দুর্নীতি প্রতিরোধ ও রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে গণমাধ্যমকর্মীদের দুর্নীতি বিরোধী আন্দোলনের প্রধান সহায়তাকারী শক্তি বলে উল্লেখ করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, পেশাগত কাজ করতে গিয়ে নানা ধরনের ঝুঁকি, বাধা কিংবা প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হতে হলেও কোনো অবস্থাতেই হতাশ হয়ে পিছিয়ে যাওয়া যাবে না। গণমাধ্যম ও টিআইবির মতো সুশীল সমাজ যদি পিছু হটে, তবে দুর্নীতিবাজ ও সুশাসন বিরোধী শক্তিই জয়ী হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ জন্য দেশের স্বার্থে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণমাধ্যম ও টিআইবিকে একযোগে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যেতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মাইডাস সেন্টারে টিআইবির প্রধান কার্যালয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিটে কর্মরত সাংবাদিকদের সংগঠন ডেভেলপমেন্ট জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ (ডিজেএফবি) এর সদস্যদের জন্য আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় এসব কথা বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক।
ড. ইফতেখারুজ্জামান প্রশিক্ষণার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, টিআইবি প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও গবেষণামূলক কাজের ক্ষেত্রে গণমাধ্যম সবসময়ই সবচেয়ে বড় অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। গণমাধ্যমকর্মীদের দক্ষতা, উৎকর্ষতা এবং অনুসন্ধানী ক্ষমতার বিকাশ ঘটাতে টিআইবি ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে সাংবাদিকদের পেশাগত মানোন্নয়নে নিয়মিত এ ধরনের দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রশিক্ষণ, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে মাঠপর্যায়ে সেমিনার এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ফেলোশিপ প্রোগ্রামের আয়োজন করা হয়। এ বছর ইতোমধ্যে ১০টি অনুসন্ধানী ফেলোশিপ অফার করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং পাওয়া প্রস্তাবগুলো থেকে যোগ্যদের নির্বাচন করে শিগগিরই কার্যক্রম শুরু হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে টিআইবি প্রধান বলেন, বিশ্বের যেসব দেশে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে, সেখানে অবশ্যই গণমাধ্যমের স্বাধীন অনুসন্ধানী ভূমিকাকে অপরিহার্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার, অসচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি জনসমক্ষে তুলে ধরা সম্ভব হয়। এর ফলে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার জায়গায় নিয়ে আসার জন্য গণদাবি ও সামাজিক চাপ তৈরি করা যায়, যা সুশাসনের মূল ভিত্তি।
তবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পাশাপাশি নিজস্ব দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার ওপর বিশেষ জোর দেন ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, কোনো স্বাধীনতাই সীমাহীন বা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে হতে পারে না। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও পেশাগত ক্ষমতার সাথে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতাও সরাসরি যুক্ত। তাই গণমাধ্যমকে যেমন সম্পূর্ণ স্বাধীন ও মুক্তভাবে অনুসন্ধানী কাজ করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে, তেমনি গণমাধ্যমকেও স্ব-উদ্যোগে নিজেদের পেশাগত নৈতিকতা ও অভ্যন্তরীণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
গণমাধ্যমের পথ সুগম করার বিষয়ে টিআইবির প্রচেষ্টা তুলে ধরে তিনি জানান, মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন আইনি সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত পরিবর্তন আনার জন্য টিআইবি সরকারের সাথে ধারাবাহিকভাবে দ্বিপাক্ষিক আলোচনা ও কাজ করে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে নানামুখী প্রতিকূলতায় ক্ষেত্রবিশেষে কিছুটা পিছিয়ে পড়ার মতো দৃষ্টান্ত তৈরি হলেও হাল না ছাড়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
তিনি সাংবাদিকদের আশ্বস্ত করে বলেন, এই প্রশিক্ষণকে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন বা ক্ষণিকের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করলে চলবে না। কর্মশালা শেষ হলেও টিআইবির সঙ্গে সাংবাদিকদের পেশাগত যোগাযোগ ও মেলবন্ধন অব্যাহত থাকবে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে তথ্যের প্রযুক্তিগত সহায়তা, কৌশলগত পরামর্শ কিংবা যেকোনো আইনি বা প্রাতিষ্ঠানিক ঝুঁকির সময়ে টিআইবি সাধ্যমতো সাংবাদিকদের পাশে থাকবে। প্রশিক্ষণার্থীদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে এবং ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে আরও গভীর ও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে হবে বলে জানান তিনি।
এসআর/এমএসএ
