২০২৬ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতির সম্মুখযাত্রা

নতুন বছর ২০২৬ সাল আবির্ভূত হয়েছে। আগামী মাসের নির্বাচনের পরে বহু-প্রতীক্ষিত গণতান্ত্রিক উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ আর তার জনগণ। এমন একটি উত্তরণের জন্য আমরা যখন অপেক্ষা করছি, তখন একটি সঙ্গত প্রশ্ন হচ্ছে যে, কেমন হবে আগামী বছরের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চালচিত্র।
২০২৫ সালে বাংলাদেশ নানান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক টানাপোড়েন, উত্থান-পতন, প্রত্যাশা-হতাশার মাঝে কাটিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটকে মনে রেখে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন হচ্ছে কেমন যাবে ২০২৬ সাল। সেই প্রেক্ষিতে অর্থনীতি বিষয়টিই সাধারণ মানুষের মনের বিরাট অংশ জুড়ে আছে।
প্রত্যাশা তাদের অনেক, কিন্তু চিন্তাও তাদের কম নয়। সে প্রত্যাশা আর চিন্তার আবর্তিত হচ্ছে অর্থনীতি নিয়ে—যার মধ্যে রয়েছে মূল্যস্ফীতি; বেকারত্ব; সুযোগের অসমতা; ঋণ, মৌলিক সামাজিক সেবার গুণগত মান; অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মব সহিংসতা ইত্যাদি। সুতরাং সময় এসেছে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ অর্থনীতির সম্মুখযাত্রার দিকে তাকানোর।
এটা অনস্বীকার্য যে, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষেত্রে কিছু কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। যেমন, বাইরে থেকে অর্থপ্রবাহ বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের উন্নতি হয়েছে, সম্পদ পাচার আটকানো গেছে। ব্যাংকিং খাতে, যেসব ব্যাংক ভেঙে পড়েছে, তাদের পুনর্গঠনে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদগুলো পুর্নবিন্যস্ত করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বেশকিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও ৩ শতাংশের ওপরে ধরে রাখা গেছে। কিন্তু সেই সঙ্গে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশের সম্মুখযাত্রায় অন্তরায় অনেক। তিন ধরনের অন্তরায়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া দরকার—প্রবহমান সমস্যা, ঘনীভূত সমস্যা এবং আসন্ন সমস্যা।
বাংলাদেশের প্রবহমান সমস্যাগুলোর শীর্ষে রয়েছে দারিদ্র্য ও অসমতা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, নিকট অতীতে দারিদ্র্য দূরীকরণে বাংলাদেশের অর্জনের অনেকটাই সাম্প্রতিক সময়ে খোয়া গেছে। ২০১০ সাল থেকে ২০২২ সাল—এই ১২ বছরে বাংলাদেশ তার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে নিয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু গত তিন বছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্যহার আবার ১৮ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশে উঠে গেছে।
আজকে দেশের ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নীচে বাস করে। তিন বছরেই ৩০ লাখ লোক দারিদ্র্য ফাঁদের মধ্যে পড়েছে। এবং আরও ৬ কোটি ২০ লাখ লোক দারিদ্র্য ফাঁদে পড়ার হুমকিতে আছে।
আমাদের অর্থনীতির একটি অন্যতম বাস্তবতা হচ্ছে অসমতা ও বৈষম্য। যেমন, দেশের উচ্চতম ২০ শতাংশ পরিবারে অনূর্ধ্ব ৫ বছরের শিশুমৃত্যুর হার যেখানে হাজার ২০ জন, সেখানে নিম্নতম ২০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সে হার হচ্ছে হাজারে ২০ শতাংশ। সাম্প্রতিক সময়ে যদিও গ্রামীণ বাংলায় আয় অসমতা স্থিতিশীল রয়েছে, দেশের শহরাঞ্চলে তা বেড়ে গেছে। বাংলাদেশের উচ্চতম ১০ শতাংশ মানুষ দেশের ৫৮ শতাংশ সম্পদের মালিক, আর দেশের নিচের দিকের ৫০ শতাংশ মানুষ (দেশের অর্ধেক লোক) ৪ শতাংশ সম্পদ ভোগ করে।
