চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় সাত মাস আগে নিখোঁজ হওয়া ১২ বছর বয়সী শিশু মোহাম্মদ রায়হান এক পা হারানো অবস্থায় ফিরে এসেছে। সম্প্রতি উপজেলার চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকা থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, নিখোঁজের পর রায়হানকে একটি সংঘবদ্ধ চক্র ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করেছে। তার ডান পা কেটে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে কীভাবে এবং কারা তার শারীরিক ক্ষতি করেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটির রহস্য উদঘাটন এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের (বিএইচআরএফ) চট্টগ্রাম জেলা শাখা তিন সদস্যের একটি বিশেষ তথ্যানুসন্ধান দল গঠন করেছে।
বিএইচআরএফ চট্টগ্রাম জেলা শাখার সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট এএইচএম জসিমউদ্দীনকে প্রধান করে গঠিত দলের অন্য দুই সদস্য হলেন বিএইচআরএফ সাতকানিয়া শাখার সভাপতি ও সাংবাদিক শহীদুল ইসলাম বাবর এবং লোহাগাড়া উপজেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক আনিসুল ইসলাম। বিএইচআরএফের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান বিষয়টি সার্বিকভাবে তদারকি করবেন।
তথ্যানুসন্ধান দলের সদস্যরা জানান, রায়হান কীভাবে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয়েছিল, নিখোঁজের পর কোথায় ছিল, কীভাবে কক্সবাজারে এবং পরে ঢাকায় যায়, সেখানে তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি তার শারীরিক ক্ষতি কীভাবে হয়েছে, কোথায় তার চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার হয়েছে এবং এর সঙ্গে কোনো ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত কি না, সে বিষয়েও তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করা হবে।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রায়হান লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের সাতগড় নোয়াপাড়া এলাকার নাজিম উদ্দীনের ছেলে। প্রায় সাত মাস আগে চুল কাটার জন্য বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর সে নিখোঁজ হয়। এরপর পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্নভাবে তার সন্ধান করা হলেও দীর্ঘ সময় তার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
পরে চুনতি সীরাত মাহফিল এলাকায় রায়হানের সন্ধান পাওয়া যায়। সেখানে তাকে ভিক্ষা করতে দেখা যায় বলে পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। উদ্ধারের পর দেখা যায়, তার ডান পা নেই। শরীরের বিভিন্ন স্থানেও গুরুতর ক্ষত ও অস্ত্রোপচারের চিহ্ন রয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
রায়হানের পরিবারের বরাতে জানা গেছে, নিখোঁজ হওয়ার পর তাকে কক্সবাজারে নেওয়া হয়েছিল। পরে তাকে ঢাকায় নেওয়া হয় এবং সেখানে একটি চক্র তাকে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এবং রায়হানের পা কীভাবে কাটা হয়েছে, তা এখনো তদন্ত করে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
বিএইচআরএফের তথ্যানুসন্ধান দলের প্রধান অ্যাডভোকেট এএইচএম জসিমউদ্দীন বলেন, শিশুটির নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু করে ফিরে আসা পর্যন্ত পুরো ঘটনাটি ধারাবাহিকভাবে অনুসন্ধান করা হবে। এ ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, স্থানীয় বাসিন্দা, প্রত্যক্ষদর্শীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। একই সঙ্গে রায়হানের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি ও অন্যান্য প্রমাণও যাচাই করা হবে।
বিএইচআরএফ বলছে, একজন শিশুকে অপহরণ বা নিখোঁজ করার পর শারীরিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে ভিক্ষাবৃত্তিতে ব্যবহার করা হয়ে থাকলে তা গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং ফৌজদারি অপরাধ। তাই ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
তথ্যানুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ও প্রমাণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের কাছে তুলে দেওয়ার কথা জানিয়েছে সংগঠনটি। পাশাপাশি রায়হানের চিকিৎসা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় মানবিক ও আইনগত সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানিয়েছে তারা।
তথ্যানুসন্ধান দলের সদস্যদের ভাষ্য, রায়হানের সঙ্গে আসলে কী ঘটেছিল এবং তার শারীরিক ক্ষতির জন্য কারা দায়ী, তা প্রমাণের ভিত্তিতে বের করাই তাদের মূল লক্ষ্য। একই সঙ্গে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে বিএইচআরএফ।
এমআর/আরএফ
