বিজ্ঞাপন

অদৃশ্য সংকট, অনিবার্য দায় : নির্মল বায়ু ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা

অদৃশ্য সংকট, অনিবার্য দায় : নির্মল বায়ু ও কর্তৃপক্ষের ভূমিকা

নতুন সরকার আসলেই নতুন প্রতিশ্রুতি ও নতুন অগ্রাধিকারের মতো সবকিছুই নতুনভাবে প্রাধান্য পায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই নতুন অগ্রাধিকার তালিকায় দূষণমুক্ত বাতাসে নাগরিকের শ্বাস নেওয়ার অধিকারের কথা উল্লেখিত থাকে?

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রশাসনিক সংস্কারের মতো দৃশ্যমান ইস্যুগুলো রাজনৈতিক আলোচনায় যতটা উপস্থাপিত হয়, বায়ু দূষণের মতো নীরব অথচ মারাত্মক সংকট ততটাই উপেক্ষিত থেকে যায়। নির্মল বায়ুর অধিকার সংবিধান, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিল এবং রাষ্ট্রীয় নীতিকথনে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এটি আজও উপেক্ষিত।

অথচ বায়ু দূষণ সরাসরি জনস্বাস্থ্যকে হুমকির সম্মুখীন করছে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর উৎপাদনশীলতা কমাচ্ছে এবং চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা বাড়িয়ে দিয়ে অর্থনীতিকে দুর্বল করছে। এটি এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একাধারে একটি জনস্বাস্থ্য সংকট, একটি অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলার প্রতিচ্ছবি।

বাংলাদেশের শহরগুলো আজ কার্যত শ্বাসরুদ্ধ। দূষিত বায়ু শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত করছে, প্রবীণ ও অসুস্থদের জীবনঝুঁকি বাড়াচ্ছে এবং জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনের রাষ্ট্রীয় প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার আর কোনো সুযোগ নেই। অতএব নতুন সরকারের জন্য নির্মল বায়ু নিশ্চিত করা কোনো সৌখিন পরিবেশবাদী দাবি নয়, বরং এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার, একটি জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অনিবার্য অংশ।

এদেশের বায়ু দূষণ আজ আর মৌসুমি বা শহরকেন্দ্রিক সমস্যা নয়, এটি একটি কাঠামোগত ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছে। রাজধানী ঢাকা ও দেশের বড় শহরগুলো বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরের তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে। শীতকালে বায়ুর মান প্রায় নিয়মিতভাবেই ‘অস্বাস্থ্যকর’ থেকে ‘অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পৌঁছে যায়।

ইটভাটা, নির্মাণ কাজের ধুলা, পুরোনো যানবাহন, নিম্নমানের জ্বালানি, শিল্প নিঃসরণ এবং দুর্বল নগর ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি সব মিলিয়ে বায়ু দূষণের উৎস বহুমাত্রিক। সূক্ষ্ম ধূলিকণা, নাইট্রোজেন ও সালফার অক্সাইড, কালো ধোঁয়া এসবের প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের ওপর। ফলে বাড়ছে শ্বাসতন্ত্রের রোগ, হৃদরোগ, স্ট্রোক এবং অকালমৃত্যুর ঝুঁকি।

হাসপাতালের শয্যায় শ্বাসকষ্টে কাতর রোগী, শিশুদের দুর্বল ফুসফুস, বয়স্কদের দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং অকালমৃত্যুর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমরা একটি নীরব জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের মধ্যে বসবাস করছি। জনস্বাস্থ্য ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কর্মক্ষমতার অবক্ষয় অর্থনীতিকেও নীরবে দুর্বল করে দিচ্ছে এই বায়ু দূষণ।

