কালের যাত্রার ধ্বনি

ক্যালেন্ডারের একটি পৃষ্ঠাও তিনশ পঁয়ষট্টি দিনের ঝড়ে, শীতে, বৃষ্টি অথবা বসন্তে উল্টে যায় না। প্রত্যেকটি তারিখকে হাত ধরে আরেকটি তারিখের সীমানায় নিয়ে যায় ঘটনাপ্রবাহ। প্রতিটি দিন অন্য আরেকটি দিনের চেয়ে আলাদা। ঘটনার নিক্ষিপ্ত তীর চব্বিশ ঘণ্টা সময়ের শরীরে গেঁথে যায়। তারপর মিনিট, ঘণ্টা, দিন মিলে একটি মিলিত চিত্র তৈরি করে।
এই চিত্র মিলেমিশে একটা বছরের কালপঞ্জি তৈরি করে। আমরা কখনো অবাক হয়ে বলি, বছরটা কোত্থেকে এসে কেমন করে চলে গেল! সময় তো আসলে অশ্বারোহী। আসলেই কি তাই?
সময় তো তার নিয়মেই আসে আবার তার নিজের নিয়মেই বিদায় নেয়। তাহলে কে বিদায় নেয় আসলে? সময় তো এক অন্তহীন প্রবাহ। তার বয়ে চলার শুরু হয়তো একটা ছিল; আমাদের এই গ্রহের জন্মের সঙ্গে তার নিবিড় যোগাযোগ আছে। কিন্তু সময়ের শেষ বিন্দুটি আমাদের জানা নেই। মানুষ তবুও অকারণে কব্জিতে ঘড়ি বাঁধে, নিয়মের ক্যালেন্ডার তৈরি করে বছর, তারিখ দিয়ে।
কালপঞ্জি লেখার কাজটা বেশ কঠিন। একটি নির্দিষ্ট সময়, কতগুলো দিন, মাসকে এক জায়গায় বেঁধে ফেলার চেষ্টা। কত ঘটনা, কত আঘাত, কত আশা ঝরে যায় হাতের মুঠো গলে!
রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন রেখে গেছেন, ‘‘কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও।’’ এই যে মহাকাল বয়ে চলেছে তার প্রতিটি শব্দ, তার ফেনায়িত গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া অথবা বেঁচে থাকা কোনো ধ্বনি আমরা শুনতে পাই?
সময় বয়ে চলেছে তার একাগ্র অভিযাত্রায়। তাই বছর শেষে কেউ যখন প্রশ্ন করেন, ‘কেমন কাটলো গত বছরটা?’ থমকে যাই। উত্তর দিতে গিয়ে দৃষ্টিহীনের মতো কম্পমান, অনিশ্চিত আঙুল বুলাই অতীত হয়ে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহের শরীরে। হয়তো চায়ের কাপ থেকে ঊর্ধ্বে উঠে ক্রমাগত হারিয়ে যাওয়া ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে উত্তর দিই, ‘বেঁচে আছি। এই তো বড় বিস্ময়। এই তো প্রবল সংবাদ।’
উত্তরের মধ্যে পাঠক কোথাও শ্বাসঘাতে একটু বেশি সময় নিয়ে ফেলার ঝোঁক টের পেলেন? পেতেই পারেন। কারণ এই সময় মানেই তো সেই তিনশ পঁয়ষট্টিটা দিন গুনে গুনে পার করা। ২০২৫ সাল যে গভীর দাগ রেখে গেল আমাদের মনে, আমার মনে তার চালচিত্র কেমন ছিল এক কথায় বর্ণনা করতে গিয়ে নিঃশ্বাস তো প্রলম্বিত হতেই পারে।
একটা বছর অতিক্রান্ত হলো। আমরা আবার নতুন ক্যালেন্ডারের পদানত হলাম। নতুন বছরের সূচনায় দাঁড়ালে স্বভাবতই ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের পথটা দেখে নিতে ইচ্ছে হয়। কী ফেলে এলাম সেই পথে? পথটা কেমন ছিল?
আমেরিকার প্রখ্যাত সাপ্তাহিক টাইম পত্রিকায় বছরের আলোচিত চরিত্র নির্ধারণ করে দিতো। এখনো দেয়। সাধারণত তাদের বিচারে একজন ব্যক্তি তাদের পত্রিকার প্রচ্ছদে উঠে আসতেন গোটা বছর ধরে আলোচিত হওয়ার জন্য, তার কর্মের প্রভাব গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার জন্য। সেখানে থাকতো বছর জুড়ে রাজনীতির বিশ্লেষণ, সমাজ বিকাশের ধারার বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশেও একদা ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ পত্রিকায় বছরের আলোচিত চরিত্র নির্ধারণ করা হতো। আলোচনার পাদপ্রদীপের আলোয় উঠে আসা চরিত্রটিকে হয় তা জানার জন্য গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। ২০২৫ সালকে ফিরে দেখতে গিয়ে মনে হলো, সদ্য বিদায় নেওয়া বছরের কে ছিল আলোচিত চরিত্র?
