বিজ্ঞাপন

নিরাপত্তাকর্মীর ছদ্মবেশে কোটি টাকার স্বর্ণ চুরি

ফ্রান্সে বসে সোনা চুরির ‘মাস্টারপ্ল্যান’ দুলাভাইয়ের, বাস্তবায়নে শ্যালক!

ফ্রান্সে বসে সোনা চুরির ‘মাস্টারপ্ল্যান’ দুলাভাইয়ের, বাস্তবায়নে শ্যালক!

জাল কাগজপত্র ও ভুয়া পরিচয়পত্র ব্যবহার করে সোনার মার্কেটে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি নেয় একটি সংঘবদ্ধ চোরচক্র। দিনে নিরাপত্তাকর্মীর দায়িত্ব পালনের ছদ্মবেশে দীর্ঘদিন ধরে তারা মার্কেটের সিসিটিভি ক্যামেরার অবস্থান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কোন দোকানে কী পরিমাণ স্বর্ণ রয়েছে—সব তথ্য সংগ্রহ করে। এরপর সময় ও সুযোগ বুঝে রাতের বেলা তালা কেটে চুরি করে স্বর্ণালংকার। 

রাজধানীর মিরপুর মাজার রোডে হযরত শাহআলী শপিং কমপ্লেক্সে দুটি স্বর্ণের দোকানে চুরির ঘটনায় এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ। 

এ ঘটনায় করা মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২৫ জুলাই দিবাগত রাতে শাহআলী মার্কেটের দুটি সোনার দোকান থেকে (এ হোসেন জুয়েলার্স ও আল রাজ্জাক জুয়েলার্স) প্রায় ২৬০ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা চুরি হয়। চুরি হওয়া স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সূত্রে জানা গেছে, অভিনব এই চুরির মূলে রয়েছে একটি আন্তর্জাতিক চক্র। চক্রটির মূল মাস্টারপ্ল্যান ও অর্থায়নকারী সৈয়দ নাসির নামে এক ব্যক্তি, যিনি ‘ফ্রান্স নাসির’ নামে পরিচিত। তিনি ফ্রান্সে বসে সোনা চুরির প্রস্তুতির জন্য যাবতীয় অর্থ ও পরামর্শ দেন। অন্যদিকে দেশে চুরির জন্য সুনির্দিষ্ট টার্গেট নির্ধারণ এবং লোক সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেন তার প্রাক্তন শ্যালক শামীম খান। নাসিরের সঙ্গে শামীমের বোনের বিচ্ছেদ হয়েছে, কিন্তু তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়ে গেছে। 

দেড় মাসের পরিকল্পনা ও রেকি

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, শাহ আলী মার্কেটকে লক্ষ্য বানানোর পর চক্রটি প্রায় দেড় মাস ধরে চুরির ছক ও রেকি করে। তাদের মূল কৌশল ছিল নিরাপত্তাকর্মীর ছদ্মবেশে ভেতরে ঢুকে নিরাপত্তা ব্যবস্থার নানা দুর্বলতা খুঁজে বের করা। এই সময়ের মধ্যে তারা মার্কেটের রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সিসিটিভি ক্যামেরার অবস্থান, কোন দোকানে ভল্ট বা র‍্যাকে কী পরিমাণ স্বর্ণ রাখা হয়, এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করে।

ছবি- সৈয়দ নাসির ও শামীম খান

কাউসার মাস্টারের ভুয়া কাগজপত্র ও আইনি সহায়তা

চক্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য কাউসার ওরফে কাউসার মাস্টার। তার প্রধান কাজ ছিল ভুয়া পরিচয়পত্র ও জাল কাগজপত্র তৈরি করা, যা দিয়ে ছদ্মবেশী নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি নেওয়া হতো। চক্রের ভেতরে যারা মূল সংগঠকদের চিনত না, তারা কাউসারকে ‘মেয়র’ নামে ডাকত। জাল নথি তৈরির পাশাপাশি চক্রের কোনো সদস্য গ্রেপ্তার হলে আইনজীবী নিয়োগসহ আনুষঙ্গিক আইনি বিষয় দেখভালও করতেন কাউসার মাস্টার।

