করোনাকালে গণপরিবহনের স্বাস্থ্যনীতি

Shifun Newaz

০৯ এপ্রিল ২০২১, ০৮:২৮ এএম


করোনাকালে গণপরিবহনের স্বাস্থ্যনীতি

ছোটবেলায় পাটিগণিতের একটা অংক প্রায় করতে হোত। প্রশ্নটা এমন যে, চালের দাম ২০% বাড়লে একটি পরিবারের খরচ কত কমালে এই দাম বৃদ্ধি পরিবারের আয়ের উপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। ব্যাপারটা একটু জটিল লাগতো তখন, কিন্তু আজকের দিনের লেখাপড়া না জানা একজন লোক তার অভিজ্ঞতা দিয়ে জানে কীভাবে জীবনের চরম বাস্তবতায় কোনো কিছুর দাম বৃদ্ধি পেলেও খরচ কমিয়ে সেই চাপ থেকে বের হতে হয়।

কোভিড পরিস্থিতি গত বছর থেকেই চলছে আর মাঝে কিছুদিন অবস্থার উন্নতির পর আবারও যখন আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে তখন আমরা বেশকিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছি এবং স্বাভাবিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো গণপরিবহন সংক্রান্ত। প্রথম ধাপে সিদ্ধান্ত হলো ৫০ ভাগ যাত্রী নিয়ে গণপরিবহন চলতে হবে এবং ভাড়া বৃদ্ধি পেল ৬০ শতাংশ। এরপর সরাসরি গণপরিবহন বন্ধ করে দেওয়া হলো। ৭ এপ্রিল সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত আবারও গণপরিবহন চালু করা হলো।

সরকার যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হয় যে, এর পেছনে রয়েছে প্রচুর চিন্তা, সময় ও নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মানসিকতা। এক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতাও থাকে সরকারের এবং তাই দৃশ্যত একটি ভালো সিদ্ধান্ত সবাইকে খুশি করতে পারবে না সেটাই স্বাভাবিক। তারপরেও চেষ্টা করতে হয় কীভাবে গতানুগতিক চিন্তার বাইরে গিয়ে সর্বোচ্চ নাগরিকের জন্য কার্যকর একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যায়।

সেইদিক থেকে, গণপরিবহন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলো অনেকটাই গতানুগতিক এবং একপেশে হয়ে গিয়েছে। আলোচনার শুরুতেই যেই অংকটির কথা বলেছিলাম, সাধারণ মানুষ কিন্তু সেই বাস্তবতায় চলে। ভাড়া যখন ৬০ শতাংশ বাড়ানো হবে, তখন দুটো ব্যাপার ঘটে, প্রথমত মানুষ তার দৈনিক ট্রিপ সংখ্যা কমিয়ে দিবে বা অতিরিক্ত খরচ কমানোর জন্য চেষ্টা করবে পায়ে হেঁটে বেশি চলাচল করতে। ফলে ৫০ ভাগ যাত্রী নিয়ে ভাড়া বৃদ্ধি করে যে সুফল পরিবহন সংশ্লিষ্টগণ পাওয়ার কথা ভেবেছিল তা পাবে না। এর প্রমাণ আমরা পাই, ২০২০ সালেও যখন একই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তখন কিছুদিন পরে অনেক মালিক তার বাস রাস্তায় চালায়নি কারণ ভাড়া বৃদ্ধির পরেও পর্যাপ্ত যাত্রী না পাওয়ায় আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল।

সরকার যখন কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেওয়া হয় যে, এর পেছনে রয়েছে প্রচুর চিন্তা, সময় ও নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মানসিকতা। এক্ষেত্রে অনেক সীমাবদ্ধতাও থাকে সরকারের এবং তাই দৃশ্যত একটি ভালো সিদ্ধান্ত সবাইকে খুশি করতে পারবে না সেটাই স্বাভাবিক।

দ্বিতীয়ত আরেকটি ব্যাপার ঘটতে পারে, সেটা হলো অনেক ক্ষেত্রে আগের মতো করে সিটের সমান বা বেশি যাত্রী নিয়ে চলাচল করা যা সরাসরি সরকারি নির্দেশনা লঙ্ঘন। অর্থাৎ এ ধরনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে একদিকে যেমন পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনো সুফল পাচ্ছে না অন্যদিকে নির্দেশনা অমান্য করার মাধ্যমে সড়কে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। পরবর্তীতে কোভিড-১৯ এর বিস্তার রোধে সার্বিক কার্যাবলি/চলাচলের যে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হলো সেখানে প্রথমেই বলা হলো সকল গণপরিবহন বন্ধ।