এই বিবেচনায় কোন বিষয়টি গভীরভাবে প্রবাহিত করেছিল আমাদের জীবনকে অথবা ঘুরিয়ে বলা যায়, কেমন করে বেঁচে ছিলাম পুরো সময়টা জুড়ে তা বোঝার জন্য মনকে খুব বেশি শ্রম বিনিয়োগ করতে হয় না। এক কথায় বলে দেওয়া যায়, গোটা বছর জুড়ে রাজনীতি আর তার জটিল সমীকরণই আলোচিত চরিত্র হিসেবে তার জায়গা অধিকার করে ছিল এবং আছেও নতুন বছরে।
আমরাই কখনো আলো, কখনো অন্ধকারের ভেতরে যাই। আলো-অন্ধকারের এই দোলাচলের মধ্যে আমরা বিভিন্ন ঘটনার ওপর নানা অর্থ আরোপ করি। ২০২৫ সালের শেষ দিনটিতে সূর্য প্রতিষ্ঠিত নিয়মেই আমাদের দৃষ্টির আড়ালে গিয়েছিল, হারানোর আগে যথারীতি গোধূলির আকাশ অতুলনীয় রঙে উদ্ভাসিত হয়েছিল।
রাজনীতির এই প্রথম স্থান অধিকার করার ক্ষমতা আমাদের সমাজে নতুন নয়। রাজনীতির ক্ষেত্রে তীব্র বিভাজন এবং মানুষ ভীষণভাবে রাজনৈতিক প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে যাওয়ার কারণটিও রাজনীতিকে দীর্ঘ সময় ধরে এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ভৌগলিক সীমানায় এক ধরনের আধিপত্য বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। কিন্তু ২০২৫ সাল অনেক ইতিহাস অথবা প্রবণতাকেও ভেঙে দিয়েছে।
পুরো বছরটাই সাধারণ মানুষের সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করেছে রাজনীতি। ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টে গণ আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে স্বৈরতান্ত্রিক হয়ে ওঠা একটি সরকারের পতন ঘটে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে আশ্রয় গ্রহণের মতো ঘটনার ভিতর দিয়ে বাংলাদেশের সমাজ ব্যাপক পরিবর্তনের মুখোমুখি হয়।
এই পরিবর্তনের একটি দিক তো সরকার ব্যবস্থার পরিবর্তন, স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পতন। কিন্তু উল্টো দিকে এই পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে জনমনে যে আকাঙ্ক্ষার জন্ম হয়েছিল তার পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াল তা আজকের সামাজিক বাস্তবতায়? আমরা কোথায় পৌঁছালাম, কোথায় যাচ্ছি? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর এখন এই দেশের সাধারণ মানুষ খোঁজার চেষ্টা করছে। আর উত্তর খুঁজে না পেয়ে চায়ের টং দোকান থেকে শুরু করে একান্ত শোবার ঘর পর্যন্ত আলোচনা এবং অনিশ্চয়তার ভারসাম্যহীন এক পরিস্থিতি বিস্তার লাভ করেছে।
একটা বছর ধরে মানুষের মনে এই অনিশ্চয়তার বিস্তার সামাজিক অস্থিরতা বাড়িয়েছে। সে অস্থিরতা অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপরও চাপ তৈরি করেছে। অবিশ্রান্ত রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসন শৈথিল্য এবং নানা রাজনৈতিক সমীকরণ বাংলাদেশের মানুষের জীবনকে বিপর্যস্ত করেছে বছর জুড়ে।
আরও পড়ুন
মানুষ কী চায়? মানুষ চায় শান্তি, মানুষ চায় স্থিতিশীলতা। তারা চায় চারটা ডাল-ভাত ফুটিয়ে খাওয়ার যোগ্যতা যেন থাকে জীবনে, দ্রব্যমূল্যের লাগাম দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা যেন তাদের জন্য টেনে ধরে রাখে, কাজের সংস্থান হয়, নিজস্ব আকাঙ্ক্ষার মতো জীবন যেন সুন্দর হয়।
এরকমটা কি ঘটেছে এক বছরে বাংলাদেশে? সমাজে একটানা ঘটেছে মব সন্ত্রাস, হত্যাকাণ্ড, সংখ্যালঘু নির্যাতন, মাজার ভাঙা, বাউলদের নির্যাতন করা, ঘেরাও, ব্লকেড, রাজনৈতিক সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, ডাকাতি আর জীবননাশের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনা। এরকম এক অনিরাপদ সমাজে ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্যে সাধারণ মানুষ তাদের জীবনের প্রবাহকে সামনে এগিয়ে নিয়ে গেছে।