ভুয়া এনআইডি দিয়ে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি

চক্রটির প্রথম ধাপ ছিল ভুয়া নাম, নকল জাতীয় পরিচয়পত্র, ভুয়া জন্ম নিবন্ধন ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে একজন সদস্যকে মার্কেটে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে ঢুকিয়ে দেওয়া। এরপর তার মাধ্যমে একে একে পাঁচ থেকে ছয়জন সদস্যকে একই মার্কেটে নিয়োগ দেওয়া হতো। পরিচয়পত্রের ছবিগুলো আসল হলেও পরিচয় সংক্রান্ত বাকি সব তথ্যই ছিল ভুয়া। 

শাহআলী মার্কেটে চুরির ঘটনার পরপর কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী উধাও হয়ে যায়। পরে তাদের জমা দেওয়া কাগজপত্র যাচাই করে সব তথ্য ভুয়া হিসেবে শনাক্ত করে পুলিশ।

ফ্রান্সে নাসির, দেশে শামীম; শালা-দুলাভাইয়ের মাস্টারপ্ল্যান

ডিবি জানিয়েছে, চক্রটির অন্যতম সংগঠক শামীম খান। কোন মার্কেটকে লক্ষ্য বানাতে হবে, প্রাথমিক রেকি চালানো, চুরির বিস্তারিত ছক এবং প্রয়োজনীয় লোক সংগ্রহের কাজ তিনিই করতেন। আর এই পরিকল্পনার পেছনে থেকে কাজ করা এবং পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সব আর্থিক জোগান দিতেন ফ্রান্সে থাকা তার প্রাক্তন দুলাভাই সৈয়দ নাসির ওরফে ফ্রান্স নাসির। চক্রের সদস্যদের বাসা ভাড়া, দৈনিক চলার খরচ থেকে শুরু করে চুরির সরঞ্জাম কেনার যাবতীয় ব্যয় বহন করতেন নাসির।

ডিবি সূত্রে জানা গেছে, চোরচক্রটির তালা ও সিন্দুক কাটার মূল দায়িত্বে ছিল রাজা মিয়া নামে এক সদস্য। চুরির অভিযান সহজ করতে দিনের বেলাতেই কাটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম মার্কেটের বাথরুম বা অন্য কোনো গোপন জায়গায় লুকিয়ে রাখা হতো। রাতে ভেতরের ছদ্মবেশী নিরাপত্তাকর্মীরা পুরো পরিবেশ আয়ত্তে আনলে রাজা মিয়াসহ বাইরের অন্য সদস্যরা ভেতরে ঢুকে তালা কাটার কাজ শুরু করত।

শুরুতে চক্রটির চোখ ছিল মার্কেটের সবচেয়ে বড় স্বর্ণের দোকানে। তবে সেই দোকানের মালিক প্রতিদিন রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত সিসিটিভি ফুটেজ পর্যবেক্ষণ করতেন। মালিকের এমন কড়া নজরদারির কারণে চুরির ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় চক্রটি বাধ্য হয়ে সেই দোকান বাদ দিয়ে অন্য দোকানগুলো টার্গেট করে।

ঘটনার রাতে চক্রটি মোট চারটি দোকানে চুরির চেষ্টা চালিয়েছিল। এর মধ্যে এ হোসেন জুয়েলার্স ও আল রাজ্জাক জুয়েলার্স-এর তালা কেটে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ লুট করতে সক্ষম হয় তারা। বাকি দুটি দোকানে চুরি করতে ব্যর্থ হয় তারা। চক্রটি নিউ প্রিন্স জুয়েলার্স-এর একাধিক তালা ভাঙলেও শেষ তালাটি আর কাটতে পারেনি। 

