বিজ্ঞাপন

সুপ্রিম কোর্টের ভবন নির্মাণে ৬.৩২ কোটি টাকা আত্মসাতের সত্যতা পেয়েছে দুদক

সুপ্রিম কোর্টের ভবন নির্মাণে ৬.৩২ কোটি টাকা আত্মসাতের সত্যতা পেয়েছে দুদক

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্পে বিধিবহির্ভূতভাবে আটটি প্যাকেজে ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল পরিশোধের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদকের অভিযানে অন্তত চারটি প্যাকেজের কাজের কোনো ভৌত অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। কাজের অস্তিত্ব না থাকলেও বিল পরিশোধের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষতিসাধনের সত্যতা মিলেছে।  

বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এ অভিযান চালিয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র সংগ্রহ ও কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে এমন তথ্য পেয়েছে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম।

দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের রেকর্ড ভবন নির্মাণ প্রকল্প'–এর কাজের ক্ষেত্রে প্যাকেজ বিভাজনে অনিয়ম, ই-জিপি টেন্ডার প্রক্রিয়ায় কারসাজি, কাজের অস্তিত্ব ছাড়া বিল পরিশোধ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার অভিযোগে একটি এনফোর্সমেন্ট অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানকালে এনফোর্সমেন্ট টিম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।

dhakapost

তিনি বলেন, দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে সংগৃহীত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিপিপি, আরডিপিপি কিংবা হেড অব প্রোকিউরমেন্টের অনুমোদন ছাড়াই একই খাতের কাজকে আটটি পৃথক প্যাকেজে বিভক্ত করে ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে এসব প্যাকেজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। তাদের অনুকূলে মোট ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

দুদক জানায় ‘বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য রেকর্ড ভবন নির্মাণ (১ম সংশোধিত)’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট প্রাক্কলিত মূল্য ২৭৯ কোটি ৫৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। প্রকল্পের মূলধন অংশের ‘অনাবাসিক ভবন’ খাতে সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট প্রোকিউরমেন্ট কমিটি (সিসিজিপি) অনুমোদিত একমাত্র কাজ ছিল ডব্লিউ-১ প্যাকেজ।

ডিপিপি ও আরডিপিপি অনুযায়ী, ওই একটি প্যাকেজের আওতায় কাজ করার অনুমোদন ছিল। এর কার্যাদেশ ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বর ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডকে (এনডিইএল) দেওয়া হয়। কার্যাদেশের মূল্য ছিল ১৫৫ কোটি ৭০ লাখ ৪ হাজার টাকা। কিন্তু ডিপিপি, আরডিপিপি কিংবা হেড অব প্রোকিউরমেন্টের অনুমোদন ছাড়াই একই খাতের কাজকে আরও আটটি পৃথক প্যাকেজে বিভক্ত করে ই-জিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হয়। পরে এসব প্যাকেজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় আটটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। তাদের অনুকূলে মোট ৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৭ হাজার টাকা বিল পরিশোধ করা হয়।  

দুদকের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, বিভাজিত আটটি প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের জাজেস স্পোর্টস কমপ্লেক্সের পাশে নতুন বেকারি ও ক্যান্টিন নির্মাণ, রেকর্ড ভবনের তিনটি বেসমেন্ট ফ্লোর নির্মাণের জন্য অস্থায়ী ট্রিপল ওয়ার্ক স্থাপন, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য ভেন্যু সংস্কার, ব্র্যান্ডিং ও ক্যাটারিং, গাইড ওয়াল-মাস্টার ড্রেন-র‌্যাম্প ও হাই-টেনশন কেবল লাইন অপসারণ, অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ, অস্থায়ী ড্রেন ও সিআই শিটের বেড়া নির্মাণ এবং বালু ভরাট, বৃষ্টির পানি অপসারণ ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ।

৮টি প্যাকেজে কাজের বিপরীতে যত ব্যয় দেখানো হয়–

প্যাকেজেগুলো হলো :

১. বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের জন্য ‘রেকর্ড ভবন নির্মাণ’ প্রকল্পের আওতায় নতুন বেকারি নির্মাণ– ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কামরুল এন্টারপ্রাইজ, ব্যয় ৪৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকা।

