চলতি মূলধন : নির্ধারণ পদ্ধতি কেন পরিবর্তন করা প্রয়োজন?

Dhaka Post Desk

শচীন্দ্র নাথ সমাদ্দার

১৬ মে ২০২২, ০৩:৪০ পিএম


চলতি মূলধন : নির্ধারণ পদ্ধতি কেন পরিবর্তন করা প্রয়োজন?

ছবি : সংগৃহীত

কোনো শিল্প প্রকল্পের (নতুন এবং বিএমআরই) জন্য কাঁচামাল ক্রয়, দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয়, পণ্য প্রক্রিয়াকরণ, বাজারজাতকরণ এবং অনুমোদিত রপ্তানিখাতে ব্যাংক যে মূলধন জোগান দেয় তাকে চলতি মূলধন বলে।

কোনো প্রতিষ্ঠান চলতি মূলধনের প্রয়োজনীয়তা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠান পরিচালন চক্রের ওপর। কোনো প্রকল্পের কাঁচামাল ক্রয়ের সময় থেকে তৈরিকৃত মালামাল বা পণ্য সামগ্রী বাজারজাত করে মজুদ পণ্য বিক্রয়োত্তর অর্থ আদায় পর্যন্ত সময়কে পরিচালন চক্র বলে।

ট্রেডিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিদ্যমান ব্যবসায়িক কার্যক্রম অব্যাহতভাবে পরিচালনা বা ট্রেডিং ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য যে পরিমাণ মূলধন প্রয়োজন হয় তা ব্যাংক ক্যাশ ক্রেডিট আকারে ঋণ দিয়ে থাকে। ক্যাশ ক্রেডিটের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পণ্য সামগ্রী ক্রয় বা সংগ্রহ করা থেকে তা সংরক্ষণ করাসহ বিক্রয় এবং বিক্রয়োত্তর অর্থ আদায় করা পর্যন্ত যে সময়ব্যাপী টাকা আটকে থাকে তাকে ট্রেডিং ব্যবসার পরিচালন চক্র বলে।

ব্যাংক কোনো প্রকল্পের চলতি মূলধন নিরূপণের সময় সারা বছরের প্রয়োজনীয় ইনভেনটরির চাহিদা একসাথে হিসাব করে না। প্রকল্পের ইনভেনটরি খাতের ভিন্নতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভিন্ন ভিন্ন নির্ধারিত সময়ের ইনভেনটরির চাহিদা নিরূপণ করা হয়ে থাকে, আর এ সময়কে টাইড-আপ পিরিয়ড বলা হয়।

প্রকল্পের বা শিল্পের বা ব্যবসার পরিচালন চক্র এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক উপাদানের উপর ঐ কর্মকাণ্ডের সাথে সম্পৃক্ত ইনভেনটরি খাতের উপর নির্ভর করে। প্রকল্পের বা ব্যবসার উৎপাদিত বা সংগৃহীত দ্রব্যাদি বাজারজাত করার পর যেহেতু আয় প্রবাহ সৃষ্টি হয় এবং তা পুনরায় মূলধন হিসেবে খাটানো যায় তাই টাইড-আপ পিরিয়ড হিসাব করার সময় ব্যাংক সম্পূর্ণ বছরের হিসাব করে না।

বিভিন্ন খাতে যেমন কাঁচামাল, উৎপাদন বা ব্যবসা প্রক্রিয়াকাল, খুচরা যন্ত্রাংশ, উৎপাদিত পণ্য মজুদ, বাকিতে বিক্রয় ইত্যাদি একটি প্রকল্পের বা ব্যবসার পরিচালন চক্র সম্পূর্ণ করতে কত দিনের সময় হিসাব রাখতে হবে তাই টাইড -আপ হিসেবে পরিগণিত হয়। এছাড়াও বিভিন্ন দেনাদারদের পাওনা মেটানো, কাঁচামাল সরবরাহকারীদের অগ্রিম দেওয়া, ভাড়া পরিশোধ বা বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ইত্যাদি বিল পরিশোধের জন্য চলতি মূলধনের প্রয়োজন হয়।

যে সকল বিষয় চলতি মূলধনের পরিমাণের প্রয়োজনীয়তার ওপর প্রভাব ফেলে তার মধ্যে শিল্প বা ব্যবসার ধরণ, অপারেটিং সাইকেলের পিরিয়ড, কাঁচামাল ক্রয় প্রক্রিয়া এবং উৎপাদিত পণ্যের বিপণন প্রক্রিয়া, শিল্পের সম্প্রসারণ, পণ্যের মূল্যের হ্রাস/বৃদ্ধির ধরন, কাঁচামালের ধরন, কাঁচামাল স্থানীয় বা আমদানিকৃত কি না, সরকারের ট্যাক্স পলিসি শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়া, ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ইত্যাদি।