দোকানটির মালিক বেলায়েত হোসেন জানান, তার দোকানে রাখা সব স্বর্ণ ডিসপ্লেতে ছিল। ভল্ট না থাকলেও অল্পের জন্য চুরি থেকে রক্ষা পেয়েছেন তিনি। ঘটনার পর দ্রুত ভল্ট কিনে এখন অধিকাংশ স্বর্ণ সেখানে রাখা হচ্ছে।

বিপরীত পাশের নুপুর জুয়েলার্স-এর তালা কাটার চেষ্টা করেও পারেনি চক্রটি। দোকানটির মালিক শামীম পারভেজ বলেন, আল্লাহ আমার দোকানকে রক্ষা করেছেন। আমার ঠিক বিপরীত পাশের এ হোসেন জুয়েলার্স থেকে ২০০ ভরি স্বর্ণ নিয়ে গেছে। আমার তালাগুলো আনা হয়েছিল দেশের বাইরে থেকে। তারা তালা এবং শিকল কাটার অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনোভাবেই কাটতে পারেনি। 

সিকিউরিটি গার্ডকে মিষ্টি খাইয়ে অজ্ঞান করা হয়

চুরির পরিকল্পনা বাস্তবায়নে চক্রটি ওই ফ্লোরের দায়িত্বে থাকা তোফাজ্জল হোসেন নামের এক সিকিউরিটি গার্ডকে কৌশলে মিষ্টির সঙ্গে চেতনানাশক খাইয়ে অজ্ঞান করে দেয়। 

গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, চুরি করলে তাড়াতাড়ি জামিন পাওয়া যায়, আর ডাকাতি করলে জামিন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এছাড়া যেসব দোকানের সামনে নিরাপত্তা ঢিলেঢালা থাকে এবং কষ্ট কম হয়, পরিকল্পনা করে সেসব দোকানে চুরি করে তারা

সিসিটিভি ফুটেজেও ঘটনার সত্যতা মেলে। সেখানে দেখা যায়, টুলের ওপর বসে থাকা তোফাজ্জলকে চোরচক্রের সদস্যরা কিছু একটা খাওয়াচ্ছেন, এর কিছুক্ষণ পরেই তিনি সেখানে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান।

গার্ড তোফাজ্জল হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রতিদিনের মতো আমি রাতে ওই স্বর্ণের দোকানে ডিউটি করতে আসি। এরপর সিকিউরিটি গার্ড সুপারভাইজার রাব্বি আমাকে জানায়, বাসুদার ৬ বছর পর ভাতিজা হয়েছে, সবাইকে মিষ্টি খাওয়াবে। রাত তখন আনুমানিক দুইটা। সামিনা জুয়েলার্স এবং আমিনা জুয়েলার্সের মাঝামাঝি জায়গায় আমি বসা ছিলাম। তারা মিষ্টি নিয়ে এলো এবং আমরা সবাই মিলে খেলাম। রাতে ডিউটি করি বিধায় চা বানানোর জন্য আমার আলাদা কেটলি রয়েছে। পরে আমি চা বানিয়ে নিজে খেলাম এবং সবাইকে খাওয়ালাম। কেটলি ধুয়ে আনার পর আর কিছু মনে নেই। সকালে যখন পুলিশসহ সবাই আসে, তখন চেতনা ফিরে পাওয়ার পর আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমি বলি, আমাকে মিষ্টি খাওয়ানোর পর আর কিছু মনে ছিল না।

এক দোকান থেকেই ২০০ ভরি স্বর্ণ চুরির দাবি

দারুস সালাম থানায় করা এজাহার সূত্রে জানা যায়, ‘এ হোসেন জুয়েলার্স’ থেকেই আনুমানিক ২০০ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ৩ লাখ টাকা চুরি হয়েছে। খোয়া যাওয়া অলংকারের মধ্যে রয়েছে ১০৮টি চেইন, ১৭৪টি আংটি, ৪৭ জোড়া ইয়ারিং, ৯৭ জোড়া কানের দুল, ৫০ জোড়া টপস, ২১টি ব্রেসলেট, ১৯টি লকেট, ১০ জোড়া বালা, ৮টি নেকলেস ও ২৬০টি নাকফুল। 