এদেশের বায়ু দূষণ আজ আর মৌসুমি বা শহরকেন্দ্রিক সমস্যা নয়, এটি একটি কাঠামোগত ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটে রূপ নিয়েছে। রাজধানী ঢাকা ও দেশের বড় শহরগুলো বছরের পর বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরের তালিকায় স্থান করে নিচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, এই সংকট কি অনিবার্য ছিল? আমরা কি সবসময়ই এমন বিষাক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিয়েছি? ইতিহাসের স্পষ্ট উত্তর হলো—না। কয়েক দশক আগেও এই দেশেরই বাতাস ছিল তুলনামূলকভাবে নির্মল। গ্রাম হোক কিংবা শহর, সকালের বাতাস ছিল স্বস্তিদায়ক, আকাশ ছিল নীল, দিগন্ত ছিল পরিষ্কার।

তখন বায়ু দূষণ কোনো জাতীয় উদ্বেগ ছিল না, কারণ জীবনযাত্রা ও উন্নয়ন প্রকৃতির সীমা অতিক্রম করেনি। সে সময় কোনো আধুনিক আইন ছিল না, ছিল না উন্নত মনিটরিং যন্ত্র। তবুও বাতাস নির্মল ছিল, কারণ শিল্পায়ন ছিল সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত, যানবাহনের সংখ্যা ছিল কম, শহরের চারপাশে ছিল সবুজ অঞ্চল, খাল-বিল ও জলাভূমি।

মানুষ হাঁটত বেশি, ভোগ করত কম। উন্নয়ন ছিল প্রয়োজনভিত্তিক, নয় লোভনির্ভর। আজ সেই ভারসাম্যই ভেঙে পড়েছে। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, পরিবেশগত ছাড়পত্র লঙ্ঘনকারী কারখানা, অবৈধ ও পুরোনো প্রযুক্তির ইটভাটা, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাগামহীন নির্মাণকাজ এবং খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো ইত্যাদি সব মিলিয়ে বায়ু দূষণ আজ রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার প্রতীক। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই দূষণের বড় অংশই মানবসৃষ্ট এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। তবুও আমরা তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছি।

আমাদের দেশে এখন আর আইনের কোনো অভাব নেই, তবে সমস্যা হচ্ছে আইন প্রয়োগে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন আছে, পরিবেশ আদালত আছে, পরিবেশ অধিদপ্তর আছে। কিন্তু এসব প্রতিষ্ঠান কাগজে শক্তিশালী হলেও বাস্তবে দুর্বল। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও জবাবদিহির অভাব দূষণকারীদের বারবার ছাড় দিয়ে যাচ্ছে। ফলে দূষণ ধীরে ধীরে আমাদের কাছে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে উঠছে, আর এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর সামাজিক পরাজয়।

নির্মল বায়ু নিশ্চিত করা এখন আর কেবল নৈতিক দাবি নয়; এটি সংবিধানস্বীকৃত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩১ নাগরিকের জীবনের অধিকার নিশ্চিত করেছে, যার ব্যাখ্যায় স্বাস্থ্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার অন্তর্ভুক্ত। অনুচ্ছেদ ১৮ক রাষ্ট্রকে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে।

অর্থাৎ দূষিত বাতাসে নাগরিককে বসবাসে বাধ্য করা সংবিধানের চেতনার সরাসরি লঙ্ঘন। এখানেই শেষ নয়। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পরিসরেও দায়বদ্ধ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমালার (SDGs) লক্ষ্য ৩ নাগরিকের সুস্বাস্থ্য, লক্ষ্য ১১ বাসযোগ্য নগর এবং লক্ষ্য ১৩ জলবায়ু সুরক্ষার কথা বলে।

প্যারিস জলবায়ু চুক্তি, UNFCCC ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনাগুলো স্পষ্টভাবে বলে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এসব অঙ্গীকার উপেক্ষা করা মানে শুধু নাগরিকদের প্রতি অবহেলা নয়, আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির প্রতিও অবজ্ঞা।

