বিজ্ঞাপন

তিন সন্তানকে নিয়ে অটোরিকশা চালান ইয়াসমিন, পাশে দাঁড়ালেন চট্টগ্রামের ডিসি

তিন সন্তানকে নিয়ে অটোরিকশা চালান ইয়াসমিন, পাশে দাঁড়ালেন চট্টগ্রামের ডিসি

স্বামী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে অসুস্থ। কাজ করার সামর্থ্য নেই। সংসারে তিন সন্তান। স্বামীর চিকিৎসা, সন্তানদের পড়াশোনা ও পরিবারের দৈনন্দিন খরচ, সবকিছুর দায়িত্ব এসে পড়ে ইয়াসমিন আক্তারের ওপর।

অভাবের কাছে হার মানেননি ইয়াসমিন। ভাড়ায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে নিজেই নেমেছেন রাস্তায়। তিন সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছেন তিনি। সীমিত আয়ের মধ্যেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে স্বামীর চিকিৎসা ও সংসারের খরচ একসঙ্গে চালানো তার জন্য দিন দিন কঠিন হয়ে উঠছিল।

স্থানীয় এক ব্যক্তির মাধ্যমে ইয়াসমিনের জীবনসংগ্রামের কথা জানতে পারেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। বুধবার (৮ সেপ্টেম্বর) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাপ্তাহিক গণশুনানিতে ইয়াসমিন নিজেই অটোরিকশা চালিয়ে হাজির হন। সেখানে তিনি তার পরিবারের পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেন।

ইয়াসমিনের কথা শুনে তার সংগ্রামের প্রশংসা করেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের শ্রমে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন ইয়াসমিন। সন্তানদের পড়াশোনা যেন কোনোভাবেই বন্ধ না হয়, সে বিষয়েও তাকে উৎসাহ দেন তিনি।

ইয়াসমিনের সংগ্রামের প্রতি সম্মান জানাতে নিজের কার্যালয় থেকে নিচে নেমে তার অটোরিকশার পাশে দাঁড়িয়ে ছবিও তোলেন জেলা প্রশাসক।

এ সময় ইয়াসমিনকে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘এত চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তুমি কারও কাছে হাত পাতোনি, কারও কাছে ছোট হওনি। তুমি নিজেই একটা অটো নিয়েছো, অটো নিয়ে পরিশ্রম করে চলছো, এটা খুবই ভালো।’

পরে ইয়াসমিনের স্বামীর চিকিৎসার জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেন জেলা প্রশাসক। তাকে চাল, ডাল, তেলসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী ও কিছু উপহার দেওয়া হয়। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্যও তাঁকে উৎসাহ দেওয়া হয়।

সহায়তা পেয়ে ইয়াসমিন বলেন, ‘আমার তিনটা ছেলে আছে। তিনটা ছেলেকে নিয়ে খাচ্ছি। উনি আমাকে চাল দিয়েছেন, কিছু টাকা-পয়সাও দিয়েছেন।’

গণশুনানিতে উঠে এল আরও অনেক গল্প

শুধু ইয়াসমিন নন, বুধবারের জেলা প্রশাসকের গণশুনানিতে আরও অনেক মানুষের জীবনসংগ্রামের কথা উঠে আসে। কেউ ক্যানসারের চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারছেন না, কারও সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিস করাতে হয়। কেউ প্যারালাইসিসে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন।

আবার কেউ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা জয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও অর্থাভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

গণশুনানিতে তাদের সমস্যার কথা শুনে প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার ব্যবস্থা করেন জেলা প্রশাসক। এদিন অসুস্থ ও অসহায় ১০ জন এবং একজন শিক্ষার্থীকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। আর্থিকভাবে অসচ্ছল একজনকে চাল, ডাল, তেল, চিনি, লবণ ও মসলাসহ খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ওমর ফারুক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তার বাবা দিনমজুর। পাঁচ সদস্যের পরিবারের খরচের পাশাপাশি ওমরের পড়াশোনা, যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের ব্যয় বহন করা পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও অর্থাভাবে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল তাঁর। উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে তাকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

ইফফাত জাহান ইশা দীর্ঘদিন ধরে কিডনি রোগে ভুগছেন। সপ্তাহে তিনবার তাকে ডায়ালাইসিস করাতে হয়। এর পাশাপাশি তিনি ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপেও আক্রান্ত। তার বাবা আবদুর রহিম দীর্ঘদিন ধরে কর্মহীন। মেয়ের নিয়মিত চিকিৎসার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে পড়ায় তিনি সহায়তার আবেদন করেন।

কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত মো. নাজমুল হুদার অস্ত্রোপচার হয়েছে। এখন চলছে কেমোথেরাপি। পাশাপাশি মৃগীরোগের চিকিৎসাও নিচ্ছেন তিনি। দীর্ঘদিনের চিকিৎসায় বিপুল অর্থ ব্যয় হওয়ায় কেমোথেরাপি চালিয়ে যাওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

রাঙ্গুনিয়ার মোহাম্মদ আবদুল শুকুর দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতা ও পঙ্গুত্বজনিত সমস্যায় ভুগছেন। নিয়মিত আয়ের উৎস না থাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও করাতে পারছেন না তিনি।

বাঁশখালীর মো. আবু তাহের প্রায় সাড়ে তিন বছর আগে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন। শরীরের বাঁ পাশ অবশ হয়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা কিংবা কাজ করতে পারেন না। এতে তার উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। অর্থের অভাবে নিয়মিত চিকিৎসাও করাতে পারছেন না।

পটিয়ার আজিজুল হক পেশায় রাজমিস্ত্রি ছিলেন। প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হওয়ার পর কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। স্ত্রী, দুই মেয়ে ও তিন ছেলে নিয়ে তার সংসার। উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের ভরণপোষণের পাশাপাশি নিজের চিকিৎসা চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। একই এলাকার আবুল কাসেম চোখের রোগে আক্রান্ত। তার অস্ত্রোপচার ও পরবর্তী চিকিৎসা প্রয়োজন। অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে তিনিও সহায়তার আবেদন করেন।

পারুল বেগমের স্বামী বহু বছর ধরে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। তার এক সন্তানও প্রতিবন্ধী। পারুল নিজেও কিডনি ও লিভারের সমস্যায় ভুগছেন। পরিবারের ভরণপোষণ ও চিকিৎসার খরচ জোগাতে তাঁকে ভিক্ষাবৃত্তি করতে হচ্ছে বলে আবেদনে উল্লেখ করেছেন।

মর্জিনা বেগমের স্বামীর হৃদ্‌যন্ত্রে অস্ত্রোপচার হয়েছে। চার মাস ধরে তিনি কাজ করতে পারছেন না। দুই মেয়ে ও এক ছেলের পরিবারে তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার আয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারের খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

হালিশহরের রোকছানা বেগমের স্বামী মারা গেছেন ১০ বছরের বেশি আগে। এরপর থেকে ছয় সন্তানকে নিয়ে একাই সংসার চালিয়ে আসছেন তিনি। সন্তানদের ভরণপোষণ করতে না পেরে তিনিও আর্থিক সহায়তার আবেদন করেন। 

২১ জনের কথা শুনলেন জেলা প্রশাসক 

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বেলা ১১টায় শুরু হওয়া গণশুনানিতে সরাসরি ২১ জন সেবাপ্রত্যাশী অংশ নেন। চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি জমিজমা, সম্পত্তি জবরদখলসহ বিভিন্ন সমস্যার কথাও তাঁরা জেলা প্রশাসকের কাছে তুলে ধরেন। অনলাইনে যুক্ত হয়ে একজন প্রবাসীও তার অভিযোগ জানান।

অভিযোগগুলো শুনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে গৃহীত ব্যবস্থার ফলাফল আবেদনকারীকে জানানোর নির্দেশও দেন তিনি।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ‘একটি আবেদন গ্রহণের পর সেটি কোথায় গেল, কী সিদ্ধান্ত হলো এবং তার ফলাফল কী, সেবাপ্রত্যাশী যেন সেটি জানতে পারেন, সেটিও আমাদের দায়িত্ব।’

সরকারি দপ্তরে জমা পড়া আবেদনে সাধারণত থাকে নাম, ঠিকানা ও সমস্যার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। কিন্তু গণশুনানিতে সেই কাগজের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে মানুষের জীবনের নানা সংকট, ক্যানসারের চিকিৎসা, সপ্তাহে তিনবার ডায়ালাইসিসের খরচ, প্যারালাইসিসে বন্ধ হয়ে যাওয়া উপার্জন কিংবা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতা জয় করে বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকে থাকার লড়াই।

এএইচ/এমএসএ