সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভাইভার নম্বর বাড়িয়ে দলীয় আনুকূল্যের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সবশেষ ওয়ারিং ম্যাটার শুরু হয়েছিল মেধার স্বীকৃতির দাবিতে। রিসেন্টলি আবার সেই মেধাকে কবর দেওয়ার জন্য নতুন একটা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভাইবার মার্ক বাড়িয়ে এখানে দলীয় আনুকূল্যের রাস্তাকে প্রশস্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ছাত্র-যুব সমাজের পক্ষ থেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। এটাই আরেকটা বড় আন্দোলনের জন্ম দেবে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে সংসদের অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, যেই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে আজকের এই সরকার, এই সংসদ, আবার একই ধরনের কার্যকারণ ঘটাই, আরেকটা আন্দোলন হোক, এটা আমরা চাই না। কিন্তু যদি এখান থেকে সরকার সংশোধন করে ফিরে না আসে, তাহলে কিন্তু এটা অনিবার্য হয়ে উঠবে। এটা কেউ ঠেকাতে পারবে না।
বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের ব্যাপারে সরকারের চরম অনীহা রয়েছে। এই গণরায়কে পাশ কাটিয়ে তাদের পছন্দমতো সংবিধান সংশোধন করা হচ্ছে। জনগণকে দেওয়া রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ভোটের জন্য ছিল, এখন তা কার্যকর নয়—এমন বক্তব্য জনগণকে সুস্পষ্টভাবে ধোঁকা দেওয়ার শামিল।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচনের ফল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মেনে না নেওয়ার কারণেই ১৯৭১ সালের যুদ্ধ অনিবার্য হয়েছিল। এখনো গণভোটের রায় উপেক্ষা করা দেশ, জাতি ও কোনো দলের জন্য কল্যাণকর হবে না। এটি কালো ইতিহাস হয়ে থাকবে। আমরা যতদিন সংসদে আছি, এই দাবি করে যাব। শেষ পর্যন্ত জনগণের জনরায় বাস্তবায়িত হবে। তবে ততক্ষণে দেশের অনেক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, আমরা প্রথাগত বিরোধী দল হতে চাই না। সরকার ভালো কিছু করলে সমর্থন পাবে, মন্দ করলে প্রতিবাদ করব এবং ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিরোধ গড়ে তুলব। এটাই আমাদের পলিসি।
র্যাব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, র্যাব জাতির ওপর চরম জুলুম করেছে। র্যাব বিলুপ্ত করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) গঠন করা হলেও র্যাবের স্থাপনা, লজিস্টিক ও ম্যানপাওয়ার সেখানে স্থানান্তর করা হলে এটি শুধু ‘বোতল পরিবর্তন’ হবে, পরিবর্তন আর কিছু নয়।
মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিরোধ কমিশন নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার অভিযোগ, নতুন আইনে কমিশনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব আইন জনগণের জন্য নয়, সরকারকে প্রটেকশন দেওয়ার জন্য করা হচ্ছে।
বিরোধী দলের আসনে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া এবং তহবিল বরাদ্দে বৈষম্যেরও সমালোচনা করেন তিনি। বলেন, সরকারি দলের সদস্যরা আগে ও বেশি বরাদ্দ পাচ্ছেন, অথচ বিরোধী দলকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। জনগণের উন্নয়নের সঙ্গে ভোটের কোনো সম্পর্ক নেই। সর্বক্ষেত্রে এখান থেকে বৈষম্য তৈরি করা হচ্ছে। অলরেডি আমার সহকর্মী বলেছেন যে, বিরোধী দলের আসনগুলোতে সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমাদের ওপরে সুপারভিশন করার জন্য।
লং মার্চ প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এটি কোনো একক দাবিতে করা হয়নি। গণভোট, প্রশাসনের দলীয়করণ বন্ধ, বৈষম্য দূর, মানুষের বাঁচার দাবি, শিল্প, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাবিসহ ছয়টি দাবি ছিল। আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর রংপুরের দিকে দ্বিতীয় লং মার্চ অনুষ্ঠিত হবে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারও পূর্ণ স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এখন উল্টো পথে চলছে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগে ভাইবার নম্বর বাড়িয়ে দলীয় আনুকূল্যের পথ প্রশস্ত করা হচ্ছে। এটি সংশোধন না হলে নতুন আন্দোলন অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।
তিনি বলেন, আমাদের কোনো দাবি কোনো দলের পক্ষে বা বিপক্ষে নয়। প্রত্যেকটি দাবি জনগণের অধিকারের পক্ষে। এ ব্যাপারে কারও সঙ্গে কমপ্রমাইজ করা যাবে না। আমরা একটি মানবিক, বৈষম্যমুক্ত ও ন্যায়-ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে চাই।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কোরআন এবং সুন্নাহর পলিসির সাথে ক্লিয়ার কন্ট্রাডিক্টরি একটা আইন করা হয়েছে। প্রপার্টি ট্রান্সপারেক্ট। আমরা কোরআনের আয়াত, হাদিসের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছি যে, এইভাবে এটা বৈষম্য, সরাসরি কন্ট্রাডিকশন, বিপরীত। এরপরে বলেছি, আমাদের কথাগুলো আমলে নিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন হচ্ছে সরকারি সংস্থা। তাদেরকে বিষয়টা ডেলিগেট করে। তারা এই ব্যাপারে অভিজ্ঞ স্কলার যারা আছেন, যারা কোরআন-হাদিসের উপরে পাণ্ডিত্য রাখেন, তাদের সাথে বসবেন, কথা বলবেন। তারপরে তাদের কাছ থেকে একটা রিকমেন্ডেশন আসুক। আসার পরে আপনারা আইনটা তৈরি করেন।
‘এরকম দুঃসাহস ইংরেজরাও করেনি। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান এটেম নিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশ আমলে দুই-একবার এটেম নিয়েছে, কেউ সফল হয়নি। এই সরকার দায়িত্ব নেওয়ার আগে বলেছে তারা যে কোরআন-সুন্নাহর বিরুদ্ধে কোন আইন পাশ করবে না। কিন্তু করলেনটা কি? এর কোন জবাব নেই।’
তিনি বলেন, সর্বক্ষেত্রে এখান থেকে বৈষম্য তৈরি করা হচ্ছে। অলরেডি আমার সহকর্মী বলেছেন যে, বিরোধী দলের আসনগুলোতে সরকারি দলের সংরক্ষিত নারী আসনের সদস্যদেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমাদের উপরে সুপারভিশন করার জন্য। তারা ডিও লেটারও ইস্যু করতে পারবেন সেই এলাকার জন্য।
যাদের জনগণ সরাসরি ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছে, তারা প্রত্যেকটা নাগরিকের কাছে দায়বদ্ধ। তাদের দায়বদ্ধতার জায়গায় বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। বহু জায়গায় ইতোমধ্যে অপ্রীতিকর অনেক ঘটনা ঘটেছে।
এ সময় বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
এমএসআই/এমএন
