বিজ্ঞাপন

উপজেলা প্রতিবেদনে আদালতের নির্দেশনা, সিভিল সার্জনের প্রতিবেদনে উধাও

উপজেলা প্রতিবেদনে আদালতের নির্দেশনা, সিভিল সার্জনের প্রতিবেদনে উধাও

উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ও বিচারাধীন মামলার তথ্য গোপন করে স্যানিটারি ইন্সপেক্টরের শূন্য পদের তালিকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয়ের বিরুদ্ধে। নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্দেশ্যে পাঠানো ওই নথিতে আদালতে বিচারাধীন মামলার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন চার উপজেলায় নিজ বেতনে (অস্থায়ী ভিত্তিতে) কর্মরত স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা।

এ ঘটনায় সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের বর্তমান সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন সন্দ্বীপ, হাটহাজারী, বাঁশখালী ও ফটিকছড়ি উপজেলার স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা।

প্রাপ্ত নথি সূত্রে জানা যায়, গত ৩ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবরে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে একটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়। তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর স্বাক্ষর করা ওই প্রতিবেদনে সন্দ্বীপ, হাটহাজারী, বাঁশখালী ও ফটিকছড়ি উপজেলায় স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে নিজ বেতনে কর্মকর্তা কর্মরত থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়। তবে এসব পদ নিয়ে উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রিট মামলা ও আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

অথচ প্রতিবেদকের হাতে আসা নথি অনুযায়ী, এর আগে সংশ্লিষ্ট চার উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পাঠানো প্রতিবেদনে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

নথি অনুযায়ী, গত ২৭ জুলাই বাঁশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা নাজমা আকতারের স্বাক্ষর করা প্রতিবেদনে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। একই দিনে ফটিকছড়ি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুহাম্মদ তৌহিদুল আলম এবং হাটহাজারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. তাপস কান্তি মজুমদারের স্বাক্ষর করা প্রতিবেদনে আদালতের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া, ২৯ জুলাই সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মানস বিশ্বাসের স্বাক্ষর করা প্রতিবেদনেও উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

অভিযোগকারীদের দাবি, উপজেলা পর্যায় থেকে পাঠানো এসব প্রতিবেদনে আদালতের নির্দেশনার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকার পরও সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো চূড়ান্ত প্রতিবেদনে তা বাদ দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর মো. জাবেদুল ইসলাম উপজেলা থেকে পাঠানো প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি বাদ দেন। পরে আদালতের স্থগিতাদেশের বিষয়টি উল্লেখ না করেই তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর স্বাক্ষরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে শূন্য পদের চূড়ান্ত তালিকা পাঠানো হয়।

ভুক্তভোগী স্যানিটারি ইন্সপেক্টরদের অভিযোগ, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ পাশ কাটিয়ে নতুন নিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে তথ্যটি গোপন করা হয়েছে। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে তারা যৌথভাবে বর্তমান সিভিল সার্জনের কাছে আবেদন করেছেন। আবেদনে উপজেলা থেকে পাঠানো মূল নথির সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো নথি যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।

এ বিষয়ে সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্যানিটারি ইন্সপেক্টর টিটু কান্তি পাল ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রথমে আমি স্বাস্থ্য সহকারী পদে চাকরিতে যোগদান করি। পরবর্তী সময়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি থেকে ৪ বছর মেয়াদি স্যানিটারি ইন্সপেক্টরশিপ ডিপ্লোমা করি। এরপর ২০১৮ সালের ১৮ জুলাই থেকে স্যানিটারি ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত রয়েছি। আমার পদে স্থায়ী নিয়োগ পেতে ২০২৩ সালে উচ্চ আদালতে রিট করি। বর্তমানে এটি বিচারাধীন রয়েছে। এমতাবস্থায় আমার পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া না করার জন্য উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। আমার মতো বাকি তিনজনের বিষয়েও নির্দেশনা রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রতিবেদন চাওয়া হলে উপজেলা থেকে মামলার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে অধিদপ্তরে পাঠানো প্রতিবেদনে মামলার বিষয়টি গায়েব করে ফেলা হয়। সাবেক সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বিষয়টি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করেছেন।

জালিয়াতির বিষয়টি স্বীকার করে অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর মো. জাবেদুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমি ছোট পদে চাকরি করি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন, আমি সেভাবেই করেছি।

ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কে— জানতে চাইলে তিনি সাবেক সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলমের নির্দেশনার কথা জানান।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে তৎকালীন সিভিল সার্জন ও বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সংযুক্ত কর্মকর্তা ডা. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে অভিযোগের বিষয়বস্তু তাকে লিখিতভাবে জানানো হয়। এরপরেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান ঢাকা পোস্টকে বলেন, এটা আগের ঘটনা। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখছি।

এমআর/এসএএস