এই পরিস্থিতিতে নতুন সরকারের কাছে মানুষ এখন আর শুধু সড়ক, সেতু বা মেগা প্রকল্প চায় না; মানুষ চায় একটি বাসযোগ্য রাষ্ট্র। উন্নয়নের নামে যদি মানুষের শ্বাস নেওয়ার অধিকারটুকু কেড়ে নেওয়া হয়, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই নয় বরং আত্মঘাতী। প্রথম এবং সবচেয়ে জরুরি প্রত্যাশা হলো আইনের শাসন দৃশ্যমান করা।

“ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট” পাস ও বাস্তবায়ন করতে হবে। পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নয়, এই বার্তাটি কেবল বক্তব্যে নয়, বাস্তব পদক্ষেপে প্রমাণ করতে হবে। প্রভাবশালী শিল্প, ইটভাটা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয় কোনোটিই যেন দায়মুক্তির ঢাল না হয়। দ্বিতীয়ত, দূষণের প্রধান উৎসগুলোর কাঠামোগত সংস্কার এখন আর বিলম্বের বিষয় নয়। ইটভাটা খাতে পুরোনো প্রযুক্তি বন্ধ করতে হবে, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিল্পখাতে নির্গমন মানদণ্ড কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, নিয়মিত ও স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

...উন্নয়ন মানে শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়, বরং উন্নয়ন মানে সুস্থ মানুষ, নিরাপদ পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষা।

তৃতীয়ত, নগর পরিবহন ব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন ছাড়া বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর শহরব্যবস্থা কমিয়ে গণপরিবহনকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বৈদ্যুতিক ও কম নিঃসরণ যানবাহনে প্রণোদনা দিতে হবে এবং পুরোনো, ফিটনেসবিহীন যানবাহন সড়ক থেকে অপসারণ হবে আপসহীনভাবে।

চতুর্থত, নগর পরিকল্পনায় সবুজ ও খোলা জায়গাগুলোকে কঠোরভাবে রক্ষা করতে হবে। পান্থকুঞ্জের ঘটনার পুনরাবৃত্তি করা যাবে না। গাছ, জলাশয় ও খোলা জায়গা কোনো সৌন্দর্য উপকরণ নয়; এগুলো শহরের ফুসফুস। এগুলো ধ্বংস করে উন্নয়নের গল্প বলা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া কিছু নয়।

পঞ্চমত, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। বায়ুর মান সম্পর্কিত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা নাগরিকের অধিকার। তথ্য গোপন রেখে পরিবেশ রক্ষা সম্ভব নয়; বরং এতে দায় এড়ানোর সংস্কৃতি তৈরি হয়।

ষষ্ঠত, শুধুমাত্র পরিবেশের জন্য বিসিএস ক্যাডার ও পরিবেশ পুলিশ নিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি, নতুন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উন্নয়নের সংজ্ঞা বদলানো। উন্নয়ন মানে শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি নয়, বরং উন্নয়ন মানে সুস্থ মানুষ, নিরাপদ পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষা।

নির্মল বায়ু নিশ্চিত করা কোনো একক মন্ত্রণালয়ের একক দায়িত্ব নয়; এটি সমন্বিত রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার ও রাষ্ট্রের মৌলিক দায়। নতুন সরকার যদি এই অঙ্গীকারকে কার্যকর নীতি ও বাস্তবায়নে রূপ দিতে ব্যর্থ হয়, তবে উন্নয়নের সব দাবি ও অর্জনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে। নির্মল বায়ু আর কোনো বিলাসিতা নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

নতুন সরকারের সামনে এখন আর অজুহাতের সুযোগ নেই, এখন সময় এসেছে সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর বাস্তবায়ন এবং স্পষ্ট জবাবদিহির। রাষ্ট্রের প্রকৃত অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন উন্নয়নের পরিসংখ্যানের আড়ালে নয়, বরং বাস্তব জীবনে নাগরিকরা নিশ্চিন্তে শ্বাস নিতে পারবে।

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার : ডিন, বিজ্ঞান অনুষদ; অধ্যাপক, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ; যুগ্ম সম্পাদক, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) এবং চেয়ারম্যান, বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)