ভেনেজুয়েলা বনাম যুক্তরাষ্ট্র : পুরোনো বৈরিতার নতুন অধ্যায়

মার্কিন যুদ্ধজাহাজে করে চোখ বাঁধা, কানে হেডফোন লাগানো, হাতে হাতকড়া ও কোমরে বেঁধে এক রাষ্ট্রের বৈধ প্রেসিডেন্টকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এই দৃশ্য কি কোনো হলিউড থ্রিলারের কাহিনি? নাকি মধ্যযুগীয় কোনো সাম্রাজ্যবাদী অভিযানের বর্ণনা? দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এটি আজকের তথাকথিত সভ্য পৃথিবীর এক ভয়ংকর রাজনৈতিক মুহূর্তের প্রতীক।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক ও সরাসরি ক্ষমতা বদলের ঘোষণা শুধু লাতিন আমেরিকার ইতিহাসে নয়, সমগ্র আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য একটি অশনিসংকেত। যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্টভাবে জানিয়েছে ভেনেজুয়েলায় নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তারা মাদুরোকে ছাড়বে না, এমনকি ততদিন দেশটির শাসনভারও কার্যত তারাই দেখবে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও একটি ভয়াবহ প্রতিশ্রুতি ভেনেজুয়েলার বিপুল তেল সম্পদের কার্যকর সমাধান করবে ওয়াশিংটন। প্রশ্ন হলো, এটা কি আন্তর্জাতিক আইন? নাকি খোলামেলা দখলদারিত্ব? জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন, সার্বভৌমত্ব এসব শব্দ কি এখন কেবল দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর জন্য প্রযোজ্য?
কারাকাস ও ওয়াশিংটনের দ্বন্দ্ব নতুন নয়। শীতল যুদ্ধ–পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে হুগো চাভেজের বলিভারিয়ান বিপ্লব, নিকোলাস মাদুরোর শাসন এবং ধারাবাহিক মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এই সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বৈরিতায় আচ্ছন্ন। তবে বর্তমান পর্যায়ের সংঘাত কেবল দ্বিপাক্ষিক উত্তেজনা নয়; এটি বিশ্বব্যবস্থার গভীর সংকটের প্রতিফলন।
আজকের যুক্তরাষ্ট্র–ভেনেজুয়েলা সংঘাত দেখিয়ে দিচ্ছে, তথাকথিত নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা ক্রমেই ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবেই ভেঙে ফেলা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে আন্তর্জাতিক নিয়ম ও প্রতিষ্ঠানগুলোর রক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে।
গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে তারা বিশ্বব্যাপী নীতিগত নেতৃত্ব দাবি করেছে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সেই নৈতিক অবস্থান বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। একতরফা নিষেধাজ্ঞা, সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা, বিরোধী নেতাদের স্বীকৃতি এবং অর্থনৈতিক অবরোধ সব মিলিয়ে ওয়াশিংটনের নীতি আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখানেই নিয়মভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার ভাঙন স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল কথা ছিল, নিয়ম সবার জন্য সমান হবে, শক্তিশালীর ইচ্ছাই শেষ কথা নয়। অথচ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আন্তর্জাতিক আইনকে পাশ কাটিয়ে একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা মূলত শক্তিই ন্যায় এই পুরোনো বাস্তবতাকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছে।
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মূল কথা ছিল, নিয়ম সবার জন্য সমান হবে, শক্তিশালীর ইচ্ছাই শেষ কথা নয়। অথচ ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়াই একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ, স্বৈরাচারী ও দুর্নীতিগ্রস্ত বলে আখ্যা দিয়ে আসছে। ওয়াশিংটনের অভিযোগ, মাদুরো প্রশাসন মাদক পাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ একাধিকবার মাদুরো ও তার ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ এনেছে।
তবে কারাকাস এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। এই পাল্টাপাল্টি অভিযোগই দেখায়, সত্যের চেয়ে ক্ষমতার রাজনীতিই এখানে মুখ্য। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সরকার পরিবর্তনের কৌশলও ব্যর্থ হয়েছে। বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে স্বীকৃতি দেওয়া সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক রূপান্তর আসেনি।
বরং মাদুরো সরকার আরও বেশি প্রতিরোধী হয়ে উঠেছে এবং জাতীয়তাবাদী বয়ান জোরদার করেছে। এতে প্রমাণিত হয় বাহ্যিক চাপ দিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলানো সহজ নয়। এই দ্বন্দ্ব ল্যাটিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতেও নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করেছে। একসময় যুক্তরাষ্ট্র যে অঞ্চলকে নিজের ‘ব্যাকইয়ার্ড’ হিসেবে দেখত, সেখানে এখন তার প্রভাব আগের মতো নিরঙ্কুশ নয়।
মেক্সিকো, ব্রাজিল, কলম্বিয়ার মতো দেশগুলোও ওয়াশিংটনের ভেনেজুয়েলা নীতির প্রতি অন্ধ সমর্থন দেখাতে আগ্রহী নয়। আঞ্চলিক স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
আরও পড়ুন
চীন এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বেইজিং স্পষ্ট ভাষায় বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক আগ্রাসনে তারা গভীরভাবে বিস্মিত ও তীব্রভাবে নিন্দা জানায়। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আগ্রাসন এবং একটি দেশের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ। এই বক্তব্য শুধু ভেনেজুয়েলার পক্ষেই নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনের ন্যূনতম নীতির পক্ষে এক দৃঢ় অবস্থান।
চীনের বিবৃতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত যুক্তিগুলো ভিত্তিহীন এবং এখানে ব্যবসায়িক বাস্তবতার চেয়ে আদর্শিক শত্রুতা প্রাধান্য পেয়েছে। অর্থাৎ, গণতন্ত্র বা মানবাধিকারের কথা বললেও প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ও সম্পদ দখল। ভেনেজুয়েলার তেল বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মজুত এই সংঘাতের কেন্দ্রে রয়েছে, এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
ইউরোপের প্রতিক্রিয়াও বিভ্রান্তিকর। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার বলেছেন, তিনি আগে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে চান এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও মিত্রদের সঙ্গে কথা বলবেন। তিনি এটাও স্পষ্ট করেছেন যে যুক্তরাজ্য এতে জড়িত নয় এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো যখন আন্তর্জাতিক আইন প্রকাশ্যে লঙ্ঘিত হচ্ছে, তখন কেবল ‘আমরা জড়িত নই’ বলা কি যথেষ্ট? নাকি এই দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থানই পরোক্ষ সমর্থনের শামিল?
