নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা, সামাজিক অস্থিরতা, মব সহিংসতা, সাম্প্রদায়িকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রতিরোধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নারী ও কন্যা নির্যাতন এবং সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির উদ্যোগে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় বক্তারা এ আহ্বান জানান।
সভায় সভাপতিত্ব করেন নারী ও কন্যা নির্যাতন এবং সামাজিক অনাচার প্রতিরোধ জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। সভায় বক্তারা দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপসংস্কৃতির প্রসার ও মূল্যবোধের অবক্ষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এসব অনাচারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করে দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
সভায় মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু বলেন, বর্তমানে দিকভ্রান্ত সমাজে আমরা বসবাস করছি। এই পরিস্থিতির উত্তরণ জরুরি। এ বিষয়ে সকলকে কাজ করতে হবে।
লিখিত বক্তব্যে মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও জাতীয় কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রের বৈষম্যহীনতা ও সমতার মূলনীতির বিপরীতে বক্তব্য, ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, সংঘবদ্ধ সহিংসতা এবং উগ্র সাম্প্রদায়িকতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
তিনি বলেন, নারী ও শিশুর প্রতি বর্বর নির্যাতনের ভয়াবহতা, ধরন ও মাত্রার পাশাপাশি সামাজিক অনাচারের ব্যাপ্তিও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের বরাত দিয়ে তিনি জানান, পারিবারিক ও সামাজিক অস্থিরতার কারণে গত ছয় মাসে ১৯টি পরিবারে ৫০টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পেছনে পারিবারিক বিরোধ, সম্পত্তি নিয়ে দ্বন্দ্ব, মাদকাসক্তি, চুরি ও আর্থিক সংকটের মতো কারণ উঠে এসেছে।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, বর্তমান অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। এ কাজে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি সব অংশীজনকে নিয়ে কর্মসূচি গ্রহণের আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সাবেক বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথ বলেন, নারী পরিবারে অর্ধেক বা কিছুই নয়- এমন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীদের পুরুষের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে হয় উল্লেখ করে তিনি সামাজিক অনাচারের বিরুদ্ধে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক ড. রওনক জাহান বলেন, চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে তরুণদের আরও বেশি সম্পৃক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নারী আন্দোলনকে আরও জোরালো করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি ও গবেষক মফিদুল হক বলেন, নারী ও কন্যাশিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে লবিং করার পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের নারী কমিশনের প্রতিবেদনের ইতিবাচক দিকগুলো সামনে আনার আহ্বান জানান তিনি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়ার সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেন মফিদুল হক।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট এস এম এ সবুর নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান। এ লক্ষ্যে সামাজিক, যুব ও শিশু সংগঠনগুলোকে নিয়ে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
চর্চা ডটকমের সম্পাদক ও সিনিয়র সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, বর্তমানে সমাজে ভয়াবহভাবে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। বাল্যবিবাহ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। নারী ও কন্যার প্রতি অনাচার প্রতিরোধে তরুণদের সম্পৃক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশুর ওপর নির্যাতন বেড়েছে। বিশেষ করে ছেলেশিশুদের ওপর যৌন নির্যাতনের বিষয়টি উদ্বেগজনক। নির্যাতনের ক্ষেত্রে ধর্ম ও দরিদ্র শ্রেণিকে টার্গেট করা এবং ভিকটিম ব্লেমিংয়ের প্রবণতা বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সাম্প্রদায়িক হামলা প্রতিরোধে ঘটনার সঠিক মনিটরিং এবং ঘটনাস্থল পরিদর্শনের ওপর গুরুত্ব দেন ড. এম এম আকাশ।
বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি ও সিনিয়র সাংবাদিক বাসুদেব ধর বলেন, বিভিন্ন অনাচারের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। সাম্প্রদায়িক হামলার বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি ও মব সহিংসতা প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন জোরদারের আহ্বান জানান তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা বলেন, সামাজিক অনাচার নিরসনে নারী-পুরুষ বিভাজন না করে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে আরও প্রতিবাদী হতে হবে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়, তরুণ ও ডিজিটাল স্বেচ্ছাসেবক তৈরি এবং হয়রানির বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
সভায় আরআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. মেঘনা গুহ ঠাকুরতা, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ডিন ড. আরসাদ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. চন্দ্রনাথ পোদ্দার, গ্রীনভয়েস বহ্নিশিখার সমন্বয়ক আলমগীর কবিরসহ মহিলা পরিষদের নেত্রী ও কর্মকর্তাসহ জাতীয় কমিটির সদস্য এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রায় ১০০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
জেইউ/জেআই