বেঁচে থাকার শর্তগুলো পূরণ করতে চেয়েছে নিজেদের মতো করে। তারা আপ্রাণ উপেক্ষা করতে চেয়েছে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরা সংকটের বেড়াজালকে। সফল হতে পেরেছে কি? বাংলাদেশ হয়ে উঠেছে এক সন্ত্রস্ত জনপদ। মানুষ ভয় পেয়েছে, রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ না থাকার পরেও বহু মানুষ দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে।
আমাদের সংস্কৃতির কেন্দ্রগুলো আক্রান্ত হয়েছে। গণমাধ্যমের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে গেছে অবলীলায়। মানুষের মন, তার ব্যক্তিগত সীমানা বিপর্যস্ত হয়েছে। এক ধরনের ভয় টুঁটি চেপে ধরেছে ২০২৫ সালে বয়ে চলা সময়ের।
এরকম এক পরিস্থিতিতে ব্যক্তি নিরাপদ নয়। সমষ্টিও নয়। তবুও মানুষ বাঁচতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক অরাজকতার মধ্যে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত। তাই কেমন কাটলো বছরটা এমন প্রশ্ন তাদের জন্য খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল জীবনের লড়াই, তার বেঁচে থাকার স্বপ্ন।
মানুষ কী চায়? মানুষ চায় শান্তি, মানুষ চায় স্থিতিশীলতা। তারা চায় চারটা ডাল-ভাত ফুটিয়ে খাওয়ার যোগ্যতা যেন থাকে জীবনে, দ্রব্যমূল্যের লাগাম দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা যেন তাদের জন্য টেনে ধরে রাখে, কাজের সংস্থান হয়, নিজস্ব আকাঙ্ক্ষার মতো জীবন যেন সুন্দর হয়।
২০২৫ সালের শেষ দিনে দাঁড়িয়ে কেউ কেউ কাব্য করে লিখেছেন, এই বছরের শেষ সূর্য অস্ত গেছে। আমার কাছে অবশ্য এটা আহামরি কোনো ঘটনা নয়। সূর্য এভাবেই অস্ত যেতে অভ্যস্ত। প্রকৃতির নিয়ম অনুসরণ করে প্রতিদিন প্রতি বছর সূর্য পৃথিবীর বাসিন্দাদের দৃষ্টির আড়ালে চলে যায়। আবার দৃষ্টিগোচর হয়।
সূর্য আসলে অস্ত যায় না। আমরাই কখনো আলো, কখনো অন্ধকারের ভেতরে যাই। আলো-অন্ধকারের এই দোলাচলের মধ্যে আমরা বিভিন্ন ঘটনার ওপর নানা অর্থ আরোপ করি। ২০২৫ সালের শেষ দিনটিতে সূর্য প্রতিষ্ঠিত নিয়মেই আমাদের দৃষ্টির আড়ালে গিয়েছিল, হারানোর আগে যথারীতি গোধূলির আকাশ অতুলনীয় রঙে উদ্ভাসিত হয়েছিল।
বিচ্ছুরণের নিয়মে কমলা রঙের আলোককণা পাতলা বায়ুস্তর থেকে বেশি পরিমাণে প্রতিফলিত হওয়ায় আকাশ গৈরিক বর্ণও ধারণ করেছিল। মানুষ কি আকাশের দিকে তাকানোর সুযোগ পেয়েছিল? শহরে, গ্রামে, ঝিমিয়ে পড়া কোনো মফস্বলের পথে হেঁটে যেতে যেতে চেনা ফুলের ঘ্রাণ টের পেয়েছিল?
উত্তর জানা নেই। কিন্তু প্রশ্ন জমতে থাকে জীবন-খাঁচার দাঁড়ে।
কেমন করে অতিক্রান্ত হলো একটি বছর এই প্রশ্নের উত্তর শেষটায় মিলে না যাওয়া সরল অংকের মতো। কারও কাছে রাজনৈতিকভাবে অসামাধানযোগ্য, কারও কাছে সামাজিকভাবে দুর্বিষহ। দুঃখ-বেদনার বিচিত্র তরঙ্গে খেলে যাওয়া আমাদের জীবন এক বিপদসংকুল সমুদ্রের খানিক হলেও অতিক্রম করে পা রাখলো সময়ের নতুন গ্রন্থিতে।
এই সময়ের কথা অন্য কেউ অনেক বছর পরে যখন লিপিবদ্ধ করবে সে হয়তো আশ্চর্য হবে। তার ভাবনার ভেতরে এই একটি বছর রুদ্ধশ্বাসে পার করতে গিয়ে কারও কারও মাথার সব চুল সাদা হয়ে গেছে কি না সে চিন্তা কখনো আসবে না। কারণ সে ইতিহাস লিপিবদ্ধ করবে। আরও এমন একটি বছরের মতোই তা বিবরণে হারিয়ে যাবে হয়তো।
তবুও বলি, কী আশ্চর্যভাবে বেঁচে থাকলাম আমরা। একটা সময় পার করলাম দুঃখে, পার করলাম হয়তো আনন্দে, প্রত্যাখ্যানে, ঘৃণায়, বিদ্বেষে আর ষড়যন্ত্রের বর্ষায় বিদ্ধ হয়ে। যোগবিয়োগে সমান সমান। হাতে যা থেকে গেল তা হয়তো আমাদের বেঁচে থাকার ইতিহাস। অসহায় মানুষের লেখা কালপঞ্জি। সেই পঞ্জিতে লেখা হবে আমরা আবার একটি নতুন সময়ের খাঁচায় প্রবেশ করে আরেকটু সময় অতিবাহিত করলাম এই বিমুখ প্রান্তরে।
ইরাজ আহমেদ : কবি
