বিজ্ঞাপন

পরিবর্তনের বাংলাদেশে বৈষম্য দেখতে চাই না : শফিকুর রহমান

পরিবর্তনের বাংলাদেশে বৈষম্য দেখতে চাই না : শফিকুর রহমান

পরিবর্তনের বাংলাদেশে কোনো ধরনের বৈষম্য দেখতে চান না বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে দলীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে মেধা, দক্ষতা ও সততার ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করতে হবে। একইসঙ্গে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের ন্যায্য অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শেষ দিনে সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘একটা বৈষম্যহীন সমাজ আমরা চেয়েছিলাম, আশা করেছিলাম যে সংসদ থেকে বৈষম্য দূর করার উদ্যোগটা নেওয়া হবে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বলতে হচ্ছে, আবারও বলতে হচ্ছে, আগেও বলেছি—আমরা বৈষম্যের শিকার।’

তিনি বলেন, ফান্ড বরাদ্দের ক্ষেত্রেও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যরা বরাদ্দ পেলেও বিরোধী দলের নারী সদস্যরা তা পাননি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘দেশটা সকলের। ট্রেজারিতে টাকা দেয় সবাই। ১৮ কোটি মানুষের অবদান এখানে আছে। কোনও ব্যক্তির এলাকাকে পছন্দ-অপছন্দের ভিত্তিতে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার কোনও সুযোগ নেই।’

বিরোধী দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এলাকায় সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী সদস্যদের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়েও আপত্তি জানান তিনি। তবে দলীয় সমন্বয় ও জনগণের স্বার্থে সরকারি ও বিরোধী দলের নারী সংসদ সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়ের সুযোগ রাখার পক্ষে মত দেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা আমাদের নারী সদস্যদেরকে সম্মানিত করার পক্ষে, তারাও কাজ করবেন—এটা আমরা চাই। প্রপোরশনেটলি তারা এখানে এসেছেন, তারা কাজ করবেন।’

সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদে বসার জন্য জায়গা করে দেওয়ার বিষয়েও নিজের ভিন্নমতের কথা জানান বিরোধী দলীয় নেতা। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারের কোনও স্থাপনায় সংসদ সদস্যদের বসানো উচিত নয়। বরং তাদের জন্য পৃথক ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

এরপর রাষ্ট্র পরিচালনায় মেধা ও যোগ্যতার গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিভিন্ন জায়গায় যেখানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকার কথা, সেখানে দলীয় প্রশাসক বসানো হয়েছে। সরকারি বিভিন্ন করপোরেশন ও সংস্থাতেও দলীয় প্রভাবের অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

চাকরির নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বর পরিবর্তনের নতুন সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, তরুণ সমাজ এর প্রতিবাদ করেছে এবং তারাও এর প্রতিবাদ করেন।

তিনি বলেন, ‘যা চলে আসছে সেটাই বহাল রাখি। মেরিটকে সবাই মিলে সম্মান করি। মেরিটোরিয়াসরা এসে আমাদের আগামী সমাজটা বিল্ড আপ করে দেব। এটা আমরা চাই। এই ক্ষেত্রে আমরা কোনও দলীয় আনুকূল্য আমরা দেখতে চাই না।’

দুর্নীতি নির্মূলের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, ‘সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মূল না করলে এই সমাজ মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারবে না।’

ব্যাংকিং খাত ও শেয়ারবাজারের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনীতির দুটি মূল স্তম্ভই বিপর্যস্ত। এসব প্রতিষ্ঠানকে সব ধরনের দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে উপযুক্ত ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে।

শিক্ষা খাত নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখল, নকল প্রশ্ন সরবরাহ, গেস্টরুম-গণরুম ও শিক্ষাঙ্গনে অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধের আহ্বান জানান তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। এই শিক্ষাটাকে ধ্বংস করা হয়েছে দুইভাবে। একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে চর দখলের মতো দখল, আরেকটা শিক্ষার মানকে ধ্বংস করে অবাধ নকল, প্রশ্ন সাপ্লাই ইত্যাদির মাধ্যমে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখল হবে না, গেস্টরুম-গণরুম ফিরে আসবে না, অস্ত্রের ঝনঝনানি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে হবে না। আমাদের সন্তানদেরকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভিতরে কলমের বদলে অস্ত্র হাতে নিতে হবে না।’

শিল্প খাতের সংকট তুলে ধরে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে উৎপাদন ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘প্রোডাকশন যদি ক্রমহারে এইভাবে নিচের দিকে নামতেই থাকে, শিল্প মালিকরা নিজে বাঁচবেন কিভাবে, ইন্ডাস্ট্রি বাঁচাবেন কিভাবে, ব্যাংকের লোন পরিশোধ করবেন কিভাবে, এতগুলা শ্রমিক যাদেরকে একমোডেট করেছেন তাদেরকে রাখবেন কিভাবে—সব ক্ষেত্রেই তো মারাত্মক বিপর্যয় দেখাবে।’

শিল্প খাত রক্ষায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে অন্য খাত থেকে কাটছাঁট করে হলেও শিল্পকে রক্ষা করতে হবে। কারণ শিল্প ধ্বংস হলে এর সঙ্গে কোটি কোটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এ ছাড়া মাদক ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ নয়, নির্মূল করার জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান ডা. শফিকুর রহমান। রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায় মেধা, দক্ষতা, সততা ও কমিটমেন্টের ভিত্তিতে যোগ্য ব্যক্তিদের মূল্যায়নেরও দাবি জানান তিনি।

স্বাস্থ্য খাতের প্রসঙ্গ তুলে তিনি নিজের নির্বাচনী এলাকা ঢাকা-১৫ আসনে অবস্থিত সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনি এলাকার সরকারি হোমিওপ্যাথিক কলেজের জনবল সংকটের কথা তুলে ধরেন।

তিনি জানান, সরকারি ইউনানী ও আয়ুর্বেদিক কলেজে রাজস্ব বাজেটের চতুর্থ থেকে নবম গ্রেড পর্যন্ত ৫০টি পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন। অর্থাৎ ৩৮টি পদ শূন্য। ১১ থেকে ১৬তম গ্রেডে ৫৫টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২২ জন; শূন্য রয়েছে ৩৩টি পদ।

বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। তাই জনবল সংকট দূর করে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম আরও কার্যকর করার আহ্বান জানান তিনি।

সমাজ থেকে দুর্নীতি নির্মূল না করলে এই সমাজ মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, “দুর্নীতির মাত্রা আগের চেয়ে বেড়েছে বলে মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিজেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই লাগাম টেনে ধরতে না পারলে আমরা যত পরিকল্পনাই করি না কেন, কোনোটিই সফলতার মুখ দেখবে না সব দুর্নীতিবাজদের পেটে চলে যাবে।”

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, “আমাদের অর্থনীতি ভঙ্গুর। ব্যাংকিং সেক্টর ও স্টক মার্কেট—অর্থনীতির এই দুটি মূল পিলারে বিপর্যয় নেমে এসেছে। এসব জায়গা দলীয় প্রভাবমুক্ত করে উপযুক্ত ও সৎ লোকদের দ্বারা পরিচালনা করা দরকার।”

তিনি মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “চাকরিতে কোটা নয়, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ চাই। কোটা আন্দোলনের মাধ্যমে সমাজ ইতোমধ্যেই এর প্রতিবাদ করেছে। আমরাও এর প্রতিবাদ করি। মেধার মূল্যায়ন হোক, কোনো দলীয় আনুকূল্য যেন না থাকে।”

এমএসআই/এসএম