দ্বিতীয় প্রবহমান সমস্যাটি হচ্ছে, স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো মৌলিক সামাজিক সেবার নিম্নমান। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাত পরিমাণগত দিক থেকে সম্প্রসারিত হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু সেসব অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সেবার কোনো গুণগত পরিবর্তন হয়নি। শিক্ষার ক্ষেত্রে জ্ঞান কিংবা দক্ষতা অর্জন নয়, বরং সনদ প্রাপ্তিই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্যখাতের মূল লক্ষ্যই হচ্ছে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, উচ্চ মানসম্পন্ন সেবা প্রদান নয়। দুটো খাতেই উচ্চ মানসম্পন্ন সেবাগুলো সংরক্ষিত থাকে ধনিক শ্রেণীর জন্যে এবং এ জাতীয় বৈষম্যই বাংলাদেশের সমাজে অসমতা তরান্বিত করার ব্যাপারে একটা চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করে।
তৃতীয় প্রবহমান বাস্তবতাটি হচ্ছে সঞ্চয়, বিনিয়োগ এবং সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে একটি শ্লথ গতি। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সঞ্চয় হার অত্যন্ত কম। অতীত সময়ে বাংলাদেশ যথেষ্ট পরিমাণে বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারেনি। ভিয়েতনামের দিকে তাকালেই এ ব্যাপারে আমাদের ঘাটতি বোঝা যায়।
বাংলাদেশের প্রবহমান সমস্যাগুলোর শীর্ষে রয়েছে দারিদ্র্য ও অসমতা। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, নিকট অতীতে দারিদ্র্য দূরীকরণে বাংলাদেশের অর্জনের অনেকটাই সাম্প্রতিক সময়ে খোয়া গেছে। ২০১০ সাল থেকে ২০২২ সাল—এই ১২ বছরে বাংলাদেশ তার জনগোষ্ঠীর প্রায় ৩ কোটি ৪৯ লাখ মানুষকে দারিদ্র্যসীমার ওপরে নিয়ে আসতে পেরেছিল। কিন্তু গত তিন বছরে বাংলাদেশে দারিদ্র্যহার আবার ১৮ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশে উঠে গেছে।
বাংলাদেশে কর-জাতীয় আয়ের অনুপাত মাত্র ৮ থেক ৯ শতাংশ, নেপালে ১৯ শতাংশ এবং ভারতে ১২ শতাংশ। বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবেই রপ্তানি করের মতো অপ্রত্যক্ষ করের ওপরে নির্ভর করেছে এবং সে নির্ভরতা এখনো প্রত্যক্ষ করের দিকে যায়নি। দেশের কৃষি ও শিল্প উৎপাদন এখনো প্রার্থিত স্তরে পৌঁছায়নি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এবং সেই সঙ্গে সামাজিক অস্থিরতা এই উৎপাদন স্তরকে আরও বিপর্যস্ত করেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব মানুষের যাপিত জীবনকে প্রভাবিত করেছে এবং দেশে বিনিয়োগ নিম্নস্তরেই রয়ে গেছে। পোশাক শিল্পে অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে, বহু উদ্যোক্তা কার্যকর নন, বিদেশি বিনিয়োগেও দ্বিধা আছে। ফলে দেশের উৎপাদন ভিত্তিও দুর্বল এবং উৎপাদনের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে।
২০২৫ সালে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশ অর্থনীতির জন্যে একটি বিরাট সমস্যা হিসেবে অব্যাহত ছিল। সেই সঙ্গে সহিংসতা, সন্ত্রাস এবং মবতন্ত্রের ফলে এ দেশের অর্থনীতি একটি শঙ্কার মধ্যে দিয়ে অনিশ্চিত সময়ে পার করেছে। অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তা অর্থনীতিতে নানান নাজুক পরিস্থিতি ও ভঙ্গুরতার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশে নারীর প্রতি বৈষম্য এবং সহিংসতা শুধুমাত্র অভাবনীয় একটি বাস্তবতাই নয়, বরং ঘনীভূত সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বাংলাদেশের ঘনীভূত সমস্যাগুলোর তালিকা বেশ দীর্ঘ। কর্মবিহীন প্রবৃদ্ধি, বিপুল বেকারত্ব, খেলাপি ঋণ, উল্লেখযোগ্য মানব-বঞ্চনা বাংলাদেশ অর্থনীতিতে গেঁড়ে বসেছে। ২০১৩ থেকে ২০২৪—এই সময়কালে বাংলাদেশের শিল্পখাতে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হলেও, দেশের অর্থনীতিতে প্রায় ১১ লাখ কর্মসংস্থান চলে গেছে। এই সময়কালে পোশাকশিল্পের রপ্তানি তিনগুণ বেড়েছে, কিন্তু সেখানে কর্মসংস্থান স্থবিরই থেকে গেছে।
