বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা, পরম্পরায় বাংলাদেশ

Selina Hossain

২৫ মার্চ ২০২১, ০৯:১০ পিএম


বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ হাসিনা, পরম্পরায় বাংলাদেশ

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্মগ্রহণকারী শিশুটির জন্মশতবর্ষ উদযাপন বাঙালির জীবনে দিগন্তবিস্তারী একদিন। এই শিশুর জন্ম না হলে বাংলাদেশের জন্ম হতো না এবং একই সঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশের সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপিত হতো না। বাঙালির সামনে মুক্তিযুদ্ধের সাহসী চেতনার বিস্তার হতো না। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠের উচ্চারণ বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতার যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করেছিল। মানুষ বীরদর্পে মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করেছিল সাহসী চেতনায়। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ত্রিশ লাখ শহীদের জীবন উৎসর্গকারী যুদ্ধ নিয়ে এসেছিল গৌরবময় বিজয় অর্জন।

এই বিজয় উদ্ভাসিত হয়েছে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ সঙ্গে করে। হাজার বছরের বাঙালির ইতিহাসে এ এক মাহেন্দ্রক্ষণ। স্বাধীনতার স্থপতি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে একশতম জন্মদিনে পৌঁছেছেন। দুটো বিশাল ঘটনা নিয়ে এই নান্দনিক উদযাপন বাঙালির গৌরব ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। দুটো ঘটনাই আগামীর বাংলাদেশে ঐতিহ্যের সম্পদ হয়ে চিরজাগরূক থাকবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়াবে অগ্নিশিখার আলো।

১৯৬৮-৬৯ সালের দিকে তরুণ সমাজের নেতৃত্বে কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষ স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করেছিল তখনকার পূর্ব পাকিস্তান— ‘শেখ মুজিব এসেছে, বাঙালি জেগেছে’। এই স্লোগানে জেগে উঠেছিল বাঙালি-বাংলাদেশ। বাঙালির চেতনায় ফুল ফুটিয়েছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই ফুলের সৌরভ ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে তিনি মাতৃভাষার মর্যাদার প্রশ্নে বাঙালিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। যে চেতনার অগ্নিশিখা তিনি প্রজ্বলিত করেছিলেন তা শহীদের রক্তধারায় স্বাধীনতার পূর্ণাঙ্গতা লাভ করেছে বিজয়ের অর্জনে।

ভারতবর্ষের রাজনীতিতে তিনিই একমাত্র নেতা যিনি ভারতবর্ষের মানচিত্রে একটি স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই ব্যতিক্রমধর্মী অর্জন আর কারও দ্বারা হয়নি। তার জন্মশতবর্ষের গৌরবে সিক্ত হয়েছি আমরা দেশবাসী। স্মরণের বালুকাবেলায় তিনি আমাদের সামনে এক অবিস্মরণীয় মানুষ।

টুঙ্গিপাড়ার অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বেড়ে ওঠা শিশু মুজিবের দীপ্তস্রোতে মধুমতী নদী বয়ে গেছে সারা বাংলাদেশে। কারণ যে জীবনকে ধারণ করে বাঙালির মানসভূমি বঙ্গবন্ধু চর্চিত করেছেন অসাধারণ চিন্তায়, তা মধুমতী নদীর স্রোতে বহমান থেকেছে ১৯২০-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধুর জীবনধারার এই বহমানতা পুরো বাংলাদেশের মানুষের মানসলোকের উর্বর ভূমিকে অনবরত সমৃদ্ধ করেছে। মানুষের মনভূমি তারই অনুপ্রেরণায় গড়ে তুলেছে স্বাধীনতার স্বপ্নভূমি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