লাতিন আমেরিকা থেকে এসেছে সবচেয়ে তীব্র নৈতিক প্রতিবাদ। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে বোমাবর্ষণ ও তার প্রেসিডেন্টকে আটক করা একটি অগ্রহণযোগ্য সীমা অতিক্রম করেছে। তার মতে, এটি শুধু ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত নয়, বরং সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক নজির।
এই নজিরই সবচেয়ে ভয়াবহ। আজ ভেনেজুয়েলা, কাল কে? যদি কোনো শক্তিধর রাষ্ট্র সিদ্ধান্ত নেয় যেকোনো দেশের সরকার তাদের পছন্দ নয়, তাহলে কি তারা সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সেই সরকারকে অপসারণ করতে পারবে? যদি তাই হয়, তবে জাতিসংঘ সনদ, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইন কেবল কাগুজে অলংকারে পরিণত হবে।
কারাকাস বনাম ওয়াশিংটনের এই সংঘাত আসলে নতুন নয়। কিউবা বিপ্লবের পর থেকেই লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ইতিহাসের অংশ। কিন্তু বর্তমান পর্বটি আগের সবকিছুকে ছাপিয়ে গেছে সরাসরি ও প্রকাশ্য আগ্রাসনের কারণে। এটি আর গোপন অপারেশন নয়; এটি প্রকাশ্য ক্ষমতা দখলের ঘোষণা।
মাদুরোকে ঘিরে মাদক পাচারকারী রাষ্ট্রনেতার অভিযোগ এই ভূ-রাজনীতিরই অংশ। ওয়াশিংটনের ভাষ্যে এটি নৈতিক লড়াই, আর কারাকাসের ভাষ্যে এটি রাজনৈতিক অস্ত্র।
এই পরিস্থিতিতে সংলাপই একমাত্র পথ চীন যেমন বলেছে, আরও উত্তেজনা ঠেকানো এবং সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা জরুরি। কিন্তু সংলাপ তখনই অর্থবহ হয়, যখন শক্তির ব্যবহার বন্ধ থাকে। বন্দুকের নলের মুখে দাঁড়িয়ে কোনো জাতি স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারে না।
ভেনেজুয়েলা সংকট আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় বিশ্ব রাজনীতিতে ন্যায়বিচার নয়, শক্তিই এখনো শেষ কথা। কিন্তু এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া মানেই ভবিষ্যৎকে আরও অনিরাপদ করে তোলা। আজ যদি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধজাহাজে তুলে নেওয়া যায়, তবে কাল অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রেও একই কৌশল প্রয়োগ করা হবে এটাই ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা।
মাদুরোকে ঘিরে মাদক পাচারকারী রাষ্ট্রনেতার অভিযোগ এই ভূ-রাজনীতিরই অংশ। ওয়াশিংটনের ভাষ্যে এটি নৈতিক লড়াই, আর কারাকাসের ভাষ্যে এটি রাজনৈতিক অস্ত্র। সবশেষে বলা যায়, কারাকাস বনাম ওয়াশিংটনের এই পুরোনো বৈরিতার নতুন অধ্যায় কেবল দুই দেশের গল্প নয়। এটি একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক সংকেত যেখানে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, শক্তির রাজনীতি আবারও প্রাধান্য পাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ সেই সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হয়ে উঠছে।
ভেনেজুয়েলা সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, নৈতিকতার ভাষা যতই উচ্চকিত হোক না কেন, বাস্তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখনো ক্ষমতা, স্বার্থ ও প্রভাব বিস্তারের খেলাই থেকে গেছে। কারাকাস বনাম ওয়াশিংটনের এই নতুন অধ্যায় তাই শুধু দুই দেশের দ্বন্দ্ব নয়।
এটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার এক গভীর সংকটের প্রতিচ্ছবি যেখানে নিয়ম আছে, কিন্তু প্রয়োগ নেই; প্রতিষ্ঠান আছে, কিন্তু নৈতিক সাহস নেই। প্রশ্ন হলো, বিশ্ব কি এই পথে আরও এগোবে, নাকি এই মুহূর্তকে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে সত্যিকারের আন্তর্জাতিক আইন ও সংলাপভিত্তিক ব্যবস্থায় ফিরে আসবে? উত্তরটি শুধু ভেনেজুয়েলার নয়, আমাদের সবার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
ড. সুজিত কুমার দত্ত : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