সরকারি ভাষ্যমতে দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদপ্রাপ্তদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১৩ শতাংশ। তরুণদের মধ্যে বেকারত্বের হার দেশের সার্বিক বেকারত্ব হারের দ্বিগুণ। বর্তমানে কর্মবিহীন প্রবৃদ্ধি এবং বেকারত্ব বাংলাদেশ অর্থনীতিতে বড় সমস্যা হিসেবে ঘনীভূত হচ্ছে।
দেশের আর্থিক খাত একটি গভীর সংকটের মধ্যে আছে। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায় পৌঁছেছে, যা বর্তমানে ৬ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। বিদেশে অবৈধভাবে পাচারকৃত সুবিশাল অর্থের কিছুই উদ্ধার করা যায়নি। দেশের জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি এবং নগরায়ণের ওপরে এই বৃদ্ধির প্রভাব একটি ঘনীভূত অন্তরায় হিসেবে দেখা দেবে এবং এটা বাংলাদেশ অর্থনীতিতে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।
ইতিমধ্যে ৩ কেটি ৬৬ লাখ মানুষ নিয়ে ঢাকা জনসংখ্যার নিরিখে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রাজধানী ঢাকা তার ধারণ ক্ষমতার প্রান্তসীমায় পৌঁছে গেছে। বায়ু দূষণ, পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য-ব্যবস্থাপনার মতো সামাজিক সেবাকাঠামো ক্রমান্বয়ে ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। মুক্ত মাঠ, পুকুর, জলাশয় হারিয়ে গিয়ে ঢাকা আজ একটি ইট-পাথরের নগরীতে পরিণত হয়েছে। এই সবই জনজীবনে আসন্ন এক সংকটের সৃষ্টি করবে।
বাংলাদেশ অর্থনীতির আসন্ন সমস্যাগুলো দেশের ভেতর এবং দেশের বাইরে থেকে উদ্ভূত হবে। বাংলাদেশ অর্থনীতির একটি অন্যতম বাস্তবতা হলো নানান বিষয়ে বৈশ্বিক চাপ বাংলাদেশ অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবে।
প্রথমত, এ বছর এবং আগামী বছরও বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি প্রবৃদ্ধি-শ্লথ গতিতে ভুগবে। এর নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশ অর্থনীতি এড়াতে পারবে না। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কযুদ্ধের কারণে উন্নত বিশ্বে বাংলাদেশের রপ্তানি ব্যাহত হবে। এসব শুল্কের মোকাবিলা বাংলাদেশকে করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যদিও উত্তরণ সময় পিছিয়ে দেওয়ার কথা উঠেছে, সম্ভবত আগামী বছরই বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে উন্নীত হবে। এর ফলে বাংলাদেশ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে কিছু কিছু সুযোগ বাংলাদেশ হারাবে—যেমন, স্বল্প বা শূন্য শুল্কে রপ্তানি সুবিধা, অনুদান সুবিধা ইত্যাদি। উন্নয়নশীল দেশ পর্যায়ে উন্নীত হলে বাংলাদেশ এসব সুবিধা পাবে না। সুতরাং উত্তরণ-পরবর্তী কালে উত্থিত বাংলাদেশকে বিষয়গুলোও মোকাবিলা করতে হবে। কথা হচ্ছে, সে সব আসন্ন সংকটের জন্যে বাংলাদেশের প্রস্তুতি কতখানি।
তৃতীয়ত, বিশ্বের নানান জায়গার যুদ্ধ এবং সংঘাতের প্রভাবও বাংলাদেশ অর্থনীতিতে পড়বে। এই বিপদসংকুল পথযাত্রায় বিজ্ঞতা, সংনম্যতা এবং সুচিন্তিত পরিকল্পনা নিয়ে সেই বিপদ মোকাবিলা করে সব সংকট উতরে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যেতে পারবে কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন।