২. নতুন ক্যান্টিন নির্মাণ— ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মিম্পা এন্টারপ্রাইজ, ব্যয় ৭৯ লাখ ৮ হাজার টাকা।

৩. তিনটি বেসমেন্ট ফ্লোর নির্মাণে অস্থায়ী ট্রিপল ওয়ার্ক স্থাপন— ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আরএস এন্টারপ্রাইজ, ব্যয় ৬৩ লাখ ৩৭ হাজার টাকা।

৪. উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের জন্য ভেন্যু সংস্কার, ব্র্যান্ডিং ও ক্যাটারিং— ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রাম বাংলা, ব্যয় ৭৪ লাখ ৮৯ হাজার টাকা।

৫. গাইড ওয়াল, মাস্টার ড্রেন, র‌্যাম্প, হাই-টেনশন কেবল লাইন অপসারণসহ অন্যান্য কাজ— ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স গোমতি এন্টারপ্রাইজ, ব্যয় ৬৪ লাখ টাকা।

৬. সুপ্রিম কোর্ট রেকর্ড ভবনের অ্যাপ্রোচ রোড নির্মাণ— ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রশা ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল,  ব্যয় ১ কোটি ৯৪ হাজার টাকা।

৭. অভ্যন্তরীণ অস্থায়ী ড্রেন ও সিআই শিটের বেড়া নির্মাণ— ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী কনস্ট্রাকশন, ব্যয় ৯৯ লাখ ৯৩ হাজার টাকা।

এবং বালু ভরাট, বৃষ্টির পানি অপসারণ ও ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার— ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শোধেষ ডেভেলপমেন্ট,  ব্যয় ৯৯ লাখ ২১ হাজার টাকা ইত্যাদি। 

দুদকের অ্যানফোর্সমেন্ট টিমের নথি পর্যালোচনা ও সরেজমিন তদন্তে আটটি প্যাকেজের মধ্যে অন্তত চারটি প্যাকেজের কাজের কোনো ভৌত অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ঠিকাদারদের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিপত্র কিংবা কাজের পরিমাপ বইও পাওয়া যায়নি।  

dhakapost

অন্যদিকে, ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর প্যাকেজের কাজের অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব কাজ মূলত মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেডের (এনডিইএল) মাধ্যমে সম্পাদিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলীর প্রতিবেদনের পাশাপাশি এনডিইএলের চুক্তি ও পরিমাপ বই পর্যালোচনা করেও এর সত্যতা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ এসব কাজের জন্য আলাদা করে আট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্যাকেজ তৈরি ও বিল পরিশোধের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, প্রকল্পের ডিপিপি, আরডিপিপি বা হোপের অনুমোদন ছাড়াই মূল ডব্লিউ-১ প্যাকেজের সিভিল কাজ আটটি পৃথক প্যাকেজে বিভক্ত করা হয়। 

এছাড়া, অর্থ বিভাগের ২০১৫ সালের ১৬ জানুয়ারির ৩৫১ নম্বর স্মারকে অর্পিত ক্ষমতা অনুযায়ী, ১ কোটি থেকে ৩ কোটি টাকা মূল্যমানের দর অনুমোদনের এখতিয়ার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর। কিন্তু ৬ নম্বর প্যাকেজটির মূল্য ১ কোটি ৯৪ হাজার টাকা হলেও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই সেটি অনুমোদন করা হয়েছে বলে দুদক প্রমাণ পেয়েছে। এ ঘটনায় মূলত দায়ী হিসেবে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী, ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর মো. সাইফুজ্জামানকে চিহ্নিত করা হয়।

তবে, অ্যানফোর্সমেন্ট অভিযানের সময় ওই কর্মকর্তার বক্তব্য বা ব্যাখ্যা নেওয়া সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর দায়-দায়িত্ব, প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ এবং অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট চিত্র এখনো বিস্তারিতভাবে উদঘাটন করা প্রয়োজন বলে মনে করছে দুদক। এ কারণে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে অনুসন্ধানের জন্য সুপারিশসহ অ্যানফোর্সমেন্ট প্রতিবেদন দাখিল করা হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

আরএম/জেআই