আগেই বলেছি, ব্যাংক কোনো শিল্প প্রতিষ্ঠানে কি পরিমাণ চলতি মূলধন প্রয়োজন হবে তা উক্ত প্রতিষ্ঠানের টাইড-আপ পিরিয়ড বিবেচনায় নিয়ে করে থাকে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের ধরনের ওপর টাইড-আপ পিরিয়ড ভিন্নতর হয়ে থাকে।

উদাহরণ হিসেবে একটি টেক্সটাইল স্পিনিং ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে আমদানিকৃত কাঁচামালের টাইড-আপ পিরিয়ড ৯০ দিন, একটি টেক্সটাইল উইভিং ইন্ডাস্ট্রির কাঁচামালের ৩০ দিন, একটি টেক্সটাইল ফিনিশিং ইন্ডাস্ট্রির ৩০ দিন, একটি বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি উৎপাদন ইন্ডাস্ট্রির ৯০ দিন, একটি ওষুধ উৎপাদনকারী শিল্পের টাইড-আপ পিরিয়ড ৯০ থেকে ১২০ দিন ধরা হয়ে থাকে।

যে সকল শিল্পের কাঁচামাল প্রধানত আমদানি নির্ভর তাদের ক্ষেত্রে টাইড-আপ পিরিয়ড পরিবর্তন করে আরও বেশিদিন ধরে চলতি মূলধনের পরিমাণ নির্ণয় করার সময় এসেছে। কেননা, আন্তর্জাতিক বাজারে যেভাবে দ্রব্যের মূল্য ও পরিবহন এবং অন্যান্য ব্যয় দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান যদি তার সারা বছরের বা ন্যূনতম ছয় মাসের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল একসাথে ক্রয় করে মজুদ রাখতে পারে তাহলে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে বেশি লাভবান হতে পারে।

আবার যে সকল শিল্প দেশীয় কাঁচামালের উপর নির্ভরশীল তাদের ক্ষেত্রেও টাইড-আপ পিরিয়ড বর্ধিতকরণের প্রয়োজন রয়েছে। কেননা, আমরা সকলেই জানি কৃষক যখন তার পণ্য উৎপাদন করে অর্থাৎ উৎপাদন মৌসুমে যেকোনো পণ্যের মূল্য বছরের অন্যান্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক কম থাকে।

কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান তার প্রয়োজনীয় দেশীয় কাঁচামাল যদি উৎপাদন মৌসুমে কম দামে ক্রয় করে মজুদ রাখতে পারে তাহলে তার উৎপাদিত পণ্য সারাবছর বিক্রি করে বেশি মুনাফা অর্জন করতে পারবে। অর্জিত মুনাফা দিয়েই গ্রাহক তার ব্যাংক ঋণ পরিশোধ সহজ হবে। কথায় ক্রয়ে লাভ না হলে ব্যবসায় লাভ হয় না।

তাছাড়া, কাঁচামালের অভাবে যদি কোনো শিল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় তাহলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান রুগ্ন হয়ে পড়ার অধিক সম্ভাবনা রয়েছে ফলে ব্যাংক ঋণ ঝুঁকিতে সম্ভাবনা পড়ে যেতে পারে। ঘাটতি চলতি মূলধন যেমন প্রতিষ্ঠানকে রুগ্ন করতে পারে, তেমনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত চলতি মূলধন প্রতিষ্ঠানের জন্য বিপদ বয়ে আনতে পারে। এরকম উদাহরণ অনেক আছে যে, মূলধন স্বল্পতার কারণে প্রকল্প বন্ধ হয়েছে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত চলতি মূলধনের কারণে উদ্যোক্তা ফান্ড ডাইভার্ট করায় রুগ্ন হয়ে গেছে।

গ্রাহকরা হচ্ছেন ব্যাংকের প্রাণ। গ্রাহকদের বিপদে রেখে কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠান সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারবে না। গ্রাহক ভালো থাকলে প্রতিষ্ঠান ভালো থাকবে। তাই শিল্প বা ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় মূলধন নির্ধারণের সময় টাইড-আপ পিরিয়ড নতুন ভাবে নির্ধারণের সময় এসেছে। তবে চলতি মূলধন বা প্রজেক্ট ফাইনান্সের সময় ব্যাংকারদের সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে যাতে মূলধন ঘাটতি না হয় আবার অতিরিক্ত মূলধন সরবরাহ না হয়।

শচীন্দ্র নাথ সমাদ্দার ।। উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক লিমিটেড

Link copied