এই সব অন্তরায়গুলো পার হতে হলে কতগুলো মৌলিক বিষয়ের দিকে নজর দিতে হবে।
প্রথমত, আমাদের ভবিষ্যৎ রূপরেখায় ‘অগ্রগতি’ এবং ‘উন্নয়ন’-এর মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। অগ্রগতি মানেই উন্নয়ন নয়। অগ্রগতি মানে হচ্ছে কোনো ইতিবাচক বিষয়ের (যেমন, জাতীয় আয়) পরিমাণগত বৃদ্ধি, কিংবা কোনো নেতিবাচক বিষয়ের (যেমন, মূল্যস্ফীতি) পরিমাণগত হ্রাস।
আর উন্নয়ন মানে হচ্ছে শুধুমাত্র পরিমাণগত অর্জন নয়, সেই সঙ্গে বিষয়টির ‘গুণগত’ পরিবর্তন। যেমন, জাতীয় আয়ের পরিমাণগত বৃদ্ধি অগ্রগতি, আর সেটা যদি সুষমবন্টিত হয়, তবে সেটা উন্নয়ন। এর আগের সব বয়ানে অর্থনৈতিক অগ্রগতিকেই উন্নয়নের সমার্থক মনে করা হয়েছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন রূপরেখায় একটি উন্নয়ন দর্শন থাকতে হবে। সে দর্শনের মূল কথা হবে মানুষের উন্নয়ন, মানুষের জন্যে উন্নয়ন এবং মানুষের দ্বারা উন্নয়ন। মানুষের সক্ষমতার প্রসার ঘটতে হবে—পরিমাণগত এবং গুণগত উভয় দিক থেকেই এবং সে সক্ষমতার প্রসার শুধুমাত্র তার কুশলেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তাতে অন্তর্ভুক্ত থাকবে মানুষের কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা, তার অংশগ্রহণ।
উন্নয়নের সুফল সুষমভাবে বন্টিত হতে হবে—শুধু ফলাফলের সুষম বণ্টন নয়, সুযোগেরও সমবণ্টনও। তেমনিভাবে, মানুষ শুধু উন্নয়ন সুফলের নিষ্ক্রিয় গ্রহীতা হবে না, সে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সক্রিয় অংশগ্রহণকারীও হবে। কারণ উন্নয়নের যেসব সিদ্ধান্ত মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করবে, সেখানে মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ থাকা দরকার। এটা করলেই মানুষের কর্মকুশলতা, তার সৃষ্টিশীলতা এবং সৃজনশীলতা বেড়ে যাবে এবং মানুষ তখন আর উন্নয়ন বৃত্তের পরিসীমায় থাকবে না, কেন্দ্রে স্থিত হবে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পথযাত্রার একটি নৈতিক ভিত্তি থাকবে। উন্নয়নের লক্ষ্য শুধুমাত্র প্রবৃদ্ধি নয়, শুধু বস্তুগত বিষয়ের সমাহার নয়, উন্নয়নের লক্ষ্য মানবাধিকারের প্রতিষ্ঠা, মানুষের মানবিক মর্যাদা সুনিশ্চিতকরণ, মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, মানুষের মধ্যে সহনশীলতা, পরধর্ম ও পরমতসহিষ্ণুতার একটি পরিবেশ গড়ে তোলা। উন্নয়নের নৈতিক ভিত্তির ভেতরে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অধিষ্ঠান ও নিরন্তর চর্চা একান্ত দরকার। সে চর্চা হতে হবে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে, কর্মক্ষেত্রে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে, রাজনৈতিক দল এবং প্রক্রিয়ার মাঝে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে। এর পথ ধরেই পরিহার করতে হবে সন্ত্রাস এবং সহিংসতা।
চতুর্থত, উন্নয়নকে শুধুমাত্র শুদ্ধ অর্থনীতির বিষয় ভাবলে চলবে না বরং উন্নয়নকে রাজনৈতিক-অর্থনীতি, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষিত, ঐতিহাসিক নৃতাত্ত্বিক প্রেক্ষাপটের নিরিখে বিনির্মাণ করতে হবে। সঙ্গে আসবে সাংস্কৃতিক চালচিত্র। জনকল্যাণমুখী একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে দেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে, প্রলম্বিত এবং গোষ্ঠীগত স্বার্থের ধারণার ভিত্তিতে একটি আঁতাত তৈরি করা যেতে পারে সমাজের বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক গোত্রের মধ্যে।
