বিজ্ঞাপন

৫০ সংসদীয় কমিটি গঠন : ক্ষুব্ধ বিরোধী দল, নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

৫০ সংসদীয় কমিটি গঠন : ক্ষুব্ধ বিরোধী দল, নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন

বিরোধী দলের তীব্র দাবি সত্ত্বেও তাদের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাত্র একটি কমিটিতে সভাপতি পদ দিয়েই ১৩তম জাতীয় সংসদের ৫০টি কমিটি গঠন সম্পন্ন করেছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে ২৬ শতাংশ সভাপতির পদ দাবি করা হলেও তা নাকচ করে দিয়েছে সরকারি দল। সংসদীয় এসব পর্যবেক্ষণ কমিটিতে মন্ত্রী ও হুইপকে সভাপতি করার বিষয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের প্রকাশ করা উদ্বেগ এবং আপত্তিও শেষ পর্যন্ত তোয়াক্কা করা হয়নি।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সংসদের শেষ দিনে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি নতুন চারটি স্থায়ী কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এর মধ্য দিয়েই ৫০টি কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়। চলতি সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে সংসদীয় কমিটিগুলোতে বিরোধীদের প্রতিনিধিত্ব ও চেয়ারম্যান পদ দেওয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে অন্তত তিনবার উত্তপ্ত বিতর্ক হয়।

সরকারি দল বিরোধী দলকে স্থায়ী কমিটির সভাপতিত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি আগাম শর্ত নির্ধারণ করে দেয়। তাদের বক্তব্য ছিল, বিরোধী সংসদ সদস্যদের প্রথমে সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে যোগ দিতে রাজি হতে হবে। তবে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা এই শর্ত প্রত্যাখান করে নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকেন। তারা সংবিধান সংশোধন কমিটির সঙ্গে এই বিষয়টি যুক্ত না করে আনুপাতিক হারে সভাপতি পদের দাবি অব্যাহত রাখেন। 

বিরোধী সংসদ সদস্যরা জানান, তারা কেবল জুলাই সনদের আলোকেই সংবিধান সংস্কারে সমর্থন দেবেন। তাছাড়া সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া নিয়েও তাদের মৌলিক মতবিরোধ রয়েছে।

বিদ্যমান নিয়মে বিরোধী দলকে সংসদীয় কমিটির সভাপতি পদ দেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে জুলাই সনদে প্রস্তাব করা হয়েছিল যে, পাবলিক অ্যাকাউন্টস, প্রিভিলেজেস, এস্টিমেটস এবং পাবলিক আন্ডারটেকিংস সম্পর্কিত কমিটিগুলোর সভাপতিত্ব করবেন বিরোধী দলের সদস্যরা। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি পদ সংসদে বিরোধী দলের আসন সংখ্যার অনুপাতে বণ্টন করারও প্রস্তাব ছিল তাতে।

গত ৩০ আগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে বলেন, কনসেনসাস কমিশনের আলোচনা অনুযায়ী বিরোধী সংসদ সদস্যরা আসন সংখ্যার অনুপাতে মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিগুলোর সভাপতি পাবেন। তবে তার জন্য জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। তিনি জানান, চিফ হুইপ অফার করেছেন বিরোধীরা যেন বিশেষ কমিটিতে যোগ দিয়ে প্রক্রিয়া শুরু করে এবং একই সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন শুরু করা যায়। কিন্তু বিরোধী দল সে প্রস্তাব গ্রহণ করেনি।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী, সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের মধ্যেই সব স্থায়ী কমিটি গঠন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। মোট ৫০টি কমিটির মধ্যে ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত। এর মধ্যে বিরোধী দলের এক উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরকে পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সভাপতি করা হলেও মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কোনো কমিটির প্রধান করা হয়নি কোনো বিরোধী সংসদ সদস্যকে।

এর আগে ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে প্রধান করে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটি গঠন করে সংসদ। সেখানে বিরোধীদের ৫টি সদস্যপদ রাখা হলেও তারা এই কমিটি সরাসরি বয়কট করে। গতকাল তৃতীয় অধিবেশনের শেষ দিনে প্রতিরক্ষা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, জনপ্রশাসন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিষয়ক কমিটি গঠিত হয়। পরে সবগুলো কমিটিই কণ্ঠভোটে পাস হয়।

কমিটি গঠনের পর ক্ষোভ প্রকাশ করে বিরোধী সদস্যরা অভিযোগ করেন, তাদের দেওয়া তালিকার তোয়াক্কা না করে তালিকা বিকৃত করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে মাত্র দুজন এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে চারজন করে বিরোধী সদস্য রাখা হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। বিরোধী চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম পরবর্তী অধিবেশনে এই ভুল সংশোধনের দাবি জানান।

জবাবে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ৩৯টি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটিতে ২৬ শতাংশ প্রতিনিধিত্ব বজায় রেখে ১৯টি কমিটিতে ৩ জন এবং বাকিগুলোতে ২ জন করে বিরোধী সদস্য রাখা হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতের হুইপ রফিকুল ইসলাম খান হতাশা প্রকাশ করে জানান, কার্যকর সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য সরকারি ও বিরোধী দল উভয়কে নিয়েই শক্তিশালী কমিটি গঠন করা উচিত ছিল।

এদিকে সংসদীয় কমিটিতে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও হুইপকে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে স্পিকার আগের দিন মঙ্গলবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি জানান, রীতিনীতি অনুযায়ী বেসরকারি সংসদ সদস্যরাই এসব কমিটির প্রধান হবেন এবং মন্ত্রীরা কেবল সদস্য থাকবেন। তবে সেই উদ্বেগের তোয়াক্কা না করেই চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনিকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান কমিটির, হুইপ আশরাফ উদ্দিনকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহমেদ অপুকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি করা হয়।

স্পিকার আবারও তার অসন্তোষ প্রকাশ করে মনে করিয়ে দেন, সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল কথা হলো আইনসভার কাছে নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহিতা। নির্বাহী বিভাগের সদস্য নিজেই যদি কমিটির প্রধান হন, তবে তিনি কার কাছে জবাবদিহি করবেন—সেই প্রশ্ন তোলেন তিনি। 

উল্লেখ্য, মন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত ৫ জন সরকারি হুইপকে চারটি কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহির উদ্দিন স্বপন, হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল, হুইপ রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, হুইপ আক্তারুজ্জামান মিয়া এবং হুইপ জিকে গউছকেও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলমকে স্বরাষ্ট্র ও অর্থ সংক্রান্ত কমিটির সদস্য করা হয়েছে।

এসআর/এমএন

বিজ্ঞাপন