দেশে তীব্র সার সংকট, কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়া কিংবা ভবিষ্যতে সম্ভাব্য খাদ্য ঘাটতি সংক্রান্ত যেসব অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী শরিফুল ইসলাম। তিনি দাবি করেছেন, সরকার কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত উৎপাদন, আমদানি ও নিরাপদ মজুত বজায় রেখেছে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ৬৮ বিধিতে উত্থাপিত এক জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পক্ষে বক্তব্য দিতে গিয়ে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী এসব তথ্য জানান।
সংসদ সদস্য মো. নাজিবুর রহমান দেশের বিভিন্ন স্থানে সার সংকট ও সম্ভাব্য খাদ্য সংকটের বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করলে তার পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী এই ব্যাখ্যা দেন।
বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী শরিফুল ইসলাম জানান, শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) সার উৎপাদন, আমদানি, পরিবহন ও মজুত নিশ্চিত করে কৃষি মন্ত্রণালয়ের চাহিদা অনুযায়ী ডিলারদের মাধ্যমে কৃষকদের মাঝে তা সরবরাহ করে থাকে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশে এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৮ হাজার ৭৯৯ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার উৎপাদিত হয়েছে এবং ১ লাখ ১৭ হাজার ৮৯৯ মেট্রিক টন সার আমদানি করা হয়েছে। ইতোমধ্যেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ৫ লাখ ৩০ হাজার ৯২৫ মেট্রিক টন ইউরিয়া সার বিতরণ করা হয়েছে এবং বর্তমানে ৪ লাখ ৯ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার নিরাপদে মজুত রয়েছে। আসন্ন পিক ও মিনি পিক সিজনে কৃষকদের সার সংকট যেন না হয়, সে লক্ষ্যে সার কারখানাগুলোর উৎপাদন ও বিদেশ থেকে আমদানি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
দেশের সার কারখানাগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিসিআইসির নিয়ন্ত্রণাধীন সাতটি সার কারখানার মধ্যে পাঁচটি ইউরিয়া, একটি টিএসপি ও একটি ডিএপি সার কারখানা রয়েছে। বর্তমানে ঘোড়াশাল পলাশ ফার্টিলাইজার এবং সিলেটের শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানিতে উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। এর পাশাপাশি চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেডে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ায় এটি পুনরায় চালুর প্রক্রিয়া শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং শিগগিরই পুরোদমে উৎপাদন শুরু হবে। তবে কাঁচামাল ও গ্যাস সরবরাহের জটিলতায় যমুনা ফার্টিলাইজার, ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি এবং টিএসপি ও ডিএপি সার কারখানার উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। সামনের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে যথাক্রমে আরো ৮৮ হাজার ও ১ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিগত অর্থবছরের চিত্র তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে ১১ লাখ ৬১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি ইউরিয়া, ৬৮ হাজার মেট্রিক টনের বেশি টিএসপি এবং ৮২ হাজার মেট্রিক টনের বেশি ডিএপি সার উৎপাদিত হয়েছে। এছাড়া উক্ত অর্থবছরে ১৪ লাখ ৭ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার আমদানি করা হয় এবং সারা দেশে ২৫ লাখ ৯৫ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি ইউরিয়া সার বিতরণ করা হয়েছে। ফলে বিদ্যমান তথ্য-উপাত্ত স্পষ্ট প্রমাণ করে যে সার নিয়ে উদ্বেগের কোনো ভিত্তি নেই এবং এটি নিয়ে কৃষকদের মাঝে ভীতি ছড়ানোর সুযোগ নেই। সংসদ সদস্যরা বিরোধী দল হিসেবে যে গঠনমূলক পরামর্শ দিয়েছেন তাকে সরকার স্বাগত জানায় এবং প্রান্তিক মানুষের কল্যাণে সরকার বিরোধীদের মতামত শুনে সংসদকে প্রাণবন্ত রাখতে চায়।
কৃষি ব্যবস্থাপনা ও গ্রামীণ অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নে সরকারের পরিকল্পনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যেমন খাল কাটা কর্মসূচির মাধ্যমে কৃষি বিপ্লব ঘটিয়ে গ্রামীণ অর্থনীতি স্বাবলম্বী করেছিলেন, ঠিক তেমনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বর্তমান সরকার খাল কাটা কর্মসূচি, কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড, সামাজিক ও ধর্মীয় ভাতা প্রদান এবং কৃষি ঋণ মওকুফের মাধ্যমে কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করার কাজ করে যাচ্ছে। বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সার কমিটিতে স্থানীয় এমপিদের উপদেষ্টা করার কোনো বাস্তবসম্মত প্রয়োজন নেই। কারণ এটি একটি স্বতন্ত্র প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কমিটির মাধ্যমে তা যথাযথভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত।
মাঠ পর্যায়ে সারের কৃত্রিম সংকট ও ডিলারদের অব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেন যে বিগত ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদের আমলে নিয়ন্ত্রিত যেসব ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তারা এখনো বহাল থাকার কারণে কিছু প্রশাসনিক ত্রুটি দেখা দিচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ডিলারশিপ বাতিলের আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং নতুন সার ডিলার নিয়োগের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে সার্কুলার জারি করেছে। অবৈধভাবে সার মজুত, পাচার কিংবা দুই নম্বরি রুখতে মাঠে সরকারের মনিটরিং ব্যবস্থা অত্যন্ত সক্রিয় রয়েছে। সারাদেশে অভিযান চালিয়ে অবৈধ সার জব্দ করা হচ্ছে, গোডাউন সিলগালা করা হচ্ছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সীমান্ত দিয়ে সার পাচারের চেষ্টা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে সারের দাম প্রতিবেশীর তুলনায় কম। সমন্বিত ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এসব ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটি দূর করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সরকার দেশে পূর্ণাঙ্গ কৃষি বিপ্লব ঘটাতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
এসআর/বিআরইউ