বিআরটিএ’র ২০২০ সালের রিপোর্ট অনুসারে, বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশনকৃত মোটরযানের সংখ্যা ৪৫,৬৮,৮৭৮ এবং এর মধ্যে বাস ও মিনিবাস মিলিয়ে গণপরিবহনের সংখ্যা ৭৪,৯৬৭টি। অর্থাৎ গণপরিবহনের সংখ্যা মোট যানবাহনের প্রায় শতকরা ১.৬ ভাগ। মজার বিষয় হলো, দুই ভাগেরও কম যানবাহন চলতে পারবে না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্য অর্থ হলো বাকি ৯৮ ভাগের বেশি মোটরযান চলতে পারবে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অফিসে প্রাথমিকভাবে অর্ধেক জনবল আসবে। বাস্তবতা হলো, আমাদের গণপরিবহনে সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় এতো কম যে, অর্ধেক যাত্রীও যদি রাস্তায় চলে আসে তখনও তাদের যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত বাস পাওয়া যাবে না। এর প্রমাণ ইতোমধ্যেই সড়কে আমরা পেয়েছি। পরবর্তীতে, গণপরিবহন বন্ধ রেখে অফিসে লোক সমাগম যতই সীমিত করা হোক, কতজন পারবে টানা কয়েকদিন রিকশা, অটোরিকশা বা অন্যান্যভাবে অফিসে আসতে?

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অফিস যাতায়াতের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। যেহেতু গণপরিবহন বন্ধ সেহেতু এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে গেলে কর্তৃপক্ষকে মাইক্রোবাস বা প্রাইভেটকার ভাড়া করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে যেখানে, আয়ের পরিমাণ কমে যাচ্ছে সেখানে এ অতিরিক্ত খরচ কয়টা প্রতিষ্ঠান করতে পারবে বা করার ইচ্ছা পোষণ করবে? ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে, প্রতিদিন সকালে রাস্তায় বের হয়েই মানুষ গৃহীত নির্দেশনার বিড়ম্বনায় পড়ে যাচ্ছে।

গণপরিহন বন্ধ না রেখে বরং গণপরিবহনে সরকারি কাজে নিয়োজিত যান ও জরুরি সেবা ও পণ্য পরিবহনকে চলাচলের অনুমতি দিয়ে অন্য সকল ব্যক্তিগত মোটরযান বন্ধ করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে গণপরিবহনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ৫০ ভাগ কম যাত্রী নিতে হবে এবং এ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সেবা প্রদানকারী হিসেবে বিবেচনা করে সরকার সাময়িক ভর্তুকি প্রদান করতে পারে।

সরকারের নির্দেশনায় গণপরিবহনে যে স্বাস্থ্যনীতি বা স্বাস্থ্য নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে তা বরাবরই উপেক্ষিত ছিলো। এতে করে সংক্রমণ বেড়েছে। গণপরিবহনের স্বাস্থ্যনীতি মানার জন্য সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিকসহ সবাইকে উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে হবে।

ভর্তুকি প্রদানে সরাসরি আর্থিক লেনদেন করতে হবে বিষয়টি তা নয়, অন্যভাবেও হতে পারে। যদি গণপরিবহনের ক্ষেত্রে জ্বালানি খরচ অর্ধেক রাখা হয় যা পরে ফুয়েল স্টেশনগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এর সাথে চুক্তির ভিত্তিতে সমন্বয় করবে। এর ফলে, যাত্রীর দৈনিক খরচ বৃদ্ধি না করেও তাদের যাতায়াতের মাধ্যম পেয়ে যাবে এবং ভোগান্তি কমবে। এর ফলে আরও একটি সুবিধা পাওয়া যাবে, সেটা হলো যারা এতদিন ব্যক্তিগত গাড়ি দিয়ে চলাচল করতো তারাও গণপরিবহন ব্যবহার করবে এবং যদি ভালোমানের গণপরিবহন ব্যবস্থা দেওয়া যায় তাহলে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে অনেকেই হয়তো গণপরিবহনের প্রতি আকৃষ্ট হবে। এর বাইরেও যে বিষয়টি থাকে, তা হলো গণপরিবহনে স্বাস্থ্যনীতি। সরকারের নির্দেশনায় গণপরিবহনে যে স্বাস্থ্যনীতি বা স্বাস্থ্য নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে তা বরাবরই উপেক্ষিত ছিলো। এতে করে সংক্রমণ বেড়েছে। গণপরিবহনের স্বাস্থ্যনীতি মানার জন্য সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিকসহ সবাইকে উদ্যোগী হয়ে কাজ করতে হবে। না হয়, অর্থ উপার্জিত হবে ঠিকই কিন্তু যাত্রী থেকে পরিবহন শ্রমিকরা সংক্রমিত হবে সবচেয়ে বেশি।

এই শহরে একটু বৃষ্টি হলেই যেখানে একজন রিকশাচালক ও তার পাওনা তিনগুণ বুঝে নিতে ছাড়ে না, অফিসের সময় সিএনজি চালকও মিটারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায়, সেখানে এই ঘনবসতির শহরে যতই অফিসে লোক সীমিত করা হোক না কেন, একজন সাধারণ অফিস যাত্রীর জন্য এ শহর খুব কঠিন। আর সবাই যে অফিসে যাওয়ার জন্যই বাসা থেকে বের হয় ব্যাপারটি তেমন না। জরুরি অনেক কাজেই আমাদের রাস্তায় নামতে হয়।

কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ ।। সহকারী অধ্যাপক, এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট, বুয়েট

Link copied