এজাহারে দোকানটির মালিক মো. আবুল হোসেন দাবি করেছেন, মালামাল কেনার ভাউচারসহ চুরি হওয়া এসব স্বর্ণের আনুমানিক মূল্য ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, পাশের ‘আল রাজ্জাক জুয়েলার্স’-এর তালা কেটে আনুমানিক ৬০ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা লুট করা হয়। খোয়া যাওয়া স্বর্ণের মধ্যে রয়েছে ১৯টি হার, ১২টি ব্রেসলেট, ২৮টি লকেট, ২টি টিকলি, ৯ জোড়া বালা, ৪০টি আংটি, ১৩৫টি নাকফুল ও ৬৫টি দুল, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। 

দুই দোকান মিলিয়ে সর্বমোট প্রায় ২৬০ ভরি স্বর্ণ (যার বাজারমূল্য ৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা) ও নগদ ৬ লাখ ১৫ হাজার টাকা চুরি হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ডিবির তদন্তে চুরি যাওয়া স্বর্ণের পরিমাণ নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী চুরি যাওয়া স্বর্ণের পরিমাণ ৫০ থেকে ৬০ ভরি হতে পারে। তবে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করতে তদন্ত করছে ডিবি।

রমজানে আসে সতর্কবার্তা

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, গত রমজান মাসে হীরা নামে এক সিকিউরিটি গার্ড একটি অজানা নম্বর থেকে ফোন করে মার্কেটের স্বর্ণের দোকানগুলোতে চুরির পরিকল্পনা হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করেছিলেন। মার্কেটে নিরাপত্তাকর্মীর ছদ্মবেশে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি স্বর্ণের দোকানে চুরির পরিকল্পনা করছে বলে তিনি জানিয়েছিলেন। 

পরে ব্যবসায়ীরা বিষয়টি মার্কেট কমিটিকে জানালেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর থেকে সিকিউরিটি গার্ড হীরা রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান, তাকে খুঁজে বের করতেও কমিটি কোনো আগ্রহ দেখায়নি।

ব্যবসায়ীরা জানান, ২০২৫ সালে মার্কেটের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হয় ‘অ্যাভান্ট-গার্ড অ্যালায়েন্স লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে। অভিযোগ রয়েছে, দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামীম পারভেজ কমিটির অন্য সদস্যদের মতামত উপেক্ষা করে তার বন্ধুর মালিকানাধীন এই এজেন্সির সঙ্গে চুক্তিটি করেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সভাপতি শামীম পারভেজের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কল কেটে দেন। হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তারও কোনো জবাব দেননি। 

সমিতির সাধারণ সম্পাদক আহমাদুল হাসানের বক্তব্য জানতে অফিসে গেলে তিনি কথা বলেননি। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি সরে যান। পরে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘সবকিছু সভাপতি করেছেন। আমাদের হাতে কিছু নেই।’

‘অ্যাভান্ট-গার্ড অ্যালায়েন্স লিমিটেড’ নামে সিকিউরিটি কোম্পানিতে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তাদের কারো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দোকানে পড়ে আছে খালি গহনার ট্রে

ঘটনার পর এ হোসেন জুয়েলার্সে গিয়ে দেখা যায়, দোকানজুড়ে লুটের চিহ্ন। আশপাশের দোকানগুলোতে যেখানে বিভিন্ন গহনা সাজানো রয়েছে, সেখানে আবুল হোসেনের দোকানে পড়ে আছে খালি গহনার ট্রে।

ব্যবসায়ী আবুল হোসেন বলেন, নিরাপত্তাকর্মীদের চলাফেরা অনেক সময় সন্দেহজনক মনে হতো। ঘটনার পর দেখা যায়, তাদের পরিচয়পত্র ও কাগজপত্র ভুয়া। নিরাপত্তার দায়িত্ব তদারকির জন্য থাকা সুপারভাইজার রিয়াজ মৃধার মাধ্যমেই একে একে অন্যরা মার্কেটে নিরাপত্তাকর্মীর চাকরি নেয়। পরে তারা দিনের পরিবর্তে রাতের শিফটে দায়িত্ব নেওয়া শুরু করে।

