পাবজি : অনলাইন গেইমের রীতিনীতি ও অর্থনীতি

Dr. B M Mainul Hossain

০৭ মে ২০২২, ১০:৩৭ এএম


পাবজি : অনলাইন গেইমের রীতিনীতি ও অর্থনীতি

ছবি : সংগৃহীত

সাম্প্রতিককালের আলোচ্য বিষয়গুলোর একটি হলো অনলাইন গেইম। সেটি বন্ধ হবে, না কি চালু থাকবে? আদৌ কি বন্ধ করা সম্ভব হবে? অনলাইন গেইমের যে বিলিয়ন ডলারের বাজার সেখানেইবা সম্ভাব্য কী প্রভাব পড়বে? 

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছুদিন আগেও একটি মন্ত্রণালয় থেকে পাবজি, ফ্রি ফায়ারের মতো অনলাইন গেইমগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছিল। শিশু-কিশোরদের অতি মাত্রায় এই সমস্ত অনলাইন গেইমে আসক্ত হয়ে যাওয়া, সমাজের উপর এই গেইমগুলোর খারাপ প্রভাবই আশঙ্কার কারণ।

বিশেষ করে, করোনার সময়ে শিশু-কিশোরদের গৃহবন্দি থাকা এবং অনলাইনে সম্পৃক্ততা বেড়ে যাওয়ায়, অনলাইন গেইম অনেকের ক্ষেত্রে আসক্তির পর্যায়ে চলে গেছে। ডিভাইসের মেমোরি অপেক্ষাকৃত কম থাকলেও খেলা যায় বলে, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়ে গেছে এই গেইমগুলো। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, সারা বিশ্বে প্রায় ১২০ কোটি প্লেয়ার পাবজি খেলার সাথে সম্পৃক্ত, যদিও একই প্লেয়ার একাধিক নামে বা মাধ্যমে খেলতে পারে।

এই গেইমগুলোর কয়েকটি দিক নিয়ে কথা বলা যাক। তবে, তার আগে বলে নিই, ব্যক্তিগতভাবে এই সমস্ত অনলাইন গেইম খেলার অভিজ্ঞতার অভাব থাকায়, গেইমের খুঁটিনাটি দিক এই লেখার আওতার বাইরে থাকবে। তবে, এটুকু স্পষ্ট যে, বেশকিছু জনপ্রিয় অনলাইন গেইম আক্রমণাত্মক এবং ধ্বংসাত্মক ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ার কারণে শিশু-কিশোর, বিশেষ করে, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের ওপর এগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব থাকতে পারে বলে মনে করা হয়।

অনেকগুলো গেইমে জয়-পরাজয় নির্ভরই করে প্রতিপক্ষের কয়জনকে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র প্রয়োগ করে মারা হলো সেটির উপর। এই বয়সী শিশুদের জন্য অস্ত্র, হত্যা, আক্রমণ, প্রতিশোধ, এসব নিয়ে মেতে থাকাটা চিন্তার কারণ হওয়ারই কথা।

সারা বিশ্বে প্রায় ১২০ কোটি প্লেয়ার পাবজি খেলার সাথে সম্পৃক্ত, যদিও একই প্লেয়ার একাধিক নামে বা মাধ্যমে খেলতে পারে। বেশকিছু জনপ্রিয় অনলাইন গেইম আক্রমণাত্মক এবং ধ্বংসাত্মক ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়ার কারণে শিশু-কিশোর, বিশেষ করে, স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের ওপর এগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব থাকতে পারে বলে মনে করা হয়।

সমস্যা শুধু সেখানে সীমিত নয়। সমস্যা মূল আরও গভীরে প্রবেশ করেছে। এইসব গেইমের সাথে আবার যুক্ত হয়েছে অর্থের লেনদেন। বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে অনলাইন এই খেলাকে কেন্দ্র করে হয়ে থাকে টাকার লেনদেন।

একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দিয়ে খেলার জন্য রেজিস্ট্রেশন করা যাবে। খেলার সময় প্রতিপক্ষের প্রতিজনকে পরাস্ত (হত্যা) করতে পারলে মিলবে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা। শেষ পর্যন্ত খেলায় জিততে পারলে আরও বেশি টাকা। কিছু ক্ষেত্রে আগ্রহের আতিশয্যে, কিছু ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রলোভনে পা রেখে এই সমস্ত গেইমে সম্পৃক্ত হচ্ছে হাজার হাজার উঠতি বয়সী কিশোর-কিশোরী।

উল্লেখ্য, বিকাশ-রকেটের মতো সার্ভিস ব্যবহার করেই টাকা পরিশোধ করা যায় এবং দেশেই রয়েছে এই সমস্ত অ্যাপ বা গেইম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের এজেন্ট।

অতএব, সমস্যা যে শুধু নৈতিক বা সামাজিক তা নয়, সমস্যা অর্থনৈতিকও। এই প্রক্রিয়ায় দেশের টাকা বাইরে যাওয়ার, মানি লন্ডারিংয়ের সুযোগও রয়েছে। তার উপর রয়েছে, কারিগরি সমস্যা।

এই সমস্ত গেইম খেলার জন্য বয়সের একটা সীমা নির্ধারিত থাকলেও, কম বয়সী কেউ খেলতে গেলেও কারিগরিভাবে সেটি আটকানো প্রায় অসম্ভব। তার ওপর, এই সমস্ত গেইম শুধু ব্লক করে রেখেই আসক্তদের নিবৃত করাটাও কার্যত সম্ভব নয়। ভিপিএনের মতো সফটওয়্যার বা সার্ভিস দিয়ে ব্লক করা কনটেন্টও অনায়াসে দেখতে পাওয়া যায়।

