যবহারের শর্তযুক্ত করে সুনির্দিষ্ট সমন্বিত নীতিমালা প্রয়োগ করা হচ্ছে।
বহিষ্কৃত এমপিকে স্থায়ী কমিটিতে রাখা নিয়ে বাকযুদ্ধ ও নতুন চার কমিটি গঠন
জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় জোট থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করাকে কেন্দ্র করে সরকারি দল, বিরোধী দল ও স্পিকারের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ কেন্দ্রিক আলোচনা এবং যুক্তিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সংসদ অধিবেশন চলাকালীন চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বিষয়টি স্পষ্ট করে বলেন, গাজী নজরুল ইসলামকে পূর্বে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি থেকে বিরোধী দলের চাওয়ার প্রেক্ষিতে বাদ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একজন নির্বাচিত সদস্য হিসেবে সংসদীয় কার্যক্রমে যুক্ত থাকা তার অধিকার হওয়ায় তাকেও অত্যন্ত কম গুরুত্বপূর্ণ একটি কমিটিতে রাখা হয়েছিল। বিরোধী দল থেকে এতে তীব্র আপত্তি উঠলে চিফ হুইপ বলেন, বিরোধী দল না চাইলে তাকে কমিটিতে রাখার কোনো ইচ্ছা সরকারের নেই।
এর পরপরই বিরোধী দলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে বলেন, গাজী নজরুলকে বিরোধী দলের কোটা থেকে বা প্রস্তাবে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাকে নৈতিক স্খলন ও শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে দল থেকে নীতিগতভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। ফলে তাকে সংসদের মর্যাদা রক্ষায় কোনো কমিটিতে না রাখাটাই নৈতিক ও দৃষ্টান্তমূলক সিদ্ধান্ত হবে।
জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ স্পিকারের অনুমতি নিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলকে কৌশলগত পরামর্শ দিয়ে বলেন, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হয় না যদি না সদস্য নিজে পদত্যাগ করেন কিংবা ফ্লোর ক্রসিং করেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট না দিয়ে ফ্লোর ক্রসিংয়ের শামিল আচরণ করার কারণে বিরোধী দল স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠালেই তার সংসদ সদস্য পদ শূন্য হয়ে যাবে। তবে বিরোধী দলীয় নেতার সম্মানে তাকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি।
উত্তরে বিরোধী দলীয় নেতা কিছুটা হাস্যরস মিশিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, গ্রামে দুর্বল মানুষকে বিপদে ফেলতে যেমন নির্বাচনে দাঁড় করানোর কথা প্রচলিত আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও মাঝে মাঝে সংসদকে প্রাণবন্ত করতে তেমন সুন্দর কূটনৈতিক টিপস দেন। তিনি ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, যেহেতু তাকে আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে, নতুন করে ফ্লোর ক্রসিংয়ের চিঠি দেওয়া প্রাসঙ্গিক নয়, তবে সরকারের এই নমনীয়তা প্রশংসনীয়। পরবর্তীতে চিফ হুইপ সংশোধন প্রস্তাব এনে গাজী নজরুল ইসলামকে বাদ দিয়েই ‘সরকারী প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটি’ পুনর্গঠনের প্রস্তাব বিল পাস করান।
একইসঙ্গে কার্যপ্রণালী-বিধির সংশ্লিষ্ট বিধান অনুসরণ করে সর্বমোট চারটি গুরুত্বপূর্ণ স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রমের সভাপতিত্বে ‘কার্যপ্রণালী-বিধি সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’ এবং ‘পিটিশন কমিটি’ গঠিত হয়। সংসদ সদস্য এ. এম. মাহবুব উদ্দিনকে সভাপতি করে ‘সরকারী প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটি’ এবং বগুড়া-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. রেজাউল করিম বাদশাকে সভাপতি মনোনীত করে ১০ সদস্য বিশিষ্ট ‘গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি’ গঠন আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন হয়।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মারপ্যাঁচ: বিরোধী দলের তীব্র সমালোচনা ও সরকারের পাল্টা রূপরেখা
সংসদ কার্যপ্রণালী বিধির ৬৮ বিধির আলোচনায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সীমাহীন বকেয়া, লোডশেডিং, ভুতুড়ে বিল ও ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। আলোচনার সূত্রপাত করে পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বিদ্যুৎ বিলে অযৌক্তিক ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়াকে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ আখ্যা দিয়ে তা সম্পূর্ণ বন্ধের দাবি জানান।