ভারতবর্ষের রাজনীতিতে তিনিই একমাত্র নেতা যিনি ভারতবর্ষের মানচিত্রে একটি স্বাধীন দেশের প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই ব্যতিক্রমধর্মী অর্জন আর কারও দ্বারা হয়নি। তার জন্মশতবর্ষের গৌরবে সিক্ত হয়েছি আমরা দেশবাসী। স্মরণের বালুকাবেলায় তিনি আমাদের সামনে এক অবিস্মরণীয় মানুষ।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের দায়িত্বে থাকায় দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যার কর্মযজ্ঞে মহামিলনের যোগসূত্র। বাবা ও মেয়ে দু’জনই দেশের জন্য মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ। বাঙালির জন্য উৎসর্গ করা বঙ্গবন্ধুর জীবনের মহীরুহকে ধারণ করেছেন শেখ হাসিনা। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী তার সামনে আলোকদীপ্ত উৎসব। তিনি নিজে উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কর্মযজ্ঞে এগিয়েছেন বিশ্বের দরবারে। তার শাসনের একযুগের মধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পেয়েছে। তিনি পিতার মহতী চেতনা আত্মস্থ করেছেন জনগণের কল্যাণে, দেশের উন্নয়নে। তার শাসনব্যবস্থার নানাদিক গণমানুষকে স্বস্তির-শান্তির জীবন-যাপন দিচ্ছে।

বাবা ও মেয়ে দু’জনই দেশের জন্য মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে বাবা-মেয়ের এই যোগ ভিন্নধর্মী ব্যাখ্যা। আমরা দেখতে পাই পিতা থেকে কন্যাকে, দেখতে পাই শেখ মুজিব থেকে শেখ হাসিনাকে, এভাবে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। অপেক্ষা আগামী দিনের।

টুঙ্গিপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন শেখ হাসিনাও। পিতার জন্মভূমি থেকে তিনিও ধারণ করেছেন মাটি ও মানুষের স্বপ্ন। দেখেছেন টুঙ্গিপাড়ার মধুমতী নদী, দেখেছেন অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি, এসবই ধারণ করে বাবা-মায়ের সঙ্গে ঢাকায় আসেন। পড়ালেখার পাশাপাশি বাবার রাজনীতির যোগসূত্রও ধারণ করেছেন নিজের মধ্যে। ছাত্রী জীবন থেকে যুক্ত হন রাজনীতির সঙ্গে। বাবার উত্তরাধিকারী হয়ে রাজনীতির মাত্রায় গড়ে তোলেন নিজের সচেতন বোধ। বাংলাদেশের ইতিহাসে বাবা-মেয়ের এই যোগ ভিন্নধর্মী ব্যাখ্যা।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বিশ্বে নিয়ে গেছেন। বাংলাদেশের ২১ ফেব্রুয়ারি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হয়েছে জাতিসংঘের স্বীকৃতিতে। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ জাতিসংঘ ঐতিহ্যিক প্রামাণিক দলিলে সংরক্ষিত হয়েছে। বিশ্বের মানুষের সামনে এ এক গৌরবময় অর্জন। প্রধানমন্ত্রী নিজেও অনেক পুরস্কার লাভ করেছেন। এ ধরনের আন্তর্জাতিক পুরস্কার বিশ্বের সামনে বাংলাদেশকে উজ্জ্বল করেছে। আমরা দেখতে পাই পিতা থেকে কন্যাকে, দেখতে পাই শেখ মুজিব থেকে শেখ হাসিনাকে, এভাবে এগিয়ে এসেছে বাংলাদেশ। অপেক্ষা আগামী দিনের।

তবে একটি বিষয় আলোচনায় আনতে হয়। কারণ এই দুটো ঘটনায় দেশবাসী প্রবলভাবে মর্মাহত হয়। পরিত্রাণের উপায় খোঁজে।

শুধু দুর্নীতি ও নারী-শিশু ধর্ষণ সমাজব্যবস্থাকে অবক্ষয়ের দিকে টানার চেষ্টা করছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিবেদন, এ দুটো বিষয় কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করেন। আমরা যেন সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে পতিত না হই। নৈতিক মূল্যবোধের সচেতনতায় দেশবাসী যেন বাংলাদেশকে বিশ্বের সামনে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে আপনার ঋদ্ধ চেতনার মৌলিকতা পুরো দেশকে আলোকিত করে রাখুক। এগিয়ে যাক বাংলাদেশ।

সেলিনা হোসেন ।। কথাসাহিত্যিক, বঙ্গবন্ধু চেয়ার, বিপিএটিসি, সাভার

Link copied