ইতিহাস-বিচ্ছিন্নতায় কিংবা দেশজ সংস্কৃতি বিযুক্তিতে কোন উন্নয়নই বজায়ক্ষম হয় না। সেই সঙ্গে বজায়ক্ষম উন্নয়নের জন্যে মানুষ ও পরিবেশের মধ্যে একটি ভারসাম্য, পরিবেশ সংরক্ষণ, জলবায়ু পরিবর্তন বিবেচনা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা জরুরি। সেই সঙ্গে জরুরি, পরিবেশকে একটি উন্নয়ন বিষয় হিসেবে বিবেচনা করার, শুদ্ধ পরিবেশ সমস্যা হিসেবে নয়—উন্নয়ন এবং পরিবেশের মিথস্ক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া।
দেশের আর্থিক খাত একটি গভীর সংকটের মধ্যে আছে। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায় পৌঁছেছে, যা বর্তমানে ৬ লাখ ৫৯ হাজার কোটি টাকা। বিদেশে অবৈধভাবে পাচারকৃত সুবিশাল অর্থের কিছুই উদ্ধার করা যায়নি। দেশের জনসংখ্যার প্রবৃদ্ধি এবং নগরায়ণের ওপরে এই বৃদ্ধির প্রভাব একটি ঘনীভূত অন্তরায় হিসেবে দেখা দেবে এবং এটা বাংলাদেশ অর্থনীতিতে একটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।
পঞ্চমত, উন্নয়ন প্রসঙ্গে বাংলাদেশের দৃষ্টি শুধুমাত্র দেশজ চালচিত্রে রাখলে চলবে না, তাকে একটি বৈশ্বিক এবং আঞ্চলিক দৃষ্টিভঙ্গি নিতে হবে। শুধু অন্তর্মুখী নীতি নয়, কিংবা ‘অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ’ নয়, তার বদলে বাংলাদেশ অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পথযাত্রার অন্যতম নির্ণায়ক হতে হবে বিশ্বের অর্থনীতি প্রবণতা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামো, ভূ-রাজনৈতিক অবস্থা।
বৈশ্বিক বলয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বদলে বহুপাক্ষিক সম্পর্কের প্রতি আমাদের দেশের অঙ্গীকার, সমর্থন এবং কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা দরকার। পরিবর্তিত ভূ-রাজনীতি এবং ভূ-অর্থনীতির প্রেক্ষিতে আঞ্চলিক জোটগুলোর দিকে বাংলাদেশকে মনোযোগ দিতে হবে। আমরা কেন জি-২০, জি-১৫, ব্রিকসের মতো জোটগুলোর সদস্য হতে পারবো না?
বাংলাদেশের পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে এইসব সংকটগুলো তার চিন্তার মধ্যে রাখতে হবে এবং এগুলো তার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপরেখার মধ্যে সন্নিবেশিত করতে হবে।
প্রথমত, অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দিয়ে অর্থনীতির কোন কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, সেটাও চিহ্নিত হওয়া প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, উপর্যুক্ত চিহ্নিত অগ্রাধিকারগুলো সরকার তাদের নীতিমালার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রতিস্থাপন করা।
তৃতীয়ত, ক্ষমতা গ্রহণের পরে পরেই ক্ষমতাসীন দলকে বাংলাদেশের জন্য মধ্যমেয়াদি একটি অর্থনৈতিক রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। সুনির্দিষ্ট সময়রেখা সম্পন্ন এই রূপরেখা দেশের জনগণকে দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা সম্পর্কে ধারণা দেবে। উপর্যুক্ত সময়রেখা ধরে প্রতিবছর বিশ্বাসযোগ্য উপাত্তের মাধ্যমে রূপরেখাটির লক্ষ্য অর্জনের অগ্রগতির একটি বস্তুনিষ্ঠ পরিবীক্ষণ এবং মূল্যায়ন করা হবে। এতে করে অর্থনৈতিক দিক থেকে জনগণের কাছে সরকার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যাবে।
বস্তুনিষ্ঠ ও প্রাজ্ঞ নীতিমালা এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিয়ে সরকার যদি সঠিক পথে এগোয়, তাহলে বাংলাদেশ একটি অর্থনৈতিক পথযাত্রা গড়ে তুলতে পারবে, যেখানে সমতা ও বৈষম্যহীনতা সম্পন্ন একটি অর্থনৈতিক গণতন্ত্র নিশ্চিত করে দেশের সব মানুষের সুকল্যাণ নিশ্চিত করা যাবে।
ড. সেলিম জাহান : ভূতপূর্ব পরিচালক, মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তর এবং দারিদ্র্য দূরীকরণ বিভাগ, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