তিনি তথ্য দিয়ে তুলে ধরেন, দেশে ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এবং ১৭ হাজার মেগাওয়াট সর্ব্বোচ্চ চাহিদার বিপরীতে দিনে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং হচ্ছে। এর কারণ আর্থিক অব্যবস্থাপনা, সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের কাছে বকেয়া রেখেছে প্রায় ৫২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, অথচ অলস ফেলে রাখা কেন্দ্রগুলোকে দিতে হচ্ছে প্রায় ৪৮ হাজার কোটি টাকার বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ। এ ছাড়া দেশীয় অনুসন্ধান বন্ধ রাখায় দেশীয় গ্যাস উত্তোলন কমে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে এবং বিপুল আমদানীকৃত এলএনজির পেছনে ৫৯ হাজার কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। সমস্যা মেটাতে তিনি শিল্পকারখানাগুলোকে সরাসরি বিদ্যুতের উৎপাদকদের কাছ থেকে বিদ্যুৎ কেনাবেচা করার ‘ওপেন অ্যাক্সেস’ সুবিধা দেওয়া, জ্বালানি জরুরি সেল গঠন এবং উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকেও ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া অব্যাহত রাখা নিয়ে দুর্নীতির বিচার দাবি করেন।
পাল্টা বক্তব্যে সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ বলেন, বর্তমানের সংকট বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দূরদর্শিতাহীন নীতি, আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা এবং ঘনিষ্ঠ অনুগত টাইকুনদের লালন-পালনের সরাসরি বিষময় ফল। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেই বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা সত্ত্বেও কৃষকদের সেচ নির্বিঘ্ন রাখতে দীর্ঘদিন তেলের দাম বাড়ায়নি। সরকার দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করেছে এবং ভোলার গ্যাস ব্যবহার করে ফার্টিলাইজার প্ল্যান্ট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। মাতারবাড়ীতে ভূমিনির্ভর ও ভাসমান এফএসআরইউ স্থাপনসহ ১০০ কিলোমিটার এডভান্সড পাইপলাইন করা হচ্ছে। বড়পুকুরিয়ার নিজস্ব উচ্চমানের কয়লা দিয়ে ৬০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো এবং পায়রা-২ কয়লা বিদ্যুতের কাজ দ্রুত সম্পাদন করতে জিওবি তহবিল থেকে সঞ্চালন লাইন গড়ে দেওয়ার পরিকল্পনা চলছে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকার মিথ্যা ও সুগার কোটেড আশ্বাস দিয়ে সংকট লুকাতে চাইছে। বাস্তবে দেশের গ্রামাঞ্চলে প্রতিদিন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। অতীতের সরকারগুলোর আমলের কুইক রেন্টাল ও অন্যায্য ক্যাপাসিটি চার্জের যে লুটপাট চলেছে, তা থেকে দেশকে বের করতে না পারলে সরকারের বড় বড় পরিকল্পনা শুধুই কাগজে থেকে যাবে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর সাদামাটা জীবনের প্রশংসা করে চারপাশের সুযোগ সন্ধানীদের চাটুকারিতা বাদ দিয়ে কাজে নামার আহ্বান জানান। তিনি বিরোধী দলের কারিগরি সহায়তা নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের দক্ষ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে জরুরিভিত্তিতে বিদ্যুৎ খাতের সংকট নিরসনে একটি বিশেষ শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠনের স্পষ্ট প্রস্তাব দেন।
জ্বালানি আলোচনাটির সমাপ্তি টেনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত মিটার ভাড়া সম্পূর্ণ মওকুফের দাবি প্রসঙ্গে জানান, সারাদেশের বিদ্যুৎ গ্রাহকদের সম্পূর্ণ মিটার ভাড়া এককালীন মওকুফ করতে গেলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকার বিশাল অর্থ লাগবে যা বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্ভব নয়। তবে গ্রাহকরা নিজ খরচে মিটার কিনে নিলে তাদের মাসিক মিটার ভাড়া দিতে হবে না। ২০৩০ সালের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রাহকদের ডিজিটাল প্রিপেইড মিটারে আনার কাজ সম্পন্ন হবে।
প্রতিমন্ত্রী নিশ্চিত করেন, প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’ এবং সম্পূর্ণ মন্ত্রিসভা সেই অনুযায়ী এগোচ্ছে। ইতোমধ্যেই মেয়াদ শেষ হওয়া পাঁচটি অবসরপ্রাপ্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে, যা থেকে কোনো প্রকার ক্যাপাসিটি চার্জ না দিয়ে এ সপ্তাহ থেকেই ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে যাচ্ছে। রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের বন্ধ ইউনিটটি চলতি সপ্তাহে চালুর প্রস্তুতি চলছে। এইচএফও কেন্দ্রগুলোর জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে যা থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ মিলবে। এ ছাড়া মাত্র এক শতাংশ শুল্কে রুফটপ সোলার আমদানি, ছয় মাসের ভ্যাট-ট্যাক্স ছাড় এবং উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ ১০ টাকা ৫০ পয়সায় সরকারের কাছে কেনার যুগান্তকারী সুবিধা দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে দামে বড় তারতম্য সত্ত্বেও ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের পুরো জ্বালানি খাত সম্পূর্ণ টেকসই ও সংকটমুক্ত হবে বলে তিনি সংসদকে আশ্বস্ত করেন।
এসআর/এএমকে
