বিমান চলাচল এখন আর বিলাসবহুল ভ্রমণ নয়, বরং সময় ও প্রয়োজনের তাগিদে এটি মানুষের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন টোটাল এয়ার সার্ভিসেস লিমিটেডের চেয়ারম্যান কেএম মুজিবুল হক। তিনি বলেছেন, সড়ক ও রেল পরিবহনের মতো বিমান পরিবহনকেও দেশের যোগাযোগব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, স্বল্প সময়ে, সাশ্রয়ী মূল্যে, সহজ ও নিরাপদ উপায়ে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছানোর প্রয়োজন থেকেই এভিয়েশন খাতের গুরুত্ব তৈরি হয়েছে। তাই এ খাতকে বিলাসিতা হিসেবে না দেখে সড়ক ও রেল পরিবহনের সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে হবে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কুর্মিটোলায় ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে বর্ণিক বার্তা আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন।
মুজিবুল হক বলেন, আগামী ১৫ বছরে দেশের এভিয়েশন খাত কোথায় যেতে চায়, সে বিষয়ে সিভিল এভিয়েশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একটি রোডম্যাপ থাকা প্রয়োজন। এজন্য একটি স্ট্র্যাটেজিক কমিটি বা স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করে নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করতে হবে। বর্তমানে বছরে প্রায় ১২ মিলিয়ন যাত্রী পরিবহন হলেও ভবিষ্যতে তা ৬০ মিলিয়নে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা যেতে পারে। একইভাবে এভিয়েশন খাতের বর্তমান প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের বাজারকে ১৫ বিলিয়ন ডলারে নেওয়ার লক্ষ্যও নির্ধারণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, অ্যাভিয়েশন বিজনেস ম্যানেজমেন্টের হিসাবে বাংলাদেশের এভিয়েশন মার্কেট প্রায় ৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের। এর মধ্যে বাংলাদেশের অংশ প্রায় ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। বাজারের প্রায় ২২ শতাংশ বাংলাদেশের এবং ৭৭ শতাংশ বিদেশি এয়ারলাইনসের নিয়ন্ত্রণে। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় ১ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে যাচ্ছে। বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো নিজ নিজ গন্তব্য ও হাব ব্যবহার করে এই বাজারের বড় অংশ নিয়ে যাচ্ছে।
মুজিবুল হক বলেন, অর্থ দিয়ে অনেক কিছু কেনা যায়, কিন্তু ভৌগোলিক অবস্থান কেনা যায় না। বাংলাদেশ পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝামাঝি অবস্থানে রয়েছে। ঢাকার দুই, চার, আট ও ১১ ঘণ্টার বিমানপথের মধ্যে বিপুলসংখ্যক গন্তব্য রয়েছে। এ অঞ্চলের যাত্রীদের বাংলাদেশে এনে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়ার মাধ্যমে ঢাকাকে একটি এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।
তিনি বলেন, বাংলাদেশকে ঘিরে প্রায় ৮৩ মিলিয়ন যাত্রীর চলাচল রয়েছে। জিসিসি অঞ্চল থেকে প্রায় ৪৪ মিলিয়ন যাত্রী আসিয়ান অঞ্চলে যাতায়াত করেন। বাংলাদেশ এ দুই অঞ্চলের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকায় তাদের মধ্যে একটি সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে। যাত্রীদের বাংলাদেশে এনে কয়েক ঘণ্টা বা এক রাত অবস্থান করিয়ে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন গন্তব্যে পাঠানো সম্ভব। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের এভিয়েশন খাতে ট্রানজিট যাত্রীর সংখ্যা খুবই কম, ৫ শতাংশেরও নিচে। প্রায় ৯৫ শতাংশ যাত্রী পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভ্রমণ করেন। নতুন টার্মিনালে প্রায় ৫ মিলিয়ন ট্রানজিট যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা থাকবে। তাই এই সক্ষমতা কীভাবে কাজে লাগানো হবে, এখন থেকেই সে বিষয়ে পরিকল্পনা করতে হবে।
তিনি বলেন, একটি হাব গড়ে তুলতে স্থানীয় এয়ারলাইনসের শক্তিশালী উপস্থিতি প্রয়োজন। বিদেশি এয়ারলাইনস তৃতীয় ও চতুর্থ ফ্রিকোয়েন্সি দিয়ে যে ধরনের নেটওয়ার্ক তৈরি করতে পারে, স্থানীয় এয়ারলাইনস ছাড়া তা সম্ভব নয়। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য এটি একটি ইতিবাচক দিক। স্থানীয় ক্যারিয়ারকে শক্তিশালী করে বিদেশি ক্যারিয়ারগুলোর সঙ্গে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের এয়ার সার্ভিস অ্যাগ্রিমেন্টের অধীনে ৮৩০টি রাইটস রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর মধ্যে বর্তমানে ৩২৯টি ব্যবহার করা হচ্ছে। আরও প্রায় ৫০০টি রাইটস বা স্লট ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ বাংলাদেশের উড়োজাহাজ পরিচালনার সুযোগ থাকলেও উড়োজাহাজ ও অন্যান্য সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো হচ্ছে না। স্লট অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ। বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো একটি স্লটের জন্য দীর্ঘদিন ধরে আবেদন করছে। অথচ বাংলাদেশের হাতে থাকা স্লট ব্যবহার করা হচ্ছে না। এই সম্পদ যথাযথভাবে ব্যবহার করতে না পারলে ধীরে ধীরে এভিয়েশন খাতে বাংলাদেশ দুর্বল হয়ে পড়বে।
সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন বণিক বার্তার সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদ। এতে বক্তব্য রাখেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, বাংলাদেশ বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান (বেবিচক) এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক, ইউ এস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন।
সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) মাহমুদ হোসেন।
এ আয়োজনে এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ, কূটনীতিক, উদ্যোক্তা ও দেশী-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার অন্যান্য অংশীজনরাও অংশগ্রহণ করেন।
সম্মেলনে গোল্ড স্পন্সর হিসেবে ছিল ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।
এমএইচএন/আরএফ
