বাবা ডাক শোনার অপেক্ষায় ছিলেন রাজধানীর বংশালের বাসিন্দা মোহাম্মদ ইউসুফ। স্ত্রী সানজিদা ইসলাম ছিলেন সাড়ে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। অনাগত সন্তানকে নিয়ে তাদের দুজনের ছিল নানা স্বপ্ন। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল নিমিষেই। ডেঙ্গু কেড়ে নিল ইউসুফের সব স্বপ্ন। স্ত্রী ও অনাগত সন্তান দুজনকেই হারালেন তিনি। ডেঙ্গু আক্রান্ত সানজিদার গর্ভেই মৃত্যু হয় অনাগত সন্তানের; আর পরে আইসিইউতে মৃত্যু হয় সানজিদার।
গতকাল ১৪ সেপ্টেম্বর ও তার আগের দিন এ দুই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। মাত্র ১৫ ঘণ্টার ব্যবধানে স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছেন সানজিদার স্বামী ইউসুফ।
স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি বিয়ে করেন ইউসুফ ও সানজিদা। গর্ভধারণের পর থেকে সানজিদার নিয়মিত চিকিৎসা চলছিল আদ্-দীন হাসপাতালে। গত ২ সেপ্টেম্বর নিয়মিত চেকআপে গিয়ে আলট্রাসনোগ্রাম করানো হয়। তখন গর্ভের শিশুর হৃদ্স্পন্দন স্বাভাবিক ছিল। তবে সানজিদার শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা বেশি পাওয়া যায়। এরপর তার অনেক বেশি জ্বর আসে এবং বমি হয়।
৫ সেপ্টেম্বর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ইউসুফের ভাষ্য, সেদিনও আলট্রাসনোগ্রামে গর্ভের শিশুর হৃদ্স্পন্দন পাওয়া যায়। কিছু পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়, যার মধ্যে ডেঙ্গু পরীক্ষাও ছিল। পরীক্ষায় ডেঙ্গু ধরা পড়ে। তবে হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে তারা বাসায় চলে যান।
এর পরদিন রাতে সানজিদার বমির সঙ্গে রক্ত আসে। দাঁত ব্রাশ করার সময়ও রক্তপাত হয়। ফলে আবার তাকে আদ্ দ্বীন হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেদিনই জানা যায়, তাদের অনাগত সন্তান আর বেঁচে নেই, মায়ের গর্ভে মারা গেছে।
এদিকে সানজিদার আইসিইউ সাপোর্ট দরকার, যা তখন আদ্ দীন হাসপাতালে ছিল না। ফলে তাকে কাছের হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ইউসুফ বলেন, তার স্ত্রীর প্লাটিলেট দ্রুত কমতে থাকে। একপর্যায়ে তা ৫ হাজারে নেমে আসে। কয়েক দিনে প্রায় ৩০ ব্যাগ রক্ত ম্যানেজ করা হয়। তারপরও অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে স্বজনদের পরামর্শে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানে আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। প্লাটিলেট খুব কম থাকায় অস্ত্রোপচার করে গর্ভে থাকা মৃত সন্তানকে বের করা যাচ্ছে না না বলে জানান চিকিৎসকরা।
এমন অবস্থাতেই গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় স্বাভাবিক প্রসবের মাধ্যমে বের হয়ে আসে গর্ভের মৃত সন্তান। আর গতকাল ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মারা যান সানজিদা।
স্ত্রী ও অনাগত সন্তানকে হারিয়ে শোকে প্রাগল প্রায় হয়ে পড়েছেন ইউসুফ। ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, আমার স্বপ্ন ছিল সন্তান ছেলে হোক কিংবা মেয়ে হোক, তাকে আল্লাহর পথে রেখে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলব।
গতকাল ১৪ সেপ্টেম্বর ছিল ইউসুফের নিজের জন্মদিনও। জন্মদিনে স্ত্রীকে হারানোর বেদনার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন তিনি। সেখানে তিনি লিখেছেন, ‘অনেক অপেক্ষা আর ধৈর্যের পর আল্লাহ আমাকে বাবা হওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু বাবা হওয়ার আনন্দটা আমি পেলাম না। আল্লাহ যদি আমার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে আমাকে পরীক্ষা করতে চান, এ জন্য তার দরবারে আমি শুকরিয়া জানাচ্ছি।’
এমএল/ এমএন
