চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা দিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) জেনারেল হাসপাতালে চালু করা হয়েছে ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা সেল। এখানে পুরুষ, নারী ও শিশুদের জন্য মোট ১৫টি শয্যা রাখা হয়েছে। প্রয়োজন হলে শয্যা সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) চসিক জেনারেল হাসপাতালে এ সেলের উদ্বোধন করেন মেয়র। উদ্বোধন শেষে তিনি চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং ডেঙ্গু রোগীদের সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন। পরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক লিফলেট বিতরণ করেন।
উদ্বোধনকালে মেয়র বলেন, একটি মৃত্যুও আমাদের জন্য কাম্য নয়। ডেঙ্গু মোকাবিলায় চসিক প্রতিরোধমূলক ও চিকিৎসামূলক—দুই ধরনের কার্যক্রম একসঙ্গে পরিচালনা করছে।
মেয়র জানান, চলতি বছরের ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম মহানগর, জেলার উপজেলা ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ২ হাজার ৮৮৩ জন। এর মধ্যে মহানগরে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন। এ পর্যন্ত মহানগরে চারজন, উপজেলা পর্যায়ে সাতজন এবং অন্যান্য জেলায় একজনসহ মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ সাধারণত বেশি থাকে। তাই এ দুই মাসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে চসিকের মশক নিধন, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, ক্রাশ প্রোগ্রাম ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করা হয়েছে।
ডেঙ্গুর লার্ভা ধ্বংসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্বীকৃত বিটিআই ব্যবহার করা হচ্ছে জানিয়ে মেয়র বলেন, পূর্ণবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণেও নিয়মিত কার্যক্রম চলছে।
চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্তের পরিসংখ্যান তুলে ধরে মেয়র বলেন, ২০২২ সালে মহানগর ও জেলা মিলিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ৫৪৫ জন। ২০২৩ সালে এ সংখ্যা বেড়ে ১৪ হাজার ৮৭ জনে দাঁড়ায়। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে ৪ হাজার ৩২৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৪ হাজার ৮৬৪ জন হয়। চলতি বছর এখন পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৮৮৩ জন।
মৃত্যুর হিসাবে ২০২২ সালে ডেঙ্গুতে ৪১ জন, ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ১০৭ জন, ২০২৪ সালে ৪৫ জন এবং ২০২৫ সালে ২৭ জন মারা যান। চলতি বছর এ পর্যন্ত ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে চলতি সেপ্টেম্বর মাসে মহানগরে ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর ঘটনা বেড়েছে উল্লেখ করে পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান মেয়র।
ডেঙ্গু চিকিৎসাব্যবস্থা উন্নত করতে বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শনের কথা জানিয়ে মেয়র বলেন, গতকাল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড পরিদর্শন করেছেন। রোগীদের চিকিৎসা ও সেবার মান আরও উন্নত করতে চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রোগীদের প্রতি আরও আন্তরিক ও যত্নশীল হওয়ার জন্যও চিকিৎসকদের অনুরোধ করা হয়েছে।
চসিক জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু শনাক্তকরণে এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা বিনামূল্যে করা হচ্ছে। মেয়র জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ৮২ জনের ডেঙ্গু পরীক্ষা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ জনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে। চলতি সেপ্টেম্বর মাসে ২৮ জনের পরীক্ষা করে সাতজনের ডেঙ্গু শনাক্ত হয়েছে।
নগরবাসীর সহযোগিতা চেয়ে মেয়র বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ শুধু সিটি করপোরেশনের একার দায়িত্ব নয়। নগরবাসীর সহযোগিতা ছাড়া এ রোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র, কনটেইনার ও নির্মাণসামগ্রীসহ যেসব স্থানে পানি জমতে পারে, সেগুলো দ্রুত সরিয়ে ফেলতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বাড়ির ছাদ, বারান্দা ও ফুলের টব নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। একইসঙ্গে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের পানি জমার স্থানও পরিষ্কার রাখতে হবে। কোথাও যাতে তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকে সবাইকে নজর দিতে হবে।
ডেঙ্গু আক্রান্তদের পর্যাপ্ত তরল গ্রহণের পরামর্শ দিয়ে মেয়র বলেন, জ্বর দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। পর্যাপ্ত পানি, ডাবের পানি, খাবার স্যালাইনসহ তরলজাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হবে। শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিলে রোগীর অবস্থা দ্রুত জটিল হতে পারে।
মেয়র বলেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সময়। অতীতের পরিসংখ্যানও সেটিই বলছে। তাই এ সময়ে সবাইকে আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে। সিটি করপোরেশন তার দায়িত্ব পালন করছে, এখন নগরবাসীকেও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. ইমাম হোসেন রানা, স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হোসনে আরা বেগম, তপন কুমার চক্রবর্তী এবং আন্দরকিল্লার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ একরাম হোসেনসহ সংশ্লিষ্টরা।
এমআর/জেডএস