আবার, সাথে সাথে এটিও সত্য যে, অনলাইন গেইম বলতে শুধু পাবজি, ফ্রি ফায়ার বোঝায় না। যেমন, ভিন্নধর্মী সোশ্যাল অ্যাপ বলতে শুধু টিকটক, লাইকি কিংবা বিগো লাইভকে বোঝায় না। বহু শিক্ষণীয়, চিত্তাকর্ষক এবং শিশু কিশোরদের উপযোগী অনলাইন গেইম, অ্যাপ রয়েছে। ঢালাওভাবে অনলাইন গেইম বললে পুরো গেইমিং ইন্ডাস্ট্রির ওপর সেটির নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

স্ট্যাটিস্টা (Statista)-র তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে এটি পরিণত হবে ২৬৮ বিলিয়ন ডলারের ইন্ডাস্ট্রিতে। বাংলাদেশও এই ইন্ডাস্ট্রির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বিশ্বমানের গেইম আমাদের দেশেই তৈরি হচ্ছে, সাথে সাথে আসছে বৈদেশিক মুদ্রাও। সাথে সাথে পাবজি, ফ্রি ফায়ারের মতো গেইমেরও যে ভালো দিক আছে, সেটি ফেলে দেওয়ার মতো নয়।

একটা গেইম বন্ধ হলে পাঁচটা গেইম চালু হয়ে যাবে। হয়তো জনপ্রিয় গেইমগুলো বন্ধ করে রাখা যাবে। কিন্তু, কেউ যদি অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় গেইমে গিয়েও টাকা খরচ করে খেলতে চায়, সেই উপায় কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। এভাবে একটা একটা করে সাইট বন্ধ করা বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান হবে না। বরং, সমস্যার মূলে গিয়ে আমরা খুঁজে দেখতে পারি, কেন এই জিনিসগুলো ঘটছে। 

এই গেইমগুলো যারা খেলে তাদের সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করতে পারার দক্ষতা, ইত্যাদি বৃদ্ধি পাওয়ার নজির পাওয়া গেছে। অধিকন্তু, বেশ কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ধ্বংসাত্মক ভিডিও/অনলাইন গেইম খেললেই যে বাস্তব জীবনেও কেউ ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে, তার স্বপক্ষে শক্ত প্রমাণ খুব একটা নেই।

তারপরও, ব্যবস্থা যদি নিতেই হয়, সেটার মাধ্যম হিসেবে এই গেইম, সেই গেইম বন্ধ করে দেওয়া হলে, সেটি আপাত সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদি, স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। ইন্টারনেট একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা। ডিজিটালাইজেশন অনেক সুবিধার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসে।

একটা গেইম বন্ধ হলে পাঁচটা গেইম চালু হয়ে যাবে। হয়তো জনপ্রিয় গেইমগুলো বন্ধ করে রাখা যাবে। কিন্তু, কেউ যদি অপেক্ষাকৃত কম জনপ্রিয় গেইমে গিয়েও টাকা খরচ করে খেলতে চায়, সেই উপায় কিন্তু থেকেই যাচ্ছে। এভাবে একটা একটা করে সাইট বন্ধ করা বাস্তবসম্মত কোনো সমাধান হবে না। বরং, সমস্যার মূলে গিয়ে আমরা খুঁজে দেখতে পারি, কেন এই জিনিসগুলো ঘটছে। 

আমরা কি আজকে এটা বন্ধ না করে দিয়ে, কালকে ওটা বন্ধ না করে দিয়ে, আমাদের শিশু কিশোরদের বুঝিয়ে বলতে চেষ্টা করেছি এর ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে? আমরা জোর করে তাদের না সরিয়ে, তারা যদি ক্ষতিকর দিকটা বুঝে সরে আসতো সেটিই কি বেশি কার্যকর হতো না?

আমরা কী অভিভাবকদের ডিজিটাল শিক্ষা এবং এর নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কে অবহিত করতে পেরেছি? আমরা কী শিশুদের জন্য অনলাইন ছেড়ে, মাঠে গিয়ে খেলার জন্য মাঠ দিতে পেরেছি? আমরা কি অনলাইন প্রতিযোগিতা বাদ দিয়ে পাড়ায়, মহল্লায়, গ্রামে, গঞ্জে, স্কুলে, কলেজে তাদের জন্য নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পেরেছি?

শিশু বাসা থেকে বের হয়ে যে মাঠে যাবে, সে মাঠটা, সে মাঠে যাওয়ার পথটা কি নিরাপদ করতে পেরেছি? আমরা কী দেশীয় সংস্কৃতির, দেশীয় মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনলাইন গেইম বাজারে আনতে পেরেছি? 

উপরের প্রশ্নগুলোর উত্তরই হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। আসক্তির অনলাইন আর অফলাইন নেই। যেকোনো আসক্তিই নেতিবাচক। তবে, অনলাইনের একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এখানে চব্বিশ ঘণ্টা সংযুক্ত থাকা যায়, রাতদিনের পার্থক্য নেই; চব্বিশ ঘণ্টাই খেলার সাথী পাওয়া যায়; চব্বিশ ঘণ্টাই অর্থ লেনদেন করা যায়। এখানে বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে, অনলাইনের এইসব দিককে আমরা কীভাবে ব্যবহার করব? ইতিবাচকভাবে নাকি নেতিবাচকভাবে? সেটিই নির্ধারণ করবে আমাদের ভবিষ্যতের পথচলা।

ড. বি এম মইনুল হোসেন ।। সহযোগী অধ্যাপক, তথ্য প্রযুক্তি ইন্সটিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
bmmainul@du.ac.bd

Link copied