আবুল হোসেন জানান, তার দোকান থেকে চুরি যাওয়া স্বর্ণের মধ্যে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন এবং ক্রেতাদের স্বর্ণও ছিল। এমনকি একজন নারী ক্রেতা বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার আগে বাসায় নিরাপদ মনে না করায় ঘটনার আগের দিন তার স্বর্ণ দোকানে রেখে গিয়েছিলেন।

আবুল হোসেন বলেন, দোকানের ভল্টে কোনো স্বর্ণ ছিল না। প্রায় সব গহনা র‌্যাকে সাজানো ছিল। চোরেরা দোকানে ঢুকে প্রায় সব স্বর্ণই নিয়ে গেছে।

পাশের আল রাজ্জাক জুয়েলার্সের ম্যানেজার মৃদুল হাসান জানান, তাদের দোকান থেকেও প্রায় ৬০ ভরি স্বর্ণ চুরি হয়েছে। এর মধ্যে তার নিজের পরিবারের প্রায় ১০ ভরি স্বর্ণও ছিল। তবে কিছু স্বর্ণ ভল্টে থাকায় সেগুলো রক্ষা পেয়েছে।

চুরির পরও সতর্ক ছিল চক্রটি

ডিবি সূত্র জানায়, চুরির পর চক্রের সদস্যরা সবাই একসঙ্গে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যায়নি। আগে থেকে ভাড়া করা নিরাপদ একটি বাসায় অবস্থান করে তারা। দয়াগঞ্জ-মিরহাজীরবাগ এলাকায় এমন একটি কক্ষ ভাড়া নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে চুরি করা মালামাল ভাগাভাগি করার পরিকল্পনা ছিল।

চুরিতে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন পরে শামীম সংগ্রহ করে ভেঙে ফেলেন বলে তথ্য পেয়েছে ডিবি। সদস্যদের তিন থেকে চার মাস মোবাইল ব্যবহার না করতে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত গণমাধ্যমের খবর পর্যবেক্ষণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

আরও কয়েকটি ঘটনায় চক্রটির সম্পৃক্ততা

ডিবির তদন্তে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার আরও কয়েকটি চুরির ঘটনায় চক্রটির সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।

কচুক্ষেতের একটি স্বর্ণের মার্কেট, হাতিরঝিল, রামপুরার মোল্লা টাওয়ার, দক্ষিণখান, ডেমরা ও মালিবাগের ঘটনায় একই ধরনের কৌশল ব্যবহারের তথ্য তদন্তে এসেছে।

ডিবি জানায়, রাজধানীতে নিরাপত্তাকর্মীর ছদ্মবেশে একই কায়দায় কাজ করা আরও দুই থেকে তিনটি চক্র রয়েছে।

গ্রেপ্তার ১১ জন, উদ্ধার প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণ

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চক্রের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ৬ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি। এর মধ্যে দুই মাস আগে দেশে আসা সৈয়দ নাসির (ফ্রান্স নাসির) ও তার প্রাক্তন শ্যালক শামীম খানকে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তায় গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া চুরির ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে ডিবি পুলিশের হাতে আরও তিনজন এবং থানা পুলিশের হাতে আরও দুজন গ্রেপ্তার হয়। ডিবি ও থানা পুলিশের হাতে মোট ১১ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

চুরির ঘটনায় সরাসরি ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করা পাঁচজন সিকিউরিটি গার্ডের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। বাসু সাহা নামে এক নিরাপত্তাকর্মী এখনো পলাতক আছে। গ্রেপ্তার আসামিদের মধ্যে ইউসুফের আসল নাম নাছির উদ্দিন, শহিদুলের আসল নাম আবুল কালাম মৃধা, রাব্বির আসল নাম সাদেক এবং বাবুলের আসল নাম সোহরাব সিকদার। গ্রেপ্তার অন্য সন্দেহভাজন আসামিরা হলেন—রাজু মৃধা, সিকিউরিটি ইনচার্জ রিয়াজ মৃধা, মো. জাকির হোসেন, মো. সালাম মাতব্বর ও ওমর ফারুক।

জাল কাগজপত্র তৈরি করা কাউসার মাস্টার ওরফে মেয়র এবং তালা ও সিন্দুক কাটার সদস্য রাজা মিয়া এখনো গ্রেপ্তার হননি।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানান, এখন পর্যন্ত প্রায় ২০ ভরি স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া কিছু সামগ্রী অবশ্য নকল বা ইমিটেশন বলে জানা গেছে।

ডিবি পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিরা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, চুরি করলে তাড়াতাড়ি জামিন পাওয়া যায়, আর ডাকাতি করলে জামিন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে। এছাড়া যেসব দোকানের সামনে নিরাপত্তা ঢিলেঢালা থাকে এবং কষ্ট কম হয়, পরিকল্পনা করে সেসব দোকানে চুরি করে তারা।

ডিবি মিরপুর জোনাল টিমের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. সাজিদুর রহমান বলেন, শাহআলী মার্কেটের ঘটনায় আমরা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে কাজ শুরু করি। প্রথম দিকে আমাদের অনেক বেগ পেতে হয়েছে। এই চুরির সঙ্গে যারা জড়িত, সিসিটিভি ফুটেজে যাদের দেখা গেছে, তাদের তথ্য সংগ্রহ করে দেখা যায় ছবির বাইরে প্রদত্ত নাম-পরিচয়সহ কোনো তথ্যই সঠিক নয়। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তারা একটি সিকিউরিটি সংস্থায় পরিচয় গোপন করে চাকরি নেয়। 

তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এক এক করে চক্রের সঙ্গে জড়িত ছয়জনকে আমরা গ্রেপ্তার করি। এই ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে সন্দেহভাজন আরও তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করে আরও দুইজনকে। গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসতে থাকে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।

ডিবির এই কর্মকর্তা জানান, তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রথমে পাঁচজন সিকিউরিটি গার্ডের মধ্যে চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাদের কাছ থেকে বেরিয়ে আসে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। একটি চক্র পরিকল্পনা করে ভুয়া তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সিকিউরিটি কোম্পানিতে তাদের নিয়োগের ব্যবস্থা করে। এই চক্রের অন্যতম হোতা সৈয়দ নাসির ওরফে ফ্রান্স নাসির। নাসির দীর্ঘদিন ফ্রান্সে আছেন এবং সেখানে বসেই সে এই চুরি চক্রে অর্থায়ন করেন।

ডিবির এই এডিসি আরও জানান, আমরা তাদের কাছ থেকে এখন পর্যন্ত ২০ ভরির মতো স্বর্ণ ও প্রায় আধা কেজির মতো ইমিটেশন উদ্ধার করেছি। এখন পর্যন্ত যারা গ্রেপ্তার হয়নি, তাদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

গোয়েন্দা মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ রাকিব খাঁন জানান, ঘটনার বিষয়ে জানার পরপরই ছায়া তদন্ত শুরু করা হয়। ঘটনাস্থলে একটি চৌকস টিম পাঠানো হয়। কাজের শুরুতে সিসিটিভি ফুটেজ ও তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়। পাশাপাশি সিকিউরিটি কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল, কারণ তাদের দেওয়া সব তথ্যই জাল ছিল। পরবর্তীতে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসতে থাকে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

তিনি আরও জানান, যে সিকিউরিটি কোম্পানি থেকে লোক সরবরাহ করা হয়েছিল, তাদেরও তদন্তের আওতায় আনা হবে। কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়া কীভাবে তারা এসব চক্রকে নিয়োগ দিল এবং তাদের কোনো গাফিলতি ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হবে। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, সিকিউরিটি কোম্পানির মালিক মৌলভীবাজারের একটি আসনের সংসদ সদস্য।

এসএএ